ভুলে ভরা লীগ ও বিএনপি…আব্দুল কাইয়ুম

‘সংসদ রেখে তো আর নির্বাচন হবে না। আমরা তো ওয়েস্টমিনস্টার টাইপ অব গভর্নমেন্ট অনুসরণ করি। এ পদ্ধতিতে সরকারপ্রধান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব দেবেন। যেমন আমি রাষ্ট্রপতিকে বলব, আমরা অমুক তারিখে নির্বাচন করতে চাই। তিনি ঠিক করবেন সংসদ কবে ডিজলভ হবে, মন্ত্রিপরিষদ ছোট হবে কি না, কতজনের মন্ত্রিসভা থাকবে, এটি সম্পূর্ণ তাঁর এখতিয়ার। তিনি যে নির্দেশ দেবেন, সে অনুযায়ী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন দিন-তারিখ ঠিক করবে।’ (প্রথম আলো, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১২)। এ কথাগুলো বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাত্র এক বছর আগে। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সাংসদ মুজিবুল হকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন ঠিক বিপরীত কথা। সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথা আর শোনা যায় না। এখন তিনি বলছেন, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী তিন মাসেও সংসদ বহাল থাকবে। সংসদ রেখেই নির্বাচন হবে। অবশ্য ওই তিন মাস সংসদ অধিবেশনে বসবে না। মন্ত্রীরা যাঁর যাঁর পদে বহাল থাকবেন। গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গত ১৮ আগস্ট তিনি বলেন, ‘আমি সংবিধানে বিশ্বাস করি। যা হবে সংবিধান মোতাবেক হবে। তার থেকে একচুলও নড়া হবে না।’ (প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০১৩)।সংবিধান তো গত বছরও ছিল, নাকি? তখন তিনি যদি নির্বাচনের সময় সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথা বলতে পারেন, এখন তা খাটবে না কেন? সংবিধান তো যা ছিল তা-ই আছে। তাহলে এখন কি তিনি সংবিধানের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? কোন ব্যাখ্যাটা ঠিক? সংসদ ভেঙে নির্বাচন, নাকি রেখে নির্বাচন? মানুষ তো প্রথমটাই চায়। মানুষের জন্যই যদি রাজনীতি, তাহলে বলতে হয়, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা ঠিক হবে না। তার মানে, এটা অনায়াসে বলা যায় যে আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান বাস্তবতার আলোকে ভুল। যদি ভুল হয়ে থাকে, তা শুধরে নেওয়াই ভালো। প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বরের কথাতেই তিনি ফিরে যেতে চান। নির্বাচনের সময় সংসদ থাকবে না, ভেঙে দেওয়া হবে—এ রকম একটি ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী। যদি সে রকম স্পষ্ট ঘোষণা আসে, তাহলে রাজনীতিতে যে সম্ভাবনার সূচনা ঘটবে, তার সুফল সরকার, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষ—সবাই পাবে। কিন্তু না, এখনো আওয়ামী লীগ সে রকম কিছু বলেনি। তার মানে কি, এটাও ঠিক, ওটাও ঠিক! অর্থাৎ সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনও সংবিধানসম্মত, আবার সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনও সংবিধানসম্মত! দুই বিপরীতের এমন চমৎকার সমাহার আর দেখা যায় না! গোঁজামিল দিয়ে রাজনীতি হয় না। দেশজুড়ে মানুষ বলছে, সংসদ বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। সেখানে সংবিধানের দোহাই দিয়ে সাংসদেরা সদস্যপদ রেখেই নির্বাচন করবেন, তা কী করে হয়। এটা পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে ভুল পথে চলেছে। আসুন, এবার বিএনপির দিকটা দেখি। গত ৪ মে শাপলা চত্বরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হুমকির সুরে বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিতে হবে। না হলে এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে যে সরকার পালাতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, ‘সরকারকে অনেক সময় দিয়েছি, ধৈর্য ধরেছি। হেফাজতের কর্মসূচি না থাকলে ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়ে রাজপথে অবস্থান করতাম…।’  এরপর সরকারকে কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, ‘কোনো ধানাইপানাই করবেন না। ৪৮ ঘণ্টা পর আর সমাবেশের পারমিশনের জন্য অপেক্ষা করব না। যেখানে পারব বসে পড়ব। …’ (প্রথম আলো, ৫ মে ২০১৩)। সেই হুমকি এখন কোথায়? সরকারও পালায়নি, বিএনপিকে পথেঘাটে বসে পড়ে অবরোধ করতে হয়নি। সরকারের পারমিশন নিয়েই তারা গেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ওরা এখন সংলাপের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে। যদিও ঈদের পর থেকে হরতাল-অবরোধের একটি ক্ষীণ আহ্বান দিয়ে রেখেছে। কিন্তু মোটামুটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় ওরা নির্বাচনে যেতে আগ্রহী বলে বিএনপির নেতাদের কথায় জানা গেছে। এমনকি গত রোববার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর ভেতরেই সমাধান সম্ভব। এতই যদি সম্ভব, তাহলে ৪ মে বিএনপি চেয়ারপারসন কেন ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন? ওই সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল কিছুটা উদ্বেগজনক। পরদিন ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ওপর ভর করে কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলার কৌশল কোনো কোনো মহলের হয়তো ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিএনপির ৪৮ ঘণ্টার হুমকি যেন আকস্মিকভাবে আসে। ফলে বিএনপির উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাজনৈতিক মহলে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। যা হোক, পরে বিএনপি ওই অবস্থান থেকে সরে আসে। এখন সমঝোতার দিকে বিএনপি ঝুঁকে পড়ায় প্রশ্ন ওঠে, বিএনপির ৪ মের অবস্থান কি তাহলে ভুল ছিল? যদি ভুল হয়ে থাকে, তাদের তা স্বীকার করা উচিত। ভুল তো হতেই পারে। হেফাজতের মতো একটি উগ্র মতবাদের দলের ওপর ভর করে বিএনপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা কোনো কাজের কথা নয়। ভুল কৌশল থেকে দ্রুত সরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিএনপির চেয়ারপারসন বলতে পারেন, আমরা এখন আর ৪৮ ঘণ্টায় নেই! শুধু এই কথাটিই রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলই আকারে-ইঙ্গিতে সংলাপ-সমঝোতার কথা বলছে। আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপি সংসদে এসে আলোচনার প্রস্তাব দিক। আর বিএনপি বলছে, যেকোনো স্থানে সংলাপ হতে পারে। কিন্তু কোনো দলই কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। সে রকম কোনো লক্ষণও এখন পর্যন্ত নেই। যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একযোগে ঘোষণা করে যে তাদের আগের বিভ্রান্তিকর কথাগুলো ছিল কৌশলগত ভুল এবং সেই অবস্থান থেকে ওরা সরে আসছে, তাহলে আলোচনা ও সমঝোতার একটি নির্ভরযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এবং সেটাই করা দরকার।

আমাদের রাজনীতি বলতে গেলে জোড়াতালি দিয়ে চলছে। একেক সময় একেক কথা। এক কথার সঙ্গে আরেক কথার মিল নেই। নিজের কথার ঠিক উল্টো কথা নেতারা বলে চলেছেন। এ জন্য কোনো অনুশোচনা নেই। একেবারে নির্বিকার! মূল দলগুলো এমন ভুলভাল, উল্টাপাল্টা করে বলেই দেশের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তখন বিদেশিরা দরদি সেজে উপদেশ বিতরণ করতে ভিড় জমান। সর্বশেষ চিঠি দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তিনি দ্রুত ইতিবাচক সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়েছেন। এর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন টেলিফোনে দুই নেত্রীকে সংলাপের অনুরোধ করেছেন। কোনো ওষুধেই কাজ হচ্ছে না। বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। গতকালও খবর বেরিয়েছে যে ব্যবসা প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ আট ধাপ এগিয়েছে। বিশ্বের ১৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১১০। আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি মুডিজ ও এসঅ্যান্ডপির মূল্যায়নে চার বছর ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচকগুলো বেশ ভালো বলে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। ফাইন্যানশিয়াল ইনক্লুশনে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, শ্রীলঙ্কার পরেই বাংলাদেশ। এত রাজনৈতিক ঝড়ঝাপ্টা, হরতাল-অবরোধের পরও যদি বাংলাদেশ এত এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে তো বলতে হয়, বাংলাদেশে রয়েছে সম্ভাবনার সোনার খনি। আমরা সেই সম্ভাবনার দ্বার কতটা উন্মুক্ত করতে পারব, তা নির্ভর করে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিচক্ষণতার ওপর।

আব্দুল কাইয়ুমসাংবাদিক।

quayum@gmail.com