হঠাৎ বেড়েছে লোডশেডিং

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আসছে আজ

ভারতের সরকারি খাত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ দেশের জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার। আজ শুরু হবে ৫০ মেগাওয়াট দিয়ে। আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০ থেকে ১৭৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালিত হবে। পরে পর্যায়ক্রমে আমদানির পরিমাণ বাড়বে।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা গ্রিড উপকেন্দ্রে গিয়ে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ভিডিও সম্মেলন করে বিদ্যুৎ আমদানির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছরের জন্য ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনাবেচার চুক্তি হয়েছে।এদিকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হওয়ার প্রায় ১০ দিন আগে থেকে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়ে গেছে। রাজধানীতে দিনের বেলা এলাকাভেদে চার-পাঁচবার লোডশেডিং হচ্ছে। রাতে হচ্ছে আরও দু-তিনবার। গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সেখানকার অবস্থা আরও খারাপ। খুলনা, বরিশাল, বগুড়া, দিনাজপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও ব্যাপক লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।সরকারি সূত্রগুলো জানায়, হঠাৎ লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া। প্রথমত, রমজান মাসের পর সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ শুরু করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি পড়েছে। দ্বিতীয়ত, ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্রের চারটি কূপ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখায় ঘাটতি আরও বেড়েছে। সূত্রগুলো জানায়, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলেও তা এই লোডশেডিং কমাতে তেমন কাজে আসবে না। কারণ, গ্যাসস্বল্পতার কারণে চাহিদার তুলনায় অন্তত দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। আর ভারত থেকে পর্যায়ক্রমে বেড়ে ২৫০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে লেগে যাবে অক্টোবরের প্রায় পুরোটাই।

এ বিষয়ে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আজ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি করা বিদ্যুৎ সঞ্চালন পরীক্ষামূলক হিসেবেই ধরা হবে। যদিও ওই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আসবে এবং গ্রাহকেরা তা ব্যবহারও করবেন। এই সময়ের মধ্যে গ্রিড উপকেন্দ্রের সামান্য কিছু অসমাপ্ত কাজ শেষ করা হবে। ১ অক্টোবর ‘জিরো আওয়ার’ (৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২টা) থেকে বাণিজ্যিক সরবরাহ হিসেবে ধরা হবে।

সূত্রগুলো জানায়, ভারতের সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে আমদানি করা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে নভেম্বরে। এর প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে গড়ে প্রায় ছয় টাকা, যা বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের দামের প্রায় সমান।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। ২০১২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানি শুরুর কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি টাওয়ার তৈরির জায়গা পেতে দেরি হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এই বিদ্যুৎ আমদানির মধ্য দিয়ে সার্ক বিদ্যুৎ গ্রিড চালুর প্রক্রিয়াও শুরু হলো।

লোডশেডিং: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। এতে লোডশেডিং বেড়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, রমজান মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট। অথচ গত কয়েক দিন দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮৫ কোটি ঘনফুট।

গতকাল বৃহস্পতিবার পিডিবির হিসাবেই বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট। তবে এই হিসাবে কিছু গরমিল আছে। পিডিবি গতকাল সর্বোচ্চ চাহিদা ধরেছে ছয় হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরেছে পাঁচ হাজার ৭৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চাহিদা এখন সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ ছাড়া উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবহূত হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে (অক্সিলারি) হিসেবে। গত কয়েক দিন তীব্র গরম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।

বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। গ্যাসের উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়েছে প্রায় ৭৬ কোটি ঘনফুট। কিন্তু পুরোনো কিছু কূপের উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রকৃত উৎপাদন বেড়েছে ৫৬ কোটি ঘনফুটের মতো। তবে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কাটাতে নেওয়া ‘জ্বালানি বহুমুখীকরণ’ বা মিশ্র জ্বালানি ব্যবহারের (এনার্জি মিক্স) উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে বর্তমান সরকারের প্রথম বছরে যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে সার কারখানা বন্ধ রাখতে হতো, এখনো তেমন করতে হচ্ছে। একইভাবে সার কারখানা চালু রাখতে গ্যাস দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।