ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক

মহাসচিব পর্যায়ে নিঃশর্ত সংলাপে রাজি খালেদা

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাসচিব পর্যায়ে নিঃশর্ত আলোচনায় বসতে রাজি থাকার কথা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে ব্যবসায়ীরা তিন দিনের হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানালে তাতে সায় না দিয়ে খালেদা জিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা হরতাল করতে চাই না। কিন্তু সরকারই আমাদের মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে গ্রেপ্তার করছে।’ এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এজেন্ডা ছাড়া আলোচনা হতে পারে না। এ সময় এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ প্রস্তাব দিয়ে বলেন, তাহলে নিঃশর্তভাবে দুই মহাসচিব পর্যায়ে আগে আলোচনা হোক। এ প্রস্তাবে বিএনপি চেয়ারপারসন সম্মতি দিয়ে বলেছেন, প্রথমত, দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে।

গতকাল শনিবার রাতে গুলশানের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতারা এ বৈঠক করেন। রাত পৌনে ৯টায় এ রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়ে রাত সোয়া ১১টায় শেষ হয়। সভায় ৫০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ। আড়াই ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য গভীর মনোযোগ সহকারে শোনেন। তিনি তাঁদের কাছে বিরোধী দলের অবস্থান এবং নির্দলীয় সরকারের দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন।

বৈঠকের পর এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সংকট নিরসনে আনকন্ডিশনালভাবে দুই দলের মহাসচিবকে আলোচনায় বসার জন্য বিরোধীদলীয় নেতার কাছে প্রস্তাব করেছি। এ প্রস্তাবে বিরোধীদলীয় নেতা রাজি হয়েছেন। আমরা এখন প্রস্তাবটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ করব, যাতে দু-এক দিনে দুই মহাসচিবকে আলোচনায় বসার ব্যাপারে ব্যবস্থা করা যায়।’ কবে নাগাদ এ সংলাপ হতে পারে প্রশ্ন করা হলে আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কাল-পরশুর মধ্যে বসানো যায় কি না চেষ্টা চালাব।’ এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সংলাপের এ উদ্যোগে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান। হরতাল প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যে সংলাপ শুরু করা গেলে এ প্রশ্নটি চলে আসবে। আগে আলোচনাটা শুরু করতে দিন।’

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এফবিসিসিআইয়ের এই প্রস্তাবকে বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে। আমরা চাই মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা শুরু হোক। এরপর সেখানে সংলাপের আলোচ্যসূচি কী হবে- তা নির্ধারিত হবে।’ আলোচনা শর্তহীন কি না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমরা এফবিসিসিআইয়ের দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছি। দুই দল তো এ দেশের মালিক নয়। জনগণই এ দেশের মালিক। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের চাহিদা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন- তা আলোচনায় আসতে হবে। আমরা মনে করি, এই সংলাপের মাধ্যমে যে সুযোগ সৃষ্টি হবে, এরপর আলোচনায় কী কী থাকবে, তা উঠে আসবে।’

বৈঠকে সংলাপের ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ নেওয়ারও অনুরোধ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর জবাবে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সময় দিলে দুই দল- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের মধ্যে এ বৈঠক হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি সবুর খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে খালেদা জিয়া অর্থবহ আলোচনা চান, সেটা মহাসচিব পর্যায়ে বসে আলোচনা শুরু হতে পারে। পরে আরো উচ্চপর্যায়ে বিষয়টির সমাধান হতে পারে।’

বৈঠকের পর এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য বিরোধীদলীয় নেতাকে অভিনন্দন জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা নির্দলীয় সরকারের আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা বলেছি- এই দুটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সে জন্য আমরা বিরোধীদলীয় নেতাকে বলেছি মহাসচিব পর্যায়ে নিঃশর্তভাবে আলোচনায় বসতে। এতে তিনি রাজি হয়েছেন। বিরোধী দল থেকে আমরা সিগন্যাল পেয়েছি। এখন আমরা আজ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ করে সংলাপে বসানোর চেষ্টা চালাব।’ এক প্রশ্নের জবাবে কাজী আকরাম বলেন, ‘আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে যেন যেকোনো মুহূর্তে সংলাপ হতে পারে।’

বৈঠকে অংশ নেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আকরাম হোসেন, এম এ কাশেম, আবদুল আউয়াল মিন্টু, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, মীর নাসির হোসেন, আনিসুল হক, এ কে আজাদ ছাড়াও এফবিসিসিআইয়ের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া এমসিসিআইয়ের সভাপতি রোকেয়া আফজাল রহমান, বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম, ডিসিসিআইয়ের সভাপতি সবুর খান, বিটিএমএর সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিন, বাংলাদেশ উইমেনস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভানেত্রী নাসরিন আউয়াল মিন্টু, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক, কাজী মুনিরুজ্জামান, বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম হায়দার এবং এফবিসিসিআইয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম সহসভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, সহসভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহসভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ, মোহাম্মদ আলী, জসিম উদ্দিন, দেওয়ান সুলতান আহমেদ, কামাল উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ ব্যবসায়ী নেতা।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক, সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা ও দলের যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লা বুলু প্রমুখ।

গত ২০ অক্টোবর ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় চেয়ে চিঠি দেয়া হয়।