ভাড়া বাড়লেও এক বছরে সেবা বাড়েনি ট্রেনে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব/সোহেল মামুন
উন্নত যাত্রীসেবার কথা বলে ভাড়া বাড়ানো হলেও ট্রেনে যাত্রীসেবা মোটেই বাড়েনি। এক বছর হতে চললেও আশানুরূপ উন্নত হয়নি ট্রেন ও স্টেশনের সার্বিক পরিস্থিতি। এখনও যাত্রীরা প্রতিনিয়ত নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এখনও ৬০ ভাগ আন্তঃনগর এবং ৮০ ভাগ লোকাল ট্রেন সময়সূচি মেনে চলে না। ট্রেনের ভেতরের নোংরা পরিবেশ, ছিনতাই, যাত্রী হয়রানির অভিযোগও কমেনি। অনেক স্টেশন ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় নিরাপত্তা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রেল কর্তৃপক্ষ। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই বছরের ১ অক্টোবর থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়। কাগজে-কলমে ৫০ ভাগ ভাড়া বাড়ানো হলেও বেড়েছে ৫০ থেকে ১১০ ভাগ পর্যন্ত। সেবার মান, সময়সূচির প্রসঙ্গ এড়িয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক
আবু তাহের সমকালকে বলেন, ২৬০টির বেশি যাত্রী কোচ সংযোজন করা হয়েছে। বহরে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত লোকোমোটিভও। এসব উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে সেবা বেড়েছে। সেইসঙ্গে বছরে লোকসানও কমেছে ২৮০ কোটি টাকা।
রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সমকালকে বলেন, রেলের সেবা বাড়ানো চলমান প্রক্রিয়া। এখন পর্যন্ত রেলস্টেশন উন্নয়ন, বগি সংযোজন, নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত করা, পুরনো কোচ ও লোকোমোটিভ সংস্কার করে সেবা বাড়ানো হয়েছে। কোচ ও স্টেশনের পরিবেশ উন্নত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য মতে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে ১৬ বার রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়। ১৯৯২ সালের পর ২০ বছর রেলওয়ের ভাড়া বাড়েনি। দীর্ঘ এ সময়ে সড়কপথে বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য বাহনের ভাড়া বাড়ে প্রায় ২শ’ শতাংশ। এছাড়া নৌপথে ৪শ’ শতাংশ, বিমানে ৩শ’ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ২৬২ শতাংশ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও রেল উপকরণের দাম বেড়েছে ২৬৪ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে রেলওয়ের খরচের চেয়ে আয় কম হওয়ায় ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ৫০ শতাংশ যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধি করে। পণ্য ও পার্সেল পরিবহনে ভাড়া বাড়ানো হয় যথাক্রমে ১০০ ও ২০০ শতাংশ। মূলত এ ভাড়া বৃদ্ধির উদ্দেশ্য সেবা বৃদ্ধি ও লোকসান কমানো।
সূচি বিপর্যয় : কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে নথিপত্র ঘেটে সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন ছাড়ার হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার ১২টা পর্যন্ত ১৮টি ট্রেনের মধ্যে ১০টি ট্রেন বিলম্বে ছেড়ে যায়। এরমধ্যে চারটি আন্তঃনগর ও ছয়টি লোকাল ট্রেন। একদিন আগে ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তঃনগর ২৬টি ট্রেনের মধ্যে ১৬টি, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৭টি ট্রেনের মধ্যে ৬টি, ২৩ সেপ্টেম্বর ২৫টি ট্রেনের মধ্যে ৯টি এবং ২২ সেপ্টেম্বর ১৭টি ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে। রেলে বার্ষিক গড় প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, গত বছর মিটার গেজ রুটের মাত্র ৪৬ ভাগ আন্তঃনগর ট্রেন সঠিক সময়ে ছেড়ে গেছে। আর ব্রড গেজের ৭৫ দশমিক ২ ভাগ সঠিক সময়ে ছেড়েছে। পক্ষান্তরে কয়েকদিনের সিডিউল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ৬০ ভাগ আন্তঃনগর ও ৮০ ভাগ লোকাল ট্রেন সময়সূচি মানছে। অবশ্য রেলের বার্ষিক প্রতিবেদনে আধঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বকে সঠিক সময় ধরা হয়েছে।
যাত্রী দুর্ভোগ : কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনে অপেক্ষারত রফিকুল ইসলাম নামে ময়মনসিংহের এক যাত্রী বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহের আগের ভাড়া ছিল ৬০ টাকা, বর্তমানে করা হয়েছে ১১০ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী বাড়ানোর কথা ছিল ৩০ টাকা। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভাড়া বাড়ানো হলেও ট্রেনের সেবার মান বাড়ানো হয়নি। সিটে বসে থাকা এ যাত্রী উপরে আঙুল উচিয়ে বললেন, বগির অধিকাংশ ফ্যান চলে না। রাতে বাতিও জ্বলে না। তাহলে সেবার মান কীভাবে বাড়ল? আরেক যাত্রী ফয়সল বলেন, জামালপুরগামী কমিউটার ট্রেনে আগের ভাড়া ছিল ৭০ টাকা। এখন হয়েছে ১৫০ টাকা। এ যাত্রীর বগিতে উঠে দেখা গেছে, সিট ছিঁড়ে নারকেলের ছোবড়া বেরিয়ে গেছে। কোচের ভেতরে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ। কয়েকটি বগি ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বগির জানালার গ্গ্নাস ভাঙা। নষ্ট অ্যালুমিনিয়ামের শাটারও। চট্টগ্রামের অপর এক যাত্রী জানান, রেলের ভাড়া বাড়ানোর কথা ৫০ শতাংশ। সে হিসাবে ঢাকা-চট্টগ্রামের ভাড়া হওয়ার কথা ৩শ’ টাকা। ভাড়া নেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৩শ’ টাকা করে। রাজশাহীগামী ট্রেনগুলোর এসি কোচের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সাড়ে তিনশ’ টাকার ভাড়া হয়েছে ৬০৫ টাকা। নিয়মিত চলেন এমন কয়েকজন যাত্রী জানালেন, এসি কোচে রাতে টিকিট ছাড়াই যাত্রী ওঠানো হয়। এসব যাত্রীর কাছ থেকে রেলের কর্মচারীরা টাকা নেয়।
বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দু-চারটি আন্তঃনগর ট্রেন ছাড়া প্রায় সব ট্রেনের ভেতর ময়লা-আবর্জনায় ভরা। লোকাল ট্রেনগুলোতে দুর্গন্ধের কারণে বসাও যায় না। আসনের অধিকাংশই ছেঁড়া, পোকামাকড়ে ঠাসা। বৃষ্টি আর টয়লেটের ময়লার পানিতে সয়লাব কামরার ফ্লোর। টয়লেট বন্ধ, খোলা থাকলেও পানি থাকে না। নড়বড়ে ও ভাঙা জানালা। লোকাল ট্রেনে ছাড়পোকা আর মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। বলাকা ট্রেনের কয়েকটি বগিতে উঠে দেখা যায়, সিট ভাঙা। একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের ৮০১৮, ৬০৪৩ ও ৬০৬৫ নম্বর বগিতে উঠে দেখা যায়, ময়লা-আবর্জনায় ভরা। টয়লেটগুলোর অবস্থা ব্যবহারের অনুপযোগী। কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, সুরমা মেইলের দু’একটি বগি নতুন। পুরনো বগির অবস্থা যাচ্ছেতাই। আন্তঃনগর ট্রেনের ক্যান্টিনের খাবারেও উচ্চমূূল্য রাখার অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী।
নিরাপত্তা : ট্রেনের ভ্রমণকারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন মাঝে মধ্যে। গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে সীতাকু এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এতে গুরুতর আহত হন টঙ্গী এলাকার ব্যবসায়ী আবুল কাসেম। এ ঘটনার এক মাস আগে ১০ আগস্ট রাতে ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা ট্রেনে সীতাকু ের ভাটিয়ারী ভাঙা ব্রিজ এলাকা অতিক্রমকালে দুর্বৃত্তের ছোড়া পাথরের আঘাতে প্রাণ হারান প্রীতি দাশ নামে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী। এছাড়াও গত মাসে কুষ্টিয়ায় দুর্বৃত্তের ছোড়া পাথরে আহত হন ট্রেনের এক চালক। চলতি মাসেও একজন বিদেশি পাথর নিক্ষেপে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার বাইরেও প্রায় সময়ই চলন্ত ট্রেনে ডাকাতি, ছিনতাই, পকেট মার, বগি লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। ফলে যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, খুলনা ও জামালপুর লাইনের বেশ কয়েকটি ট্রেনের যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্রেন ছাড়ার পর চোর-বাটপারদের সঙ্গে হকারদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় ট্রেন। যাত্রীবেশে অজ্ঞান ও ছিনতাই পার্টির তৎপরতাও রয়েছে। ছাদেও থাকছে এক ধরনের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিনতাই দলের সদস্য। গত ছয় মাসে ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চারবার ছাদ থেকে যাত্রী ফেলা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ভাড়া বৃদ্ধির রকমফের :সরকারি প্রজ্ঞাপনে মূলত ৫০ ভাগ ভাড়া বাড়ানো হলেও বাস্তবে রেলের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, রেলওয়ের ভাড়া বৃদ্ধির ফর্মুলা অনুযায়ী কোথায়ও ৫০, কোথাওবা ৬০-৭০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কিছু কমিউটার ট্রেনে ভ্যাট যুক্ত হয়ে ভাড়া দ্বিগুণও হয়েছে। প্রধান কমার্শিয়াল ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ বলাটা ঠিক হবে না। কিছুক্ষেত্রে আরও বেশি বেড়েছে। তিনি জানান, যাত্রী ভাড়ার পাশাপাশি কনটেইনার ও পার্সেলের ক্ষেত্রে ৫০ ভাগ ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন ভাড়া হিসেবে প্রতি কিলোমিটারের যাত্রীপ্রতি ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগে ছিল ২৪ পয়সা।
এদিকে আয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও পণ্য পরিবহনকে গুরুত্ব দেয় না রেল কর্তৃপক্ষ। যাত্রী পরিবহনে প্রতি ট্রিপে রেলের আয় দেড় লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতি ওয়াগন পণ্য পরিবহন করে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় হয়ে থাকে। যাত্রী পরিবহনের চেয়েও পণ্য পরিবহনে আয় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও এ দিকে আগ্রহ নেই কর্তৃপক্ষের। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ইঞ্জিনের অভাবে প্রয়োজনীয় ট্রেন চালানো যায় না।
কমেনি লোকসান : রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলে গত অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৮১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তার আগের বছর ছিল ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। রেলওয়ের মহাপরিচালক আবু তাহের বলেন, কী পরিমাণ লোকসান কেমন কমেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাবে আগামী অর্থবছরে। এখনও পর্যন্ত তাদের যে হিসাব তাতে ২৮০ কোটি টাকা লোকসান কমেছে। ভাড়া বৃদ্ধির সময় বলা হয়েছিল অন্তত ৩০০ থেকে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা লোকসান কমবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সব প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। জনবলের অভাবে অনেকক্ষেত্রে সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। আশা করি এসব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। পর্যায়ক্রমে রেল লাভের মুখ দেখবে।’