রংপুরের জনসভায় খালেদা জিয়া

ভোট চাইতে নয়, পাতানো নির্বাচন রুখতে এসেছি

নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে মানা হবে না ঘোষণা দিয়ে আবারও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
গতকাল রবিবার বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১৮ দলীয় জোটের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া এ দাবি জানান। বৃষ্টির মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, ‘২০০৭ সালে আপনি বিচারপতি কে এম হাসানকে মেনে নেননি। দলীয় ব্যক্তি হিসেবে, আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে আপনাকে নির্বাচনের সময় সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না।’
রংপুরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি ভোট চাইতে আসিনি। সরকারের প্রতিহিংসামূলক পাতানো নির্বাচন আপনাদের রুখতে হবে। প্রতিহত করতে হবে।’ এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দাবি- নির্দলীয় সরকার। জনগণের দাবি- হটাও আওয়ামী লীগ, বাঁচাও দেশ।’
প্রশাসন ও পুলিশের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘পাতানো নির্বাচনে আপনারা অংশ নেবেন না। সরকারের অন্যায় আদেশ-নির্দেশ মানবেন না। প্রশাসনকে বলব, নির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে থাকুন। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি। এ দাবি মেনে নিলেই আলোচনা হবে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের সময় আছে। সংসদে নির্দলীয় সরকারের বিল এনে পাস করুন। আমরা ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেখব সরকার কী করে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বিকেল পৌনে ৫টায় বক্তৃতা শুরু করেন। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার বক্তব্যে তিনি বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। জনসভাস্থল থেকে পশ্চিমে মেডিক্যাল কলেজ মোড় ও সেনানিবাস চেক পোস্ট, দক্ষিণে কাচারিবাজার-জজ কোর্ট, উত্তরে রাধাবল্লভ ও হনুমানতলা মোড়, পূর্বে জাহাজ কম্পানির মোড় পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিকৃতি সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুনে পুরো জনসভাস্থল ও আশপাশের এলাকা ছেয়ে যায়।
জনসভার মধ্যেই জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় জাপার সাবেক দুই সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী সরকার ও শাহ সোলায়মান ফকির এবং তারাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুন্নবী দুলাল, তারাগঞ্জ উপজেলা জাপার আহ্বায়ক আহসান হাবিব খালেদা জিয়ার হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। অষ্টম জাতীয় সংসদে মোহাম্মদ আলী রংপুর-২ আসনে এবং সোলায়মান রংপুর-৫ আসন থেকে লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুই সাবেক এমপির সঙ্গে তাঁদের সমর্থকরাও বিএনপিতে যোগ দেন।
২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তর রংপুরে বিএনপি কোনো আসনে বিজয়ী হতে পারেনি।
জনসভায় খালেদা জিয়া বলেন, ‘আজকের জনসভা দেখে মনে হলো দীর্ঘদিন পর রংপুরবাসী জেগে উঠেছে। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে বর্তমান সরকার উন্নয়নের নামে মিথ্যাচার করেছে। গত পাঁচ বছরে রংপুরে কোনো উন্নয়ন হয়নি। উন্নয়ন যা হয়েছে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাসন্তীকে জাল পর্যন্ত পরতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস বাড়ে, দ্রব্যমূল্য বাড়ে এবং দলীয়করণ হয়। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ বলেছিল, ঘরে ঘরে চাকরি ও ১০ টাকা কেজি দরে চাল, বিনা মূল্যে সার দেবে। কিন্তু এর কোনোটাই এই সরকার দিতে পারেনি। দেশ পরিচালনায় তারা পুরোপুরি ব্যর্থ।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে সরকারের ‘আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এখনো সময় আছে, আপনারা (নির্বাচন কমিশন) মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ান। জনগণ আপনাদের সমর্থন জানাবে।’
নির্দলীয় সরকারের আন্দোলনে সমবেত জনগণের সমর্থন চেয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই দাবিতে আমরা আন্দোলনে নামব। আপনারা কি আমার সঙ্গে নামবেন? ইনশাআল্লাহ রাজপথে আপনাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হবে।’ খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, সরকার জনগণকে ভয় পায় বলেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না। তারা নিশ্চিত জানে যে ক্ষমতায় না থাকলে তাদের ভরাডুবি হবে।
রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ, মিছিলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব, গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ করে কোনো আইন প্রণয়ন করা হলে আমরা অবশ্যই রাস্তায় নামতে বাধ্য হব।’
জনসভায় খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুরু হয় বৃষ্টির মধ্যে। বক্তব্যের একপর্যায়ে বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে গেলেও নেতা-কর্মীরা বৃষ্টিতে ভিজেই তাঁর বক্তব্য শোনেন। এ দৃশ্য দেখে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই বৃষ্টি আল্লাহর রহমত। রংপুরের মানুষ জেগেছে।’
রংপুরে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বাতিল করেছে অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা আগামীতে ক্ষমতায় এলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করব। আরো যেসব দাবি আছে, তাও মানব। তবে আপনারা আমার একটা দাবি পূরণ করবেন, তা হচ্ছে- নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আমার সঙ্গে আন্দোলনে নামবেন।’ এ সময় মাঠজুড়ে থাকা মানুষ ‘হ্যাঁ-সূচক’ জবাবে সম্মতি জানায়।
বগুড়ায় তিন মিনিট বক্তব্য : রংপুরের জিলা স্কুল মাঠে জনসভার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার সময় দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বগুড়ার সার্কিট হাউস গেটে খালেদা জিয়া নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সংবিধান থেকে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। অথচ দেশের ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয় সরকার চায়। আমরা স্পষ্টভাষায় বলে দিতে চাই, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না। এই দাবি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে আমরা দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কাছে যাচ্ছি। জনসভা করছি। তিনি অভিযোগ করেন, এই সরকার আমলে বগুড়ায় কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিএনপি আগামী দিনে ক্ষমতায় এলে বগুড়াসহ সারা দেশের উন্নয়ন হবে।
বগুড়া সার্কিট হাউস থেকে সড়ক পথে রওনা হয় খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। তাঁকে স্বাগত জানাতে ১২০ কিলোমিটার পথের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও শ্রেণী-পেশার মানুষ সমবেত হয়। নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নেতা-কর্মী দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। এই পথে শতাধিক তোরণ নির্মাণ করা হয়। সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ছবিসংবলিত ডিজিটাল ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দিয়ে পুরো পথ রঙিন মোড়কে সাজানো হয়।
রংপুরে ভাওয়াইয়া সুরে খালেদাকে বরণ : বিকেল ৩টায় খালেদা জিয়া রংপুর সার্কিট হাউসে পৌঁছালে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোজাফফর হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। পুরো শহর উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। জেলার প্রবেশ পথ মডার্ন মোড় থেকে সেনানিবাস চেকপোস্ট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার পথ বিরোধীদলীয় নেতার গাড়িবহরকে ৩০ জনের অশ্বারোহী দল অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে আসে। নানা সাজে সজ্জিত মেয়েরা নেচে-গেয়ে কৃষকদের ধান কাটা, গ্রাম্যবধূর কুলো হাতে ধান ঝাড়া, রাখালের গরু নিয়ে মাঠে বিচরণ, জেলের মাছ ধরার দৃশ্য অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতাকে শহরে অভ্যর্থনা জানান রংপুরের শিল্পী কুশলীরা।
বিকেল পৌনে ৪টায় খালেদা জিয়া জনসভা মঞ্চে ওঠেন। নীলফামারী-৪ আসনের সম্ভাব্যপ্রার্থী ও জাসাসের উপদেষ্টা সদস্য শিল্পী বেবী নাজনীনের কণ্ঠে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী- ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই/হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারী বন্দরে…’ ভাওয়াইয়া গানটি গেয়ে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানান।
আরো যাঁরা বক্তব্য দেন : জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোজাফফর হোসেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ১৮ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি অলি আহমেদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বাংলাদেশ জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান শফিউল আলম প্রধান, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মূর্তজা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, দলের যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, রংপুরের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মমতাজ শিরিন ভরসা, শামসুজ্জামান শামু, সাইফুল ইসলাম, অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী, সাবেক এমপি নুর মোহাম্মদ মণ্ডল, কাউনিয়া সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা, তারাগঞ্জ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম খান, জামায়াত নেতা মাহবুবার রহমান বেলাল, হাফিজুর রহমান, মমতাজউদ্দিন প্রমুখ।
আজ রাজশাহীতে জনসভা : রংপুরে বক্তব্যের পর বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে খালেদা জিয়া মাওলানা কেরামত আলীর মাজার জিয়ারত করেন এবং তাজহাট জমিদার বাড়ি পরিদর্শন করেন। তিনি রাতে বগুড়া সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন। আজ সোমবার সকাল ১১টায় বগুড়া থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। দুপুর ২টায় রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে ১৮ দলীয় আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন খালেদা জিয়া।