মাইক্রোবাসে ‘ধর্ষক’ দুজন ছিল: র‌্যাব

dor

রাজধানীতে ধর্ষণের শিকার গারো তরুণী পাঁচজন ধর্ষকের কথা বললেও গ্রেপ্তার দুই যুবক মাইক্রোবাসে আর কারও থাকার কথা স্বীকার করেননি বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

আশরাফ ওরফে তুষার ও জাহিদুল ইসলাম লাভলু নামে ওই দুই যুবক র‌্যাবকে বলেছেন, যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানের ওই বিক্রয়কর্মীকে ধর্ষণের পরিকল্পনা এঁটে তারা তাকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন।

একটি বায়িং হাউসের এই দুই গাড়িচালককে ঢাকা ও পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার তাদের সাংবাদিকদের সামনে আনে র‌্যাব, জানায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য।

র‌্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন জানিয়েছে, তখন গাড়িতে তারা দুজনই ছিল।”

র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মাইক্রোবাসে দুজনের বেশি আরও কারও থাকার তথ্য তারা পাননি।

তবে মেয়েটি পাঁচজন ধর্ষণকারীর কথা পুলিশকে জানিয়েছিল, যে বিষয়টি মুফতি মাহমুদও উল্লেখ করেন।

ধর্ষণকারী আসলে কয়জন ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটা এখনই বলা সম্ভব নয়। পরীক্ষা করে দেখতে হবে।”

এদিকে তরুণীর পরিবারের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, মাইক্রোবাসে পাঁচ যুবক ছিল বলে ওই তরুণী পুলিশকে জানিয়েছেন, যার উল্লেখ এজাহারে রয়েছে।

র‌্যাব গ্রেপ্তার করার আগে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সাজ্জাদ বলেন, তারাও তুষারের জড়িত থাকার বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে তাকে খুঁজছিলেন।

২১ বছর বয়সী এই তরুণী গত ২১ মে রাতে কুড়িলে বাসের জন্য অপেক্ষার সময় একদল যুবক তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয় বলে তার পরিবারের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

ভাটারা থানায় করা ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, চলন্ত মাইক্রোবাসে পাঁচজন মিলে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তাকে ধর্ষণের পর রাস্তায় নামিয়ে দেয়।

 ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ

বর্ষবরণের উৎসবে যৌন নিপীড়করা গ্রেপ্তার না হওয়ার মধ্যে এই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা চলছিল।

এর মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে গুলশান-১ নম্বর থেকে লাভলুকে এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে তুষারকে ধরে সাংবাদিকদের সামনে আনল র‌্যাব।

তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাইক্রোবাসটিও (ঢাকা মেট্টো-চ ১৫-৪৭০১) রাজধানীর বনানীর ২১ নম্বর সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয় বলে র‌্যাবের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

র‌্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, বরগুনার আমতলীর চুনাখালি গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে তুষার (৩৫) চুনাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন।

১৯৯৯ সালে ঢাকায় আসার পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ট্রলারে কাজ শুরু করেছিলেন তুষার। এরপর তিনি ড্রাইভিং শিখে ট্যাক্সিক্যাব চালানো শুরু করেন। পরে পূর্বপরিচিত একজনের মাধ্যমে গুলশান-১ এলাকার ‘সিগনেট’ বায়িং হাউজে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন।

গ্রেপ্তার আরেক আসামি জাহিদুল ইসলাম লাভলুর (২৬) বাবার নাম মোবারক আলী হাওলাদার। বাড়ি ঝালকাঠীর কাঁঠালিয়া থানার তালতলা গ্রামে। মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তার পড়ালেখা। তিনিও তুষারের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালান।

পরিকল্পনা ৫ দিনের, প্রলোভন চাকরির

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার তুষার ও লাভলু র‌্যাবকে জানিয়েছেন, ওই তরুণীকে ধর্ষণের পরিকল্পনা পাঁচ দিন আগে করেন তারা এবং সেজন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন।

আরেক বন্ধু ও ‘সিগনেট’ বায়িং হাউজের আরেক গাড়িচালক ফিরোজকেও তারা বিষয়টি জানিয়েছিল বলে র‌্যাবকে জানান তারা।

মুফতি মাহমুদ  বলেন, তুষার ও লাভলু বলেছে, গত ১৭ তারিখ সাউথ আফ্রিকার দুজন তরুণীকে নিয়ে তারা যমুনা ফিউচার পার্কে যায়। সেখানে একটি সুপারশপে মেয়েটির সঙ্গে তুষারের পরিচয় হয়। তুষার ওই দিন মেয়েটির ফোন নম্বরও জোগাড় করে।

“পরদিন ফোনে মেয়েটির বর্তমান চাকরি, বেতন ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানতে চায় সে এবং তাকে বলে, বায়িং হাউজে চাকরির বেতন ও সুবিধা অনেক। ওই তরুণী বায়িং হাউজে কাজ করতে আগ্রহী কি না, সে জানতে চায়। মেয়েটি সরল বিশ্বাসে বায়িং হাউজে চাকরির আগ্রহের কথা জানায়।”

এরপর আরও দুদিন তুষার ফোনে কথা বলেন ওই তরুণীর সঙ্গে। ২০ মে তুষার মেয়েটিকে বায়োডাটা ও চাকরি সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বলেন।

কয়েকদিনের ফোনে কথাবার্তার মধ্যেই তুষার কৌশলে মেয়েটি কোথায় থাকে, কখন কর্মস্থল থেকে বের হয় ইত্যাদি তথ্য জেনে নিয়েছিল বলে র‌্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ জানান।

“এরপর ঘটনার দিন ২১ তারিখ রাত ৯টার দিকে তুষার মেয়েটিকে ফোন করে বলে, তারা যমুনা ফিউচার পার্কের আশপাশেই আছে, মেয়েটি যেন অফিস থেকে বের হয়ে তার বায়োডাটা তাদের কাছে দেয়।”

ওই সময় তারা (তুষার ও লাভলু) মাইক্রোবাস নিয়ে যমুনা ফিউচার পার্কের উল্টো দিকে একটি রেস্তোরাঁর কাছে অপেক্ষার কথা জানায় তরুণীকে।

মুফতি মাহমুদ বলেন, “মেয়েটি মাইক্রোবাসের কাছে গেলে তুষার তার হাত ধরে জোর করে গাড়িতে তুলে ফেলে এবং মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দুজন তাকে ধর্ষণ করে।”

এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে নির্যাতনের শিকার তরুণীকে উত্তরা জসিমউদ্দিন রোডে ফেলে রেখে দুজন পালিয়ে যায় বলে জানান তিনি।

ধর্ষণের ওই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নিতে অবহেলার অভিযোগ ওঠায় পাঁচ মানবাধিকার সংগঠনের রিট আবেদনে হাই কোর্ট তিনটি রুল জারি করেছে।

মামলা নিতে বিলম্ব কেন ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করা হবে না, অবহেলার জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং ধর্ষিতাকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।