মৃত্যুদণ্ড হয়নি যে কারণে

বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী ৯টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও বয়স ও স্বাস্থ্য বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল বুধবার এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে বলা হয়েছে, আলীম জঘন্য অপরাধ করেছেন। বিশেষ করে তিনি নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটন করেছেন- এমন চারটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
এই চারটি অভিযোগের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তা সত্ত্বেও আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে রায়ে বলা হয়েছে, ‘কোনো মানুষ, যে শারীরিক ও মানসিকভাবে অচল, তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলানো উচিত নয়। কিন্তু আবদুল আলীমের অপরাধ এতটাই ঘৃণ্য যে তাঁকে মুক্ত রাখলে মানবতার অবমাননা হবে। এ কারণে তাঁকে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে বাকি জীবন কাটাতে হবে। তাহলে হয়তো কৃতকর্মের জন্য তাঁর ভেতরে অনুশোচনার সৃষ্টি হবে।’
রায়ের শেষভাগে আলীমের শাস্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ৬৮৮ অনুচ্ছেদের রায়ে ৬৮০ থেকে ৬৮৪ পর্যন্ত আলীমের অপরাধ ও শাস্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আবদুল আলীম তখন কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। তিনি নিজে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর অধীনস্তরাও অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। তাঁর অধীনস্তদের অপরাধের দায় (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) তিনি এড়াতে পারেন না। এ জন্য আসামি আলীমের সর্বোচ্চ শাস্তিই পাওনা।
রায়ে আরো বলা হয়, আলীম এখন ৮৩ বছর বয়স্ক। তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তিনি নিজে হাঁটতে পারেন না। অন্যের সহযোগিতা দরকার হয়। তিনি হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন। সরাসরি তাঁকে দেখে এবং তাঁর পক্ষে দাখিল করা চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
রায়ে বলা হয়, লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ পর্যন্ত চারটি মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। এসবের মধ্যে আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ওই রায় নিষ্পত্তি হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল যেকোনো মেয়াদের শাস্তি দিতে পারেন বলে আইনে বলা হয়েছে। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হলে এই শাস্তি দেওয়া হয়। তবে অপরাধের গুরুত্ব ও অন্যান্য বিষয়ও ট্রাইব্যুনালকে বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধ, স্বাস্থ্যহীন ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির বিষয় তো বিবেচনা করতেই হয়। শারীরিক অক্ষমতা ও বয়স দোষী ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। শারীরিক ও মানসিকভাবে অচল ব্যক্তিকে ফাঁসির মুখোমুখি করা যায় না। যদিও শত শত নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন আবদুল আলীম, তবুও আইন সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে অমানবিক হতে পারে না।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে আরো বলেন, চারটি অভিযোগ (অভিযোগ নম্বর ২, ৮, ১০ ও ১৪) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে আলীমের বিরুদ্ধে। এ কারণে সর্বোচ্চ শাস্তিই তাঁর পাওনা। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তাঁর শারীরিক অক্ষমতা ও বয়স দেখে অন্ধ হতে পারেন না। তাই সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি বিচারেরই একটি অংশ।
রায়ে আরো বলা হয়, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে কারাদণ্ডের নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়নি। ফাঁসি বা যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের রয়েছে, সে কারণে আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া যায়।
রায়ে সবশেষে বলা হয়, আলীম বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছেন এবং নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম আলীম একাত্তরে যে কাজ করেছেন, তিনি স্বাধীনভাবে থাকলে তা মানবসভ্যতা ও মানবতার কাছে খুব কষ্টদায়ক হবে। এ কারণে তাঁকে আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে।