মেয়ের মৃত্যুশোকে পাঁচতলা থেকে ঝাঁপ দিলেন মা

প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে আত্মহননের চেষ্টা করলেন এক মা। সাংবাদিক নাজনীন আকতার তন্নী মেয়ে চন্দ্রমুখীর লাশ হাসপাতালে রেখেই বাসায় ফিরে যান এবং পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে শূন্যে ঝাঁপ দেন। দৈনিক জনকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাজনীনের বুকের বেশ কয়েকটি হাড় ভেঙে গেছে। কোমরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর স্বামী রকিবুল ইসলাম মুকুল বেসরকারি টেলিভিশন জিটিভির প্রধান প্রতিবেদক। সংবাদকর্মী নাজনীন ও মুকুল সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনার কত ছবি তুলে ধরেন সবার সামনে। কিন্তু আজ তাঁরা নিজেরাই মর্মস্পর্শী এক খবরের উপাদান হলেন।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, নাজনীন আকতার তন্নী দৈনিক জনকণ্ঠে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত। এ সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র মেয়ে ছিল পাঁচ বছর বয়সী মায়াবী মাহারভাস চন্দ্রমুখী। ক্রনিক হেপাটাইটিসে আক্রান্ত চন্দ্রমুখী সম্প্রতি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। গত পাঁচ দিন শিশুটি চিকিৎসাধীন ছিল শিশু হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ)। অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে চন্দ্রমুখীর অবস্থা ক্রমেই অবনতি হতে থাকলে শনিবার থেকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার দুপুরের পর চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন এবং বিকেল ৪টায় খুলে ফেলা হয় চন্দ্রমুখীর লাইফ সাপোর্ট। তার যকৃৎ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল বলে চিকিৎসকরা জানান।
মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হতেই নাজনীন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। তিনি স্বামী মুকুলকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার চেষ্টা করেন। চন্দ্রমুখীর লাশ গ্রহণসহ হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা সারতে মুকুল কিছুটা বিলম্ব করলে নাজনীন একাই ফিরে যান পশ্চিম কল্যাণপুরের বাসায়। সেখানে বাসার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহননের চেষ্টা চালান। প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়। সেখান থেকে তাঁকে সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাতেই চন্দ্রমুখীর লাশ মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। সে সময় চন্দ্রমুখীর শোকগ্রস্ত বাবা মুকুলসহ স্বজনরা উপস্থিত ছিল।
এদিকে রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজমুল হাকিম শাহিন কালের কণ্ঠকে জানান, সিটিস্ক্যানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নাজনীনের মাথার আঘাত তেমন গুরুতর না হলেও বুকের কয়েকটি হাড় ও কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। নাজনীনের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতির দিকে জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁকে আশঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না এখনো। তাঁকে অস্ত্রোপচারকক্ষ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে।
ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, একমাত্র মেয়ে চন্দ্রমুখী গুরুতর অসুস্থ থাকার সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নাজনীন ও মুকুল। মেয়েকে বাঁচাতে না পারলে তাঁরাও বেঁচে থাকবেন না বলে বেশ কয়েকবার বন্ধুদের বলেছেন। বিকেলে চিকিৎসকরা চন্দ্রমুখীকে বাঁচানো সম্ভব নয় বলে মত দিলে প্রথমে নাজনীন বিলাপ করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি শান্ত হয়ে বাসায় ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। বাসায় ফিরে মেয়ের খেলনা, কাপড়চোপড় সব ফেলে দেবেন, কোনো স্মৃতি রাখবেন না- এমন কথা বলতে বলতে হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
গত ১৬ মে রকিবুল ইসলাম মুকুল তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল চন্দ্রমুখীটার। সময়ের পরতে পরতে কত ছবি এঁকে এতটা পথ পাড়ি দিলে মা…সেই ছোট্ট তুলতুলে তুমি ক্রনিক হেপাটাইটিসের সাথে যুদ্ধ করে অর্ধেকটা হলে…সুস্থ থাকো…অনেক বড় হও…তোমার চোখে যে আকাশ দেখবো বাবা…যে আকাশে খেলা করে বেড়াবে সুখের পরতে সাজানো তুলোট মেঘের দল…তুমিই যে আমার হাসি…বেদনা আর বেঁচে থাকার কারণ…আগাম শুভ জন্মদিন চন্দ্রমুখী…বেঁচে থাকো যুগ যুগ…আর কিছু না হও…একজন ভালো মানুষ হও…তোমার পরিচয়ে যেন পরিচয় হয় আমার…ওই যে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা…ওটা চন্দ্রমুখীর বাবা…।’
মুকুলের এ প্রত্যাশা এখন ঢেকে গেছে কালো ছায়ায়। চন্দ্রমুখীর চলে যাওয়ার পাশাপাশি স্ত্রী তন্নীও এখন মৃত্যুর দুয়ারে।
গত শনিবার বাবা মুকুল তাঁর ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘এই পৃথিবীতে যাকে সবচে বেশি ভালোবাসী সেই চন্দ্রমুখী এখন আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে…ওর প্রত্যেকটা কষ্ট দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসছে আমার বুকে…আমি যে বাবা…সবার কাছে মন থেকে দোয়া ভিক্ষা চাই, আল্লাহ যেন চন্দ্রমুখীকে আমার কোলে ফিরিয়ে দেন।’
মর্মস্পর্শী এ খবরে ফেসবুকসহ সামাজিক নেটওয়ার্কেও শোকের ছায়া নেমে আসে। চন্দ্রমুখী, তন্নী ও মুকুলের ছবি শেয়ার হতে থাকে ওয়াল থেকে ওয়ালে। টিভি সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল লেখেন, ‘আমাদের বৃহত্তর পরিবারের ছোট সদস্যটি চলে গেলো! চন্দ্রমুখী, তোর অসুখ হওয়ার খবরে, তোর আইসিইউতে থাকার খবরেই তো ভালো করে প্রথম চিনেছিলাম তোকে; আমরা দু হাত তুলে তোর জন্য প্রার্থনায় ছিলাম। আমাদের সম্মিলিত সেই প্রার্থনা ব্যর্থ হয়ে গেলো। তুই চলে গেলি চন্দ্রমুখী! আমরা অশ্রুসিক্ত, আমাদের হৃদয় আজ রক্তাক্ত, আমাদের মস্তিষ্ক আজ শূন্য।’