ভারতীয় মডেল কেন প্রযোজ্য নয়…মিজানুর রহমান খান

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বাগ্রে দরকার দলীয় সরকারের মন্ত্রী ও সাংসদদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন তেমন কোনো কিছুই প্রস্তুত করেনি। ভারতের আদর্শ আচরণবিধিতে ক্ষমতাসীন দলকে রুখতে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে আইনের জোরে নয়, মূলত সাংস্কৃতিক কারণে। তাদের সুপ্রিম কোর্ট ইসির মহত্তম ঢাল ও লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করে। যুদ্ধাপরাধীকে নির্বাচনে অযোগ্য করার চমক দেখা যাচ্ছে। আমাদের দরকার ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের চমক। আমাদের দণ্ডিত ব্যক্তিরা অন্য রকম। তাঁদের ছাড়া অবাধ নির্বাচন চলে না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারি দল ও সংসদের মাথার ওপর দিয়ে চলেন। এবারে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দণ্ডিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। আসুন এটা আমরা নকল করি। কিন্তু নকল করলে আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হারাতে হবে যে! তিনি দণ্ডিত হয়ে সুপ্রিম কোর্টেও পদ হারান। কিন্তু সরকার তাঁকে স্বপদে রেখেছে। নির্বাচনী ‘ওম শান্তি’র চাবি এখন তাঁরই পকেটে।
২০০২ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে ভারতের ইসি আদেশ জারি করে যে প্রত্যেক প্রার্থীকে এমন একটি হলফনামা দিতে হবে, যাতে প্রত্যেকের ফৌজদারি অপরাধবিষয়ক পূর্ব বৃত্তান্ত, নিজের ও স্ত্রীসহ পোষ্যদের সম্পদের বিবরণী, শিক্ষাগত যোগ্যতাসংক্রান্ত তথ্য থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো মনে করল ইসি ও বিচার বিভাগ তাদের এখতিয়ারের বাইরে ক্ষমতা খাটাচ্ছে। ২০০২ সালের ৮ জুলাই ২১টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সিদ্ধান্ত নিলেন ইসির সিদ্ধান্ত তাঁরা মানবেন না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ধমক খেয়ে তাঁরা চুপ। আমরা কী দেখলাম। বিএনপির মদদে অনেক নাটকের পর আবু সাফার মামলায় তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে যেটুকু অর্জিত হলো, তার লাভ জনতার হিসাবে জমা পড়েনি।
২০০৭ সালে নরেন্দ্র মোদি ও সোনিয়া গান্ধী একসঙ্গে অভিযুক্ত হন। মোদিকে লেখা চিঠিতে কোনো আইন বা বিধিবিধানের বরাত নেই। তারা মোদিকে সুপ্রিম কোর্টের ১৯৯৪ ও ১৯৭৫ সালের রায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৯৪ সালের একটি রায় থেকে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নেতাদের কথাবার্তায় যদি সংযম ও শিষ্টাচারের ঘাটতি ঘটে, তাহলে তা নির্বাচনী প্রচারণাকে বিষিয়ে তোলে এবং তা তৃণমূলের কর্মীদেরও সংক্রমিত করে। তাঁদের অসতর্ক কথাবার্তা সহিংসতা, যা কিনা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নকে তীব্র করে তুলতে পারে।’
আমি বেশি উদ্ধৃতি দেব না, কারণ তা ক্লান্তিকর, উলুবনে মুক্তা ছড়ানো। তবে আমাদের ইসি কোনো জাতীয় নেতাকে হুঁশিয়ার বা তিরস্কার করতে যদি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভয় দেখাতে চায়, তাহলে খুব বেশি যে পাবে, তা কিন্তু নয়। ইসি সোনিয়া গান্ধীকেও ১৯৯৪ সালের রায় থেকে ওই একই উদ্ধৃতির বরাত দিয়েছে। আর বাংলাদেশে এখন যেভাবে পাইকারিভাবে প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন চলেছে, তাতে সোনিয়া গান্ধীকে লেখা ভারতীয় ইসির অবস্থানটি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। সোনিয়াকে তারা বলেছে, আপনাকে গঙ্গী রেড্ডি বনাম আনজানিয়া রেড্ডি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যেখানে বলা আছে ‘একজন ব্যক্তির চরিত্রের সঙ্গে তাঁর মানসিক বা নৈতিক প্রকৃতি সাধারণভাবে সম্পৃক্ত থাকে।…একজন ব্যক্তির চরিত্র বা ভাবমূর্তির জন্য এটাই বেশি ক্ষতিকর, যদি তাঁকে বলা হয় যে তিনি একটি হত্যাকাণ্ডকে উসকে দিয়েছেন।’ ১৯৬২ সালে দেওয়া ইন্দার লাল বনাম লালসিং মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বলা কথাও সোনিয়াকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রার্থীকে একজন প্রতারক কিংবা হত্যাকারী বলাটা ব্যক্তিকে আহত করে। কমিশন এরপর সোনিয়াকে বলে, আমরা মনে করি আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে। কমিশন তাই অসন্তোষ ব্যক্ত করছে এবং আশা করছে যে ভবিষ্যতে আচরণবিধির নন্দিত বিধানাবলি আক্ষরিক ও চেতনাগত উভয় অর্থে মান্য করা হবে। ভারতের ইসিকে অনুসরণ করে আমাদের সোনিয়াদের চিঠি লিখতে হলে তো কলমের কালি ফুরাবে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পাঁচজন সদস্যই নাকি একমত যে তাঁরা নির্বাচনের তারিখ জানতে সরকারকে চিঠি দেবেন না। দিলে তাঁরা সরকারের আজ্ঞাবহ হবেন। অথচ ঘটনাটা ঠিক উল্টো। তাঁরা এখন চিঠি দিলে সেটা সরকারের সুবিধাজনক সময়ে ও স্টাইলে নির্বাচন পরিচালনায় বাগড়া দেবে। মনে হচ্ছে, সরকার এখন কেবল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার স্বপ্নেই বিভোর নয়, এ ক্ষেত্রে তারা সংবিধানকে সম্পূর্ণ নিজেদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে পার পেতে চাইবে।
ভারতের আচরণবিধিও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে কার্যকর হয় এবং তা নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকে। তবে সেখানে প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে তফসিল ঘোষণার আগেই নীতিহীন নির্বাচনী প্রচার চালানো প্রায় অচিন্তনীয়, অনেকে তো নির্বাচনেই অংশ নেন না। বাংলাদেশ দাবি করে, তাদের আচরণবিধি আইনের মর্যাদাসম্পন্ন। কিন্তু ভারতেরটি তা নয়। কিন্তু এটাই সত্য যে বাংলাদেশ আইন করে যা পারে না, ভারত আইন না করেও তার চেয়ে ভালো পারে।
আমরা এখনই কমিশনের কাছে নতুন নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ আশা করতে পারি। কারণ, তা-ই যুক্তিসংগত ও সংবিধানসম্মত। আগেও লিখেছি, এ ধরনের একটি সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণের প্রশ্ন নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে আলোচিত হতে পারে। ভারতে এ কাজটি সংসদ মন্ত্রণালয় করে থাকে। ভারত সরকারের ১৯৬১ সালের অ্যালোকেশন অব বিজনেস রুলস অনুযায়ী পার্লামেন্ট বিলোপের সিদ্ধান্তটি সংসদীয় মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত। যদিও এই দায়িত্ব তাদের কিন্তু বিরল ক্ষেত্রেই লোকসভা কখন বিলুপ্ত হবে, তা নির্ধারণে স্বপ্রণোদিত হয়ে তারা উদ্যোগ নিয়ে থাকে। সপ্তম ও দশম লোকসভা ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অবশ্য সুয়োমোটো উদ্যোগ নিয়েছিল। ভারতে তাই বাস্তবে কোনো আনুষ্ঠানিক নোট ছাড়াই মন্ত্রিসভা সংসদের মেয়াদ পূরণ কিংবা আগাম নির্বাচনজনিত কারণে সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর কোনো তুলনা চলে না। ভারতে নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে। তাই সেখানে বিতর্ক আছে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ পাওয়ামাত্রই রোবটের মতো কাজ করবেন কি না। অনেক জোরালো মত সেখানে আছে, এটা রাষ্ট্রপতির ডিসক্রিশন। ভারতের অনেক রাষ্ট্রপতি সেভাবে ক্ষমতা খাটানোর নজিরও স্থাপন করেছেন। বাহাত্তরের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে রোবট বানানোর কোনো চেষ্টাই বাকি রাখা হয়নি। কিন্তু তার পরও যেটুকু বাকি ছিল, সেটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ১৯৯১ সালে। খালেদা জিয়ার পায়ের মাপের সেই জুতা তাঁর উত্তরসূরির পায়েও লাগছে। সংসদ ভেঙে দিতে প্রধানমন্ত্রীর ‘লিখিত পরামর্শ’ লাগার ফ্যাসিবাদী উদ্যোগটি ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ বাতিল করেনি। সুতরাং সাংবিধানিকভাবেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এক নন। এবং আমাদের খুবই সন্দেহ যে ভারতীয় রুলস অব নিজনেসের মতো বাংলাদেশের রুলস অব বিজনেসে এ ধরনের কোনো সংশোধনী আনা সম্ভব কি না। ধরে নিচ্ছি, বাংলাদেশের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীসর্বস্ব হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনেরা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাকে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার স্বার্থে হলেও ২০ অক্টোবর বা তার আগে বর্তমান সংসদ রেখে বা না রেখে সেই সিদ্ধান্ত আমাদের জানিয়ে দেবে। তাই নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ তারা নির্দিষ্টভাবে জানাবে। ইসি সচিবের মুখে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে নির্বাচনের তথ্য প্রকাশে সিইসির ব্যক্তিগত ইঙ্গিত ছিল বলে জানি। তাহলেই প্রশ্ন, ইসি কি ইঙ্গিতে চলবে?
ভারতীয় আইনে বলা আছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ‘সংসদীয় মন্ত্রী/প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশক্রমে সংসদ মন্ত্রণালয় একটি “নোট ফর দ্য ক্যাবিনেট” তৈরি করবে। মন্ত্রিসভা যখন সেই প্রস্তাব অনুমোদন করবে, তখন সংসদমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে লেখা একটি নোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির অনুমতির জন্য পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতি তাতে সই দেওয়ার আগে সংসদীয় মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কনফারমেশন চাইবেন। শেষ অধিবেশন শেষ করার আগে স্পিকারের সচিবালয় ও সংসদ সচিবালয়ের মধ্যে যোগাযোগ ঘটবে। চিঠি চালাচালি হবে।’
ইসিকে বুঝতে হবে তারা আজ্ঞাবহ বলে প্রতীয়মান হবে, যদি তারা তাদের নীরবতা বজায় রাখে। ভারতের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা ধার করে যা করার সম্পূর্ণ নিজেদের মতোই করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে ফেয়ার নির্বাচনের কোনো ফেয়ার প্রস্তুতি কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।
লোকসভার মেয়াদ পূরণের পূর্ববর্তী ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে, এই অবস্থাটিও বাংলাদেশ থেকে পৃথক। ভারতীয় সংসদ বিশারদ কাউল অ্যান্ড শাকধার লিখেছেন, ‘শেষ অধিবেশনটি শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেল সংসদমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোঁজ নেন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ করা তারিখ সংসদমন্ত্রী নিজেই সংসদ সচিবকে জানিয়ে দেন। স্পিকার তাতে সম্মতি দিলে লোকসভার সচিব তা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন। এ সময় সংসদ ভেঙে দেওয়ার তারিখ নির্দিষ্ট করে একটি খসড়া আদেশও সংসদ সচিবালয় থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে যায়। রাষ্ট্রপতির সই করা আদেশ যেদিন সচিবালয়ে এসে পৌঁছায়, সেদিনের এক্সট্রা অর্ডিনারি গেজেটে তা ছাপা হয়। একই দিনে লোকসভা সচিবালয় গণমাধ্যম ও সাংসদদের জন্য যথাক্রমে একটি ইশতেহার ও বুলেটিনে একটি প্যারাগ্রাফ প্রকাশ করে।’ কাউল অ্যান্ড শাকধার ফুটনোটে লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির এ-সংক্রান্ত আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়। তবে তা কদাচিৎ ভূতাপেক্ষ বা ভবিষ্যৎসাপেক্ষ হয়।’ আমি চাই আমাদের স্পিকার এ ক্ষেত্রে জনস্বার্থে ভারতকে অনুসরণ করুন। রেওয়াজ গড়তে সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর মাধ্যমে লিখিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোঁজ নিন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com