মূলধনী যন্ত্রপাতিতে শুভঙ্করের ফাঁকি?

hanging_containers
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার হার বাড়ার বিষয়টিকে উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বললেও এর আড়ালে অর্থ পাচার অথবা অন্য পণ্য আমদানি হচ্ছে বলে সন্দেহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেসরকারি খাতে বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণও অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত খাতে ব্যয় হচ্ছে না বলে মনে করছে দেশের ব্যাংক খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী সব ব্যাংকের কাছে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ওই সময়ে বিদেশ থেকে কোন ব্যাংকের মাধ্যমে কত ঋণ এসেছে, কে বা কোন কোন প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়েছে, কী কারণে ঋণ নেওয়া হয়েছে এবং তার প্রকৃত ব্যবহার হয়েছে কিনা- এসব বিষয়ও জানাতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ থেকে আলাদা চিঠি পাঠিয়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। তথ্য দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে ২৯ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশের ব্যাংকগুলোতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ২৯৩ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি।

এই সময়ে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে আরও বেশি; ২৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হান্নানা বেগম বলেন, “পরিচালনা পর্ষদ আসলে দেখতে চায়, যে পরিমাণ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তা হয়েছে কি না। যদি প্রকৃত অর্থে আমদানি হয় তাহলে তা পজেটিভ, অনেক ভালো। কিন্তু আমদানি না হলে সেটা তো খারাপ।

“আমরা (পরিচালনা পর্ষদ) আসলে বোঝার চেষ্টা করছি প্রকৃত অবস্থা কী। কারণ পর্ষদ মনে করে, দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি যে হারে বেড়েছে, সেই হারে শিল্পখাতের প্রসার হয়নি।”

এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের একজন কর্মকর্তার কথায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে  তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থে মূলধনী যন্ত্রপাতি বা শিল্পের কাঁচামাল আমদানি না করে দেশীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। আবার অনেকে মূলধনী যন্ত্রপাতির নামে অন্য পণ্য আমদানি করেছে।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে এই ঋণ নিচ্ছেন। আর দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত।

সরকার ২০১১ সালে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পর এ পর্যন্ত প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ এসেছে বেসরকারি খাতে।

এছাড়া রয়েছে বায়ার্স ক্রেডিট। যার মাধ্যমে পণ্য আমদানির জন্য উদ্যোক্তারা বিদেশে কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে সাময়িক ধার নিতে পারে।

২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বায়ার্স ক্রেডিট অনুমোদন করে। বর্তমানে মোট আমদানির ১৫ শতাংশ এ পদ্ধতিতে পরিশোধ হয়।

এছাড়া শিল্প খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার যে সুযোগ দিয়েছে, তাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে কোনো ধরনের শুল্ক দিতে হয় না।

“এ কারণে কে কোন শাখা থেকে ঋণ নিয়েছে, সেই ঋণের অর্থে আমদানি করা মূলধনী যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে সেসব তথ্য জানাতে বলা হয়েছে”, বলেন ওই কর্মকর্তা।

এক পণ্যের কথা বলে অন্য পণ্য আমদানি করে শুল্ক ফাঁকি এবং পণ্য আমদানির জন্য শুল্ক দিয়ে বন্দর থেকে খালি কনটেইনার খালাস করে অর্থ পাচারের কয়েকটি ঘটনা এর আগেও ধরা পড়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে এ বিষয়গুলো ধরার সুযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থাকে না।

একজন উদ্যোক্তা তার কারখানার জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খুললে তার নথি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যায়। তারপর সেই পণ্য চলে আসার পর এলসি নিষ্পত্তি হলে সেই নথিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পায়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ সব তথ্যই পায় কাগজে কলমে। বাস্তবে কোন পণ্য এল, অথবা আদৌ কোনো পণ্য এল কিনা, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জানা থাকে না।

কনটেইনারে সঠিক পণ্য এল কিনা এবং শুল্ক সঠিকভাবে পরিশোধ হল কি না, তা দেখার দায়িত্ব শুল্ক কর্তৃপক্ষের। কিন্তু তারাও বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কাগজে কলমে, অর্থাৎ নথি আকারেই জানায়। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অনেকগুলো সুযোগ থেকে যায়।

এ সুযোগ নিয়ে হঠাৎ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়ে গেল কি না, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাই খতিয়ে দেখতে চায় বলে কর্মকর্তারা জানান।