মহাসমাবেশ থেকেই কঠোর আন্দোলন

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সারা দেশে হরতাল-অবরোধসহ লাগাতার আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশ অনুযায়ী আন্দোলনের ছক তৈরি করেছে দলটি। প্রথমে কয়েক দিনের হরতালসহ পর্যায়ক্রমে রাজপথ, নৌপথ ও রেলপথ অবরোধ; সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন ঘেরাওসহ জেলায় জেলায় অবস্থান কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। দাবি না মানা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। ২৫ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, মহাসমাবেশের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে তিনটি স্থানের যেকোনো একটি দেওয়ার জন্য আবেদন করেছে মহানগর বিএনপি। স্থান তিনটি হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পল্টন ময়দান ও নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তা। তিন স্থানের যেকোনো একটি স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে মহাসমাবেশ করতে চায় দলটি। সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন খালেদা জিয়া। এই সমাবেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেবেন। তবে মহাসমাবেশের আগে থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে আন্দোলন শুরু করবে বিএনপি ও জোটের শরিক দলের অঙ্গসংগঠনগুলো। লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণার আগেই বিএনপি সমর্থক শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট ২৪ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ এবং ২২ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করবে। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ২৬ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবদুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তিনটি স্থান নির্ধারণ করে একটি স্থানে ২৫ অক্টোবর মহাসমাবেশ করার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন করেছি। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চাই। সরকার জটিলতায় না গিয়ে আশা করি যেকোনো একটি স্থানে সমাবেশ করার অনুমতি দেবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘২৫ অক্টোবরের মহাসমাবেশ থেকে ম্যাডাম খালেদা জিয়া কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে আবদুস সালাম বলেন, ‘মন্ত্রীরা বলেন বিএনপি আন্দোলন করতে পারবে না। দাবি না মানলে এবার দেখবে বিএনপি কী ধরনের আন্দোলন করে।’
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে নির্বাচন করতে হলে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু ২৪ অক্টোবরের মধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সময় দিয়েছে বিরোধী দল। এই সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে ২৫ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে। হরতালসহ রাজপথ-নৌপথ-রেলপথ অবরোধসহ নানা ধরনের কর্মসূচি থাকতে পারে।
ওই নেতা জানান, সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছেন। চেয়ারপারসনের নির্দেশ মতে সিনিয়র নেতারা কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েই সামনে এগোচ্ছেন। ওই নেতা আরো জানান, ঈদের পর খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলন কর্মসূচির কারণে ঈদের আগেই চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর গেছেন তিনি।
আন্দোলন প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্দোলন ছাড়া আমরা আর কিছু ভাবছি না। সরকার দাবি মেনে নিলেই কেবল আন্দোলন বন্ধ হবে। সংসদের চলতি অধিবেশনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল না করলে কঠোর আন্দোলন শুরু হবে।’ আন্দোলনের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করছে সব কিছু। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারকে সময় দেওয়া হয়েছে। এরপর যত প্রকার প্রয়োজন হয়, তত প্রকার আন্দোলন হবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখছি না। সরকার এগিয়ে না এলে খালেদা জিয়া যথাসময়ে আন্দোলনের ডাক দেবেন। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ এই দাবির সঙ্গে আছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দাবি আদায় করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, সরকারকে অনেক সময় দেওয়া হয়েছে। চলতি অধিবেশনে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হবে। সরকার দাবি মেনে নিলে ভালো, অন্যথায় লাগাতার আন্দোলনে যাওয়ার বিকল্প নেই।
যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকাসহ সারা দেশে অল-আউট আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আলোচনা করেছেন। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি সামনে রেখে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়া হবে।’
জানা যায়, খালেদা জিয়া সম্প্রতি গুলশানে তাঁর কার্যালয়ে পর্যায়ক্রমে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, মহিলা দল, জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক সমিতি, পেশাজীবী পরিষদ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দলের সমর্থক আইনজীবীদের সঙ্গে আন্দোলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছেন। ৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে দলের সমর্থক ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও তিনি মতবিনিময় সভা করেন। সরকার দাবি না মানলে ব্যবসায়ীদের রাস্তায় নামতে বলেছেন তিনি। বিএনপি সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও ২৫ অক্টোবরের পর লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে খালেদা জিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি খালেদা জিয়া নরসিংদী, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটে জনসভা করেন। ২২ অক্টোবর বরিশালে জনসভা করার কথা রয়েছে।
গত ৫ অক্টোবর সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ১৮ দলীয় জোটের জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, একদলীয় নির্বাচন প্রতিহত করতে কেন্দ্রভিত্তিক সর্বদলীয়ভাবে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি না মানলে দল থেকে সর্বস্তরের জনগণকে নিয়ে এ কমিটি গঠিত হবে। খালেদা জিয়ার নির্দেশ পেয়ে এরই মধ্যে কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে জেলা বিএনপি নেতাদের কাছে সংগ্রাম কমিটি গঠনের জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ঈদের পর পুরোদমে কাজ শুরু হবে।