নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-৫

মেঘনার তলদেশ লুট

মাত্র তিনটি ইজারা নিয়ে মেঘনা নদীর ১৬টি মহাল থেকে বালু তুলছেন নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ ও কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলার ‘রাজনৈতিক’ বালু ব্যবসায়ীরা। এই চক্র পরিকল্পনা করেই ১৩টি বালুমহালের দরপত্রে অংশ নেয়নি এবং কাউকে অংশ নিতেও দেয়নি। ফলে মহালগুলো দখলে নিয়ে তারা কার্যত এই দুই উপজেলায় মেঘনার তলদেশ লুটে নিচ্ছে।নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জানা গেছে, চর রমজান সোনাউল্লাহ-৬ ও চর হোগলা বালুমহাল ছাড়া অন্য কোনো বালুমহালের দরপত্রে কেউ অংশ নেননি। চর রমজান সোনাউল্লাহ-৬ বালুমহালটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ইজারা পান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য আবু নাঈম এবং চর হোগলা বালুমহালটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পান সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল মান্নানের ছেলে নাছির উদ্দিন। আর মেঘনা উপজেলার মেঘনা বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত জাকির হোসেন। এই তিনজনই এখন সবাইকে ভাগবাঁটোয়ারা দিয়ে সবগুলো মহাল নিয়ন্ত্রণ করেন।এঁরা সরকারি দলের মন্ত্রী, সাংসদ ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের প্রশ্রয়ে মেঘনার দুই কূলের মানুষের জীবন, পরিবেশ এবং নদীর গঠন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছেন। কেবল গণমাধ্যমে কিছু লেখা হলে তাৎক্ষণিক কিছু তৎপরতা দেখায় প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চলতি অর্থবছরে সোনারগাঁয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিবদমান দুটি পক্ষের নেতা-কর্মীরা একজোট হয়ে দুটি বালুমহাল বাদে অন্যগুলো ইজারা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সোনারগাঁয়ের এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মেঘনা উপজেলার বালুব্যবসায়ীরাও।জানতে চাইলে চর হোগলা বালুমহালের ইজারাদার নাছির উদ্দিন বলেন, ‘এ বছর আমরা দলের বেকার কর্মীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে দুটি মহালের ইজারায় অংশ নিয়েছি।’স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, জাকির মেঘনার বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁর খালাতো ভাই মহসিন মিয়াকে নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন, যার বেশির ভাগ সদস্য সরকারি দলের যুব ও ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী। এ বাহিনী মেঘনা উপজেলার রামপ্রসাদ ও নলচর এবং সোনারগাঁয়ের নুনেরটেক পর্যন্ত কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র বালু তুলছে।মেঘনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামছুল হক বলেন, ইজারাদাররা বালুমহালের সীমানা মানছেন না। তাঁরা কয়েকটি গ্রাম ঘেঁষে বালু তোলায় গ্রামগুলো এখন হুমকির মুখে। এ রকম কিছু অভিযোগ পেয়ে জুনের ১ তারিখে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেন তিনি। ওই সময় বালুদস্যুরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। বাধ্য হয়ে তাঁরা পাঁচটি গুলি ছুড়ে আত্মরক্ষা করেন।জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটা আসলে ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঘটেছিল। এ রকম ঘটনা আর ঘটবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘৭২ লাখ টাকা দিয়ে বালুমহাল ইজারা নিয়েছি আমি। প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয় আমার।’ কাকে চাঁদা দেন—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সবাইকে কম-বেশি চাঁদা দিতে হয়।’ প্রশাসন ও পুলিশকে চাঁদা দিতে হয় কি না, জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৬টি বালুমহালের মধ্যে সোনারগাঁ উপজেলার ১২টি এবং মেঘনা উপজেলা চারটি মহাল আছে। এর মধ্যে সোনারগাঁয়ের দুটি ও মেঘনার তিনটি মহালের ইজারা ও বালু তোলা বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু এই মহালগুলো থেকেও বালু তুলছে চক্রটি।

মহালের নির্ধারিত সীমানা না মেনে গোটা চরও কেটে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। আবার চরের কিনার ঘেঁষে মেশিন বসিয়ে বালু তোলার কারণে চরগুলোও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে সোনারগাঁ উপজেলার চর সুলতানপুর নামে একটি চর পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মেঘনা উপজেলার নলচরের দুই-তৃতীয়াংশ এবং রামপ্রসাদ চরের অর্ধেক নদীতে মিশে গেছে। এখনো রাতের অন্ধকারে নুনেরটেক থেকে বালু কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মীকে জরিমানা এবং তাঁদের ব্যবহূত ড্রেজার (খননযন্ত্র) আটক করেছেন।

সোনাগাঁয়ের অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধ কমিটির প্রধান উপদেষ্টা কবি শাহেদ কায়েসের ওপরও গত ২৫ জুলাই বালু ব্যবসায়ীরা হামলা চালান। তিনি প্রথমআলোকে বলেন, প্রশাসন ও পুলিশের সমর্থন ছাড়া বালু-সন্ত্রাসীরা টিকে থাকতে পারত না। তিনি জানান, তাঁর ওপর হামলার পর পুলিশ ওয়াসিম নামের একজনকে আটক করে। কিন্তু বালু-সন্ত্রাসী জাকির ও মহসিন ঘটনাস্থলে থাকলেও পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করেনি।

শাহেদ দাবি করেন, গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি ওয়াসিমকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক তদবির করেছেন। এখন কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসনের সরকারদলীয় সাংসদ সুবিদ আলী ভূঁইয়া ও সরকারদলীয় নেতা সেলিনা ইসলাম এ মামলায় অভিযুক্তদের রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তাঁর ওপর হামলাকারীদের ব্যবহূত স্পিডবোটটির মালিক সেলিনা ইসলাম।

রামপ্রসাদ চরের আওয়ামী লীগের নেতা জয়নাল ভান্ডারি অভিযোগ করেন, বালু-সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সাংসদ সুবিদ আলী ভূঁইয়াকে অবহিত করার পরও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। মেঘনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রতন সিকদার বলেন, অবৈধ বালুমহাল বন্ধের ব্যাপারে গত ২৯ মে তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত করেছেন।

তবে মুজিবুল হক, সুবিদ আলী ভূঁইয়া ও সেলিনা ইসলাম প্রথম আলোর কাছে সব অভিযোগ মিথ্যে বলে দাবি করেন। মুজিবুল হক বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া ছেলেটির দুজন আত্মীয় আমার কাছে আসেন। আমি তো জনপ্রতিনিধি। অনুরোধ করার পর ঘটনাটি সম্পর্কে জানার জন্য আমি সোনারগাঁ থানার ওসিকে ফোন করেছিলাম। ঘটনা শুনে আমি তাঁকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’

সেলিনা ইসলাম বলেন, ‘আমি একজন প্রবাসী। মেঘনা বালুমহালের ইজারাদারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ তবে আটক হওয়া স্পিডবোটটি তাঁর বলে স্বীকার করে বলেন, আটক ওয়াসিম ভাড়ায় স্পিডবোটটি চালাতেন।

সুবিদ আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘ওই এলাকার কোনো বালু ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তবু বিষয়টি শোনার পর আমি প্রশাসনকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’

 

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-১ : ওসমান পরিবারের রাজনীতি সংকটে

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-২ : ওসমান-আতঙ্ক এখনো কাটেনি

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-৩: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নেই

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-৪: ঝুট ব্যবসা ও চাঁদাবাজি নিয়েই হত্যা, সন্ত্রাস