মেয়াদের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন

সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের মেয়াদের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। এ জন্য সচিবদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই বৈঠকে তিনি আরো বলেন, নির্বাচন পর্যন্ত বর্তমান সংসদ বহাল থাকবে, তবে কোনো অধিবেশন হবে না। আর নির্বাচনকালীন ওই সরকার নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। ওই সময় মন্ত্রীরা তাঁদের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও সচিবদের সঙ্গে কাজের বিষয়টি সমন্বয় করবেন। সচিব কাজ করবেন, মন্ত্রী পরে এসে সে বিষয়ে অবহিত হবেন বা সচিব-মন্ত্রী মিলে কাজ করবেন। তাঁর এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সচিবরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন নির্বাচনের জন্য তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন।
তবে সংসদের বাজেট অধিবেশনের আগের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে। গতকালের এই ঘোষণা তাঁর সেই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৯ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন, ২৫ অক্টোবর বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হবে।
গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সচিবদের আরো বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র পদ্ধতি অনুসরণ করে যেসব গণতান্ত্রিক দেশ, তাদের ক্ষমতার বদল পর্যবেক্ষণ করে দেখলেই এই পদ্ধতির সঙ্গে আমরা নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারব। নির্বাচনকালীন সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে সচিবদের ধারণা স্পষ্ট করতেই প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা। বৈঠক শেষে সচিব সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা বলেন, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য সচিবদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংবিধান অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ আছে। এর আগের ৯০ দিন সংসদ থাকলেও এই সময় সংসদ অধিবেশন বসবে না বলে সংবিধানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর নির্বাচন কখন হবে বলে মনে করছেন- কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কখন নির্বাচন হবে- এটা প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সরাসরি বলেননি। তবে নির্বাচন যে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই হবে, এমন আভাস পাওয়া গেছে। সরাসরি না বললেও এটা ইমপ্লাইড বিষয়। এখানে বুঝে নিতে হবে, মেয়াদ শেষের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর এমনই ছিল।’
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত অর্থাৎ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হবে। সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ১২৩-এর (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। একই অনুচ্ছেদের ৩(খ)তে বলা হয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তবে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। বিএনপি ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচনে যেতে নারাজ। তারা একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমান সরকারের মেয়াদেই নির্বাচন করতে চায়।
বর্তমান সরকারের মেয়াদে ষষ্ঠবারের মতো গতকাল সোমবার সচিব সভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের পর সাড়ে তিন ঘণ্টা সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। এতে ৫৮ জন সচিব উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য দিয়েছেন ২৩ জন সচিব। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও আলোচনায় অংশ নেননি।
সচিবদের সঙ্গে খোলামেলা এ সভায় সরকারের বিগত চার বছর আট মাসের উন্নয়নের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি এসব উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সচিবদের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের নেওয়া উন্নয়নমূলক যেসব কাজ শেষ পর্যায়ে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করার জন্য বারবার পরিদর্শন করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব।
সচিব জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি তাঁরা আগামী দিনে আবার ক্ষমতায় আসতে পারেন, তাহলে প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। এ জন্য স্থানীয় সরকারকে আরো শক্তিশালী করা হবে। এ জন্য সচিবদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সরকার বিগত দিনে সন্ত্রাস এবং নাশকতা যেভাবে মোকাবিলা করেছে, আগামী দিনেও সে ধরনের কোনো পরিস্থিতি হলে তা মোকাবিলা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী সচিবদের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া তিনি ব্রিটিশ আমলের কিছু পদ-পদবি পরিবর্তন করার কথা উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের উপযোগী পদবি করতে হবে। এ বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান মোশাররাফ হোসাইন।
মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, সভায় সচিবরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। সচিবরা বলেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থায়ী পে কমিশন গঠন করতে হবে। কারণ পে কমিশন গঠন করার পরও কাজ সম্পন্ন করতে বেশ সময় লাগবে। এ ছাড়া সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে ইনসেনটিভ ব্যবস্থা চালু করা এবং অবসরের পরও যাতে কিছু সুবিধা থাকে তার জন্য সুপারিশ করেছেন।