চলে অস্ত্রোপচারসহ সব চিকিত্সা, ৮ জনের কারাদণ্ড

ভুয়া বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দেশজুড়ে রমরমা ব্যবসা

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক পরিচয়ে বছরের পর বছর ভুয়া চিকিত্সকরা সেবার নামে মানুষ হত্যা করে আসছে। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এখানেই শেষ নয়। ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা তাদের আইনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য গড়ে তুলেছেন পৃথক কাউন্সিল। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম মহানগরীতে র্যাবের মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে এরকম আটজন ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে আটক করেছে। তাদের কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ভুয়া চিকিত্সা সনদ নিয়ে বহু বছর রোগীদের চিকিত্সা সেবা দেয়ার বিস্তারিত তথ্য মোবাইল কোর্টের কাছে জানিয়েছেন এ আটজন ভুয়া চিকিত্সক।

মোবাইল কোর্ট আটক ৮ ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের প্রত্যেককে ২ বছর করে কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা প্রদান করেছে। অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত ভুয়া চিকিত্সকদের ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার রয়েছে। ভিজিলেন্স টিম গঠন করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

র্যাবের কাছে ঐ আট ভুয়া চিকিত্সক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) চিকিত্সা সনদ প্রদানের জন্য কাউন্সিল রয়েছে। ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরাও গড়ে তুলেছে পৃথক কাউন্সিল। তাদের এ কাউন্সিলের নাম বাংলাদেশ কম্বাইন্ড মেডিক্যাল কাউন্সিল। এ কাউন্সিলের মাধ্যমে ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা সনদ ও রেজিস্ট্রেশন পেয়ে থাকেন। জেল জরিমানা, আদালত ও প্রশাসন মোকাবেলায় চিকিত্সকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মতো তারা গড়ে তুলেছেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। এ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ১১৭ জন ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। প্রতি মাসে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত হারে অ্যাসোসিয়েশনের চাঁদা জমা দিয়ে থাকেন তারা।

এ সব ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক র্যাবের কাছে জানিয়েছে, তারা ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার কিংবা প্রাইভেট চেম্বার খুলে চিকিত্সা দিয়ে আসছে। যে কোন ধরনের রোগী আসলে তারা চিকিত্সা ও অপারেশন করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে ৯৮ ভাগ রোগীর জটিলতা দেখা দেয়। এসব ক্লিনিকে অপারেশনসহ সব চিকিত্সা চলে। পরবর্তীতে কোন রকম জটিলতা তৈরি হলে তারা ঐসব রোগীকে সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। তারা জানান, অনেক সময় এ ধরনের রোগী নানা জটিলতার শিকার হয়ে মারা যান। যারা বেঁচে থাকেন তারা জীবিত থেকেও অনেকটা মৃত।

মোবাইল কোর্টের কাছে ঐ ৮ ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক আরো জানান, তারা প্রতি মাসে সব খরচ বাদ দিয়ে নিম্নে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকেন। রোগী বাগিয়ে আনার জন্য তাদের রয়েছে দালাল।

চট্টগ্রামে ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্রে ২ জন রোগী মারা যান। এ সংবাদের প্রেক্ষিতে র্যাব চট্টগ্রাম মহানগরে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক চেম্বারে অনুসন্ধান চালায়। দীর্ঘদিন বিপুল সংখ্যক ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক সেজে এক শ্রেণির লোক মহানগরী ও আশপাশে চিকিত্সা চালিয়ে আসছে। গতকাল র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট চেম্বারে অভিযান চালায়। ৮ জন ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে আটক করেন। অনেকে পালিয়ে যান।

অভিযোগ পাওয়া যায়, প্রকাশ্যে চিকিত্সার নামে রোগী মারার বাণিজ্য তদারকিতে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এক শ্রেণির বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নির্ধারিত হারে মাসোহারা দিয়ে চিকিত্সা সেবার নামে প্রকাশ্যে গলাকাটা বাণিজ্য করে আসছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের তিন কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। বিএমডিসির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবু শফি আহমদ আমিন বলেন, ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিমালা রয়েছে। শাস্তি বাড়িয়ে নতুন অধ্যাদেশ জারি করার ব্যবস্থা করা হয়। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সকল স্বাস্থ্য প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ভুয়া চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিএমডিসি থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এর বাইরে বিএমডিসির কিছুই করার নেই বলে তিনি জানান।

৮ ভুয়া চিকিত্সক হচ্ছেন—বন্দরটিলার ডা. এমএইচ কবির, তিনি এমবিবিএস, এমডি, পিএইচডি মেডিসিন ও চর্ম, যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ। নিউমুরিং এলাকায় ডা. এম আর নিজামী, তিনি এমবিবিএস, পিজিটি, জেনারেল ফিজিশিয়ান এন্ড সার্জন, মা ও শিশু, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ। আসকারাবাদ এলাকার ডা. হারুন অর রশীদ, তিনি শুধু এমবিবিএস নামের পড়ে লাগিয়েছেন। নিউমুরিং এলাকার ডা. এমজি ভূঞা, তিনি এমবিবিএস, এফসিপিএস (শিশু), এফসিএফপি (ডিইএম), এমডি (ইন্টা. মেডিসিন), শিশু, ডায়াবেটিস, মেডিসিন, হূদরোগ, বাত রোগ, চর্ম ও যৌন রোগ ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। পাহাড়তলী এলাকার ডা. অসীম সেন, তিনি এমবিবিএস এবং জেনারেল ফিজিশিয়ান বিশেষজ্ঞ। জামাল খান এলাকার ডা. গোপাল মজুমদার, তিনি এমবিবিএস, এমডি (ক্যাল) ফেলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাত, ব্যথা ও গবেষক ও বিশেষজ্ঞ। নতুন বাজার পাহাড়তলীর ডা. আর জে সাহা জীবন, তিনি এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিসিন, মা ও শিশু। জিটি রোড পাহাড়তলীর ডা. নেপাল দাশ গুপ্ত, তিনি এমবিবিএস, পিজিটি, (মেডিসিন ও শিশু), এফএসপিএসও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। এ ৮ জন ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তাদের নামের সামনে এমবিবিএস, বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি কোন সনদ মোবাইল কোর্টকে দেখাতে পারেননি। এগুলো সবই ভুয়া ডিগ্রি। এ সকল ডিগ্রি দেখে রোগী তাদের কাছে আসে। তারা কেউ কোন মেডিক্যাল কলেজে পড়াশুনা করেনি। তারা শুধু ওষুধের দোকানে কাজ করেছে, ডাক্তারের সহকারী ও ক্লিনিকে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর চাকরি করে তারা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের নাম ব্যবহার করে চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছেন ৮ থেকে ১০ বছর ধরে। তাদের মধ্যে গোপাল মজুমদার কলকাতায় মামার সহকারী হিসাবে কাজ করে তিনটি উচ্চতর ডিগ্রি নামের সামনে ব্যবহার করে ১০ বছর চিকিত্সা করে আসছেন বলে মোবাইল কোর্ট জানান।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা ২০/৩০টি ওষুধের নাম জানে। এটা তাদের মূল পুঁজি। ওষুধের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু এন্টিবায়োটিক। এ সব ওষুধের মধ্যে প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে আলাপ করে ৫ থেকে ১০টি ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেয়। খাওয়ার পর সাময়িকভাবে অনেকে ভাল হয়ে যায়। কথায় কথায় উচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে কিডনি ও লিভারসহ শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অকেজোসহ নানা জটিলতা হওয়ার আশংকা বেশি থাকে।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ভুল চিকিত্সা করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার রোগীর সর্বনাশ করছে শতাধিক ভুয়া এমবিবিএস চিকিত্সক। চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসিতে চেম্বার খুলে অবাধে অনৈতিক এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এরা। প্রকৃত এমবিবিএস চিকিত্সকদের বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদন ও সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক হলেও ভুয়া চিকিত্সকরা এসবের তোয়াক্কা করে না।

র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরো জানায়, তাদের স্বার্থরক্ষায় একটি সংগঠনও রয়েছে। নেপাল দাশ ও আর জে সাহা এ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ভুয়া চিকিত্সকদের যাতে সহজে কেউ ধরতে না পারে সেজন্য এ সংগঠনটি কাজ করছে। ভুয়া চিকিত্সকরা তাদের নামের পাশে ডাক্তার লেখার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেছেন বলে তারা জানান।