ভোট সামনে রেখে তড়িঘড়ি গরিবের টাকা ছাড়

দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রথম কিস্তির ৬২০ কোটি টাকা গতকাল রবিবার তড়িঘড়ি ছাড় করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে এ বছর এক মাস আগেই প্রকল্পের কিস্তির অর্থ ছাড় করা হলো। অথচ গত বছর এ প্রকল্পের প্রথম কিস্তির টাকা ছাড় করা হয়েছিল অক্টোবর মাসে। এবার এ কর্মসূচিতে বরাদ্দও ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে এই প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
নির্বাচনের সুবিধা পেতে এ অর্থ ব্যয় করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে অনেকে। তারা বলছে, সে ক্ষেত্রে এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। জানা গেছে, আগামী জানুয়ারি মাসের আগেই এ প্রকল্পের পরবর্তী কিস্তির টাকা অর্থাৎ বাকি প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ছাড় করার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।
গত বছরের চেয়ে এবার এক মাস আগে কেন অর্থ ছাড় করা হলো, এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস বলেছেন, ‘এবার আগেভাগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ায় আমরা আগে অর্থ ছাড় করতে পেরেছি।’ কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের সচিব মেছবাহ উল আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চাই এ টাকা প্রকৃত দরিদ্ররা যথাযথভাবে পাক। এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রাখা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এ টাকা সুনির্দিষ্ট প্রকল্পে খরচ করবে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ এ টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হবে কি না- এটাই আমাদের উদ্বেগের কারণ। তবে আমরা আশা করব, যাদের জন্য এ বরাদ্দ তারা যেন এ টাকাটা পায়।’ তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের কর্মসূচিতে অনেক ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখা যাবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার নির্বাচনের আগে অতিদরিদ্রদের জন্য যে ৬২০ কোটি টাকা ছাড় করেছে তা নির্বাচনকে সামনে রেখেই করেছে বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া তড়িঘড়ি করে এক মাস আগেই এ টাকা ছাড় করা মনে হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দকৃত এ টাকা সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করতে না পারলে এর উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।’
জানা গেছে, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র ও অতিদরিদ্রদের জীবনযাপনে সহায়তা ও আপৎকালীন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে গত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রকল্পটি শুরু করা হয়। সরকারি নির্দেশনায় বলা আছে, আশ্বিন-কার্তিক মাসে সারা দেশে ফসল থাকে না। এ সময় গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র লোকজন খেয়ে না খেয়ে নানাভাবে অভাব-অনটনে বেঁচে থাকে। তাদের বেঁচে থাকার সহায়তা হিসেবে এ কর্মসূচির টাকা দিয়ে বছরের এই সময়টাতে ৪০ দিন এবং জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে আরো ৪০ দিন অর্থাৎ ৮০ দিন অতিদরিদ্ররা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এ কাজে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি দেওয়ার বিধান আছে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। সর্দাররা পাবেন আরো ৪০ টাকা।
তবে এ টাকা খরচ করতে অনেক নিয়মকানুন থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় বরাবরই অতিদরিদ্রদের জন্য এ প্রকল্পের টাকা লুটপাট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক কিস্তির টাকা শেষ হলে পরবর্তী কিস্তির টাকা ছাড় করা হয়। মন্ত্রণালয় শুধু টাকা কিভাবে খরচ করা হবে এর একটি নির্দেশনা দিয়েই অর্থ ছাড় করে দায়মুক্তি নিয়ে নেয়। পরে এ টাকা প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরের মাধ্যমে দেশের সব জেলা ও উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ প্রকল্পের কাজ তত্ত্বাবধানের কথা থাকলেও ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে যথাযথভাবে এ টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয় না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা একটু সচেতন হলেই এ কর্মসূচির টাকা অপব্যয় বা অপচয় থেকে রক্ষা করতে পারেন।
ব্যাংক হিসাব : অতিদরিদ্ররা যাতে তাদের প্রাপ্য টাকা ঠিক সময় পেতে পারে বা কেউ তাদের টাকা নিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে না পারে সে জন্য দরিদ্র শ্রমিকদের স্থানীয় যেকোনো সরকারি ব্যাংকে হিসাব খোলার বিধান করেছে সরকার। কিন্তু যাদের ব্যাংক হিসাব নেই তারা কিভাবে টাকা তুলবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। মাত্র ২০০ টাকা মজুরি গ্রহণের জন্য অনেক শ্রমিক ব্যাংক হিসাব খুলতে চায় না।
কী কী কাজে এ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা : সরকারের নির্দেশনা মতে, এই অতিদরিদ্র কর্মসূচির টাকা গ্রামাঞ্চলের কাঁচা সড়কের পাশে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার, খাল-বিলের কচুরি পানা পরিষ্কার, সেচের জন্য ড্রেন নির্মাণ, কাঁচা সড়কের খানাখন্দ ভরাট করা, বাঁশের সাঁকো নির্মাণ, পাইপ কালভার্ট নির্মাণ ইত্যাদি কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যয় করার বিধান রয়েছে।
সুবিধা পাওয়ার কথা আট লাখ লোকের : ত্রাণ মন্ত্রণালয় গতকাল প্রকল্পের প্রথম কিস্তির জন্য ৬১৯ কোটি ৮৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ছাড় করার ঘোষণা দিয়ে বলেছে, দেশের ৪৮৫টি উপজেলার প্রায় সাত লাখ ৭৪ হাজার ৮৩৩ জন অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এ টাকা ছাড় করা হয়েছে। সারা দেশের দরিদ্র শ্রমিকরা এ টাকা ব্যাংকের হিসাব থেকে পেলেও দিনাজপুরের খানসামা ও ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিদ্র লোকেরা বিকাশের মাধ্যমে শ্রমের টাকা পাবে।