বহুল প্রত্যাশিত ফ্লাইওভারের উদ্বোধন

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ঈদুল আজহার উপহার : প্রধানমন্ত্রী

দেশের সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভার যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ঈদে নগরবাসীর জন্য উপহার বলে জানালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এর আগে কুড়িল ফ্লাইওভার ছিল ঈদুল ফিতরের উপহার আর হাতিরঝিল প্রকল্প ছিল নববর্ষের উপহার। গতকাল শুক্রবার ফ্লাইওভার উদ্বোধন শেষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে এ উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যানবাহন চলাচলের জন্য গতকাল উন্মুক্ত করা হয়েছে গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার। ২০১০ সালের ২২ জুন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই দুই হাজার ১০৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে (পিপিপি) নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় এ ফ্লাইওভারের সঙ্গে আশপাশের প্রধান সড়ক ও বাস টার্মিনালের সংযোগ রাখা হয়েছে। চার লেনের ফ্লাইওভারে প্রবেশের জন্য ছয়টি এবং বের হওয়ার জন্য সাতটি পথ রয়েছে।
বিকেল পৌনে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী গুলিস্তান প্রান্তে ফিতা কেটে গাড়ি নিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠেন। ওই গাড়িতে করেই তিনি যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী প্রান্তে টোল প্লাজায় পৌঁছেন এবং ফলক উন্মোচন করেন।
সেখানে শেখ হাসিনা মোনাজাতে অংশ নেন এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি অঙ্কিত ৫০ টাকার স্মারক মুদ্রা দিয়ে টোল টিকিট কেনেন। এ প্রকল্পের ঠিকাদার ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম এ সময় একটি বাঁধানো স্মারক টোল টিকিট প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
টোল দেওয়া শেষে প্রধানমন্ত্রী হেঁটে টোল প্লাজা পার হন। প্লাজার নিচে ও ফ্লাইওভারের আশপাশে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি। সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের এ সময় শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দিতে দেখা যায়। উদ্বোধনের পর ফ্লাইওভারের গুলিস্তান, পলাশী, মতিঝিল ও কুতুবখালী পর্যন্ত পথ খুলে দেওয়া হয়। সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডের জনপথের কিছু কাজ বাকি আছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই এসব কাজ শেষ হবে।
হানিফ ফ্লাইওভারে চলাচলের জন্য যানবাহনকে টোল পরিশোধ করতে হবে। প্রতিদিনের আদায় করা টোলের ৫ শতাংশ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা হবে। ২৪ বছর পর এর দায়িত্ব নেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া থেকে গুলিস্তানের নিমতলী মোড় পর্যন্ত এ ফ্লাইওভারে যানবাহন প্রবেশের পর বের হওয়ার পথে টোল দিতে হবে। টোলের হার ধরা হয়েছে ট্রেইলার ২০০, ট্রাক ১৫০, বাস ১৫০, মিনিবাস ১০০, পিকআপ ৭৫, মাইক্রোবাস ৫০, জিপ ৪০, প্রাইভেট কার ৩৫, অটোরিকশা ১০ টাকা ও দুই চাকার বাহন পাঁচ টাকা। তবে হেঁটে যাতায়াতে কোনো বাধা থাকবে না, এ জন্য কোনো টোলও দিতে হবে না।
হানিফ ফ্লাইওভারের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০০ বছর। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩০টি জেলার যানবাহন ঢাকার প্রবেশপথের যানজট এড়িয়ে এই ফ্লাইওভার দিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছতে পারবে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম, হানিফ ফ্লাইওভার প্রকল্পের পরিচালক মো. আশিকুর রহমান এবং ওরিয়ন গ্রুপ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধন শেষে ওসমানী মিলনায়তনে এক সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্লাইওভার উদ্বোধন করে প্রথম টোল আমি দিয়েছি। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের যৌথ উদ্যোগে প্রথম ফ্লাইওভার এটি।’ তিনি বলেন, ঈদের আগে প্রায় ৩০টি জেলার মানুষের যাতায়াতের সমস্যা দূর করতে এই ফ্লাইওভার অনেক উপকার করবে। কারণ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩০টি জেলার সংযোগ সড়ক এটি। রাজধানীবাসীর জন্য এটি ঈদ উপহার। ঈদের আগে উদ্বোধনের কারণে মানুষের কষ্ট লাঘব হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দিতে আসি, নিতে আসি না। ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে আমরা ফ্লাইওভার, ওভারপাসসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ঢাকার সঙ্গে আশপাশের জেলার যোগাযোগ সহজ করতে কমিউটার ট্রেন চালু করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘রেল নেটওয়ার্ক আরো বাড়াতে আমরা কাজ করছি, যেন মানুষ কম খরচে ভালোভাবে যাতায়াত করতে পারে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বুড়িগঙ্গার প্রচুর বর্জ্য পরিশোধন করা হয়েছে। আমরা অনেকটাই দূষণমুক্ত করেছি। এখন অন্তত কিছু জলজ প্রাণী দেখা যায়। কিন্তু মানুষেরও সচেতনতা থাকা উচিত। মানুষ যদি নদীতে জঞ্জাল ফেলে, তাহলে আমরা পরিষ্কার রাখব কিভাবে।’
স্মৃতিচারণা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। আমি তখন বক্তব্য দিচ্ছিলাম। আমার ঠিক ডান পাশে হানিফ ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা আমাকে ঘিরে রাখেন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার হানিফ ভাইয়ের মাথায় এসে লাগে। রক্ত তাঁর মাথা থেকে আমার গায়ে টপটপ করে পড়তে থাকে। আমরা তাঁর নামে এ ফ্লাইওভার করেছি।’ এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা শহরে অনেক সমস্যা ছিল। আমরা তা সমাধান করেছি। সায়েদাবাদে পানি শোধনে ফেজ ১ ও ২ শেষ করেছি। পদ্মা নদী থেকে পানি এনে বিশুদ্ধ করে ঢাকাবাসীর পানি সরবরাহ বাড়ানো হবে। গ্যাসের সমস্যাও সমাধান করেছি। আর বিদ্যুতের কথা তো বলার কিছু নেই। সাড়ে চার বছরে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে।’