বিপিসির এলপি গ্যাস দুর্লভ

ভর্তুকির ১১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেট

পাইপলাইনের গ্যাস মূলত শহর-নগরের বাসিন্দাদের বরাতেই জোটে। এ সুবিধার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে জ্বালানির জন্য নির্ভর করতে হয় এলপি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম) গ্যাসের ওপর। তাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকিও এ খাতে দিয়ে থাকে। তবে এর সুফল তুলে নিচ্ছে একশ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী।
দেশে বিদ্যমান গ্যাস সংকট কাটাতে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে এলপিজি সরবরাহ করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ভর্তুকি মূল্যে ৭০০ টাকা দরে মাসে এক লাখ সিলিন্ডার সরবরাহ করার কথা সংস্থাটির। কিন্তু সিন্ডিকেটের তৈরি কৃত্রিম সংকটের কারণে দ্বিগুণ দাম দিয়েও বাজারে বিপিসির এলপিজি সিলিন্ডার অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ গচ্চা যাওয়ার পরও ভর্তুকির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবহারকারীরা। এ অবস্থায় ভর্তুকি সুবিধা অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সাড়ে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম প্রায় ১২০০ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন, শুল্ক, বোতলজাতকরণ খরচ যোগ করলে আরো ৫০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়। তবে বাংলাদেশ সরকার এ খাতে ভর্তুকি দেয় বলে বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজি) থেকে উৎপাদিত গ্যাসের সিলিন্ডার ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি হওয়ার কথা ৭০০ টাকায়। অথচ চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের বিভিন্ন জেলাসহ সারা দেশে বিপিসির সাড়ে ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডার (বোতল) বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। এখানে মধ্যস্বত্বভোগী একটি সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি ভর্তুকির প্রায় ১১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর ভর্তুকির এই এলপি গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন ৩০ জন ডিলার। এই সিন্ডিকেটের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির স্বজন কিংবা কাছের লোক বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিপিসির সিলিন্ডারের বেশি দাম ও সংকটের কথা স্বীকার করে এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কুদরত-ই ইলাহী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুচরা বাজারে বিপিসি সবচেয়ে কম দামে এলপি গ্যাস বিপণন করছে। বিভিন্ন কম্পানির তুলনায় বিপিসির এলপি গ্যাসের মূল্য অনেক কম। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে সরকার এলপি গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাচ্ছে না।’ এসব কারণে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকে এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এলপি গ্যাস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের মতে, ভর্তুকি দুর্বলতার সুযোগ নিতে হাতেগোনা কয়েকটি ডিলার প্রতিষ্ঠান বিপণন কম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজোশে এলপি গ্যাসের অধিকাংশ সিলিন্ডার হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের দুই মন্ত্রী এবং একজন এমপির ভাই ও স্বজনদের দাপটে সাধারণ ডিলাররা নিয়মিত গ্যাসের বরাদ্দ পাচ্ছেন না।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন চারটি বিপণন কম্পানির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার দেশব্যাপী বিপণন করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কম্পানি লি. (এসএওসিএল)। এই চার প্রতিষ্ঠানের দেশব্যাপী প্রায় দুই হাজার ৯০০ ডিলার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন এলপিজি প্লান্ট থেকে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার বোতলজাত এলপি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া সিলেটের কৈলাশটিলা থেকে সরবরাহ করা হয় আরো তিন হাজার সিলিন্ডার এলপি গ্যাস।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা প্রায় এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি। বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্টার্নর্ রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল পরিশোধনের পর সেখান থেকে উপজাত হিসেবে প্রাপ্ত ১৪ হাজার মেট্রিক টন এলপি গ্যাস এবং সিলেটের কৈলাশটিলার প্লান্ট থেকে প্রাপ্ত আরো আট হাজার মেট্রিক টন এলপি গ্যাস বোতলজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হয়। বাকি প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন এলপি গ্যাস বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্যাস, টোটাল গ্যাস, ক্লিনহিট ও যমুনা স্পেস টেক বিদেশ থেকে আমদানির পর বোতলজাত করে দেশের বাজারে বিক্রি করে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের দুটি প্লান্ট বছরে প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার সিলিন্ডার (সাড়ে ১২ কেজি ওজনের) গ্যাস উৎপাদন করতে পারে। এলপিজি থেকে প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস ৬৩০ টাকা দরে চারটি বিপণন কম্পানিকে (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও এসএওসিএল) সরবরাহ করা হয়। বিপণন কম্পানিগুলো ৬৭৮ টাকা দরে তাদের নির্ধারিত ডিলারদের কাছে বিক্রি করে। এরপর ডিলাররা সরকার নির্ধারিত ৭০০ টাকা দামে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মাধ্যমে বিপিসির এলপিজি প্লান্ট থেকে বাল্ক এলপিজি সংগ্রহ করে প্রিমিয়ার এলপিজির চট্টগ্রামের কুমিরার প্লান্টে বোতলজাত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া তিন বছরে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। তাই ভর্তুকি তুলে দিলে বা বিপিসির সিলিন্ডারের দাম বাড়ালে সরকারের খুব বেশি ক্ষতি যেমন হবে না, বন্ধ হবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য।