মোদিকে ঠেকাতে রাহুলের কৌশল!

যাঁকে নিয়ে এবারের আলোচনা, গত কিছুদিন ধরেই তিনি খবরের শিরোনামে। কারণ, বিরাট এক বিস্ময়-ভান্ডারের ঢাকনা খুলে কেন্দ্রীয় সরকারে তিনি ওলটপালট ঘটিয়ে দিয়েছেন। তিনি রাহুল গান্ধী, ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সহসভাপতি এবং কংগ্রেস-জোট আবার ক্ষমতায় এলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে জনপ্রিয় ধারণা।
রাহুলের কড়া সমালোচনার পর মনমোহন ইস্তফা দেননি। তবে এ কথাও জানাতে ভুললেন না যে রাহুলের কথায় তিনি যথেষ্ট অপমানিত হয়েছেন। রাহুল তাঁর বাড়িতে গিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু বললেন, অর্ডিন্যান্সটা সত্যিই ফালতু এবং সেটা প্রত্যাহার করে নেওয়াই উচিত। সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী সাংসদ-বিধায়কদের আড়াল করতে আনা অর্ডিন্যান্স এবং রাজ্যসভায় পেশ হওয়া এ-সংক্রান্ত বিলটি সেই সন্ধ্যাতেই প্রত্যাহূত হলো। রাহুল-ব্রিগেড ব্যস্ত হয়ে গেল রাহুল-মাহাত্ম্য প্রচারে, বিরোধীরা তুলাধোনা করতে লাগলেন মনমোহন সিংকে।
গান্ধী পরিবারে ‘৪৩’ বছর বয়সের মাহাত্ম্য নিশ্চয় কিছু আছে। দিল্লির প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় আচমকা হাজির হয়ে রাহুল যখন অর্ডিন্যান্স নিয়ে তাঁর ক্ষোভ উগরে গোটা দেশকে বিস্মিত করছেন, তখন তাঁর বয়স ৪৩। তাঁর পিতা, প্রয়াত রাজীব গান্ধী ২৪ বছর আগে এই দিল্লিতে ভিড়ে ভিড়াক্কার সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘খুব শিগগির আপনারা নতুন পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে কথা বলবেন!’ রাজীব যখন ওই মন্তব্য করছেন, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এ পি ভেঙ্কটেশরণ তখন তাঁরই পাশে বসে। প্রধানমন্ত্রীর উত্তর শুনে মুখ চুন করা ৫৭ বছরের ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সেই বিকেলেই পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে রাজীবের বয়সও ছিল ৪৩!
প্রশ্ন হলো, কেন রাহুল অমনটি করলেন? কোন ভাবনা থেকে, কোন মানসিকতা থেকে তিনি ওটা করেছিলেন? এবং তাতে তাঁর আদৌ লাভ হলো কি?
সেই ব্যাখ্যার আগে অর্ডিন্যান্স জারির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে দু-চার কথা বলা দরকার। ভারতের রাজনীতিকে দুর্নীতি ও দুষ্কৃতিমুক্ত করার চেষ্টা কিছু বছর ধরে চলছে। এ জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় টি এন সেশন নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর এই কাজে গতি আনেন। সেই ধারা অব্যাহত আছে ঠিকই, কিন্তু যত দ্রুত তা হওয়া দরকার ততটা হতে পারছে না।
শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকদের মধ্যে পারস্পরিক পিঠ চুলকানি ক্লাব আছে। সেই ক্লাবের সদস্যরা রাজনৈতিক বিরোধ সত্ত্বেও একে অন্যের পাশে দাঁড়ান। এই অলিখিত সহযোগিতার ফলেই দাগি অপরাধীদের এমপি বা এমএলএর সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে সরকার ভারতীয় গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে একটি ধারার [৮(৪)] সংযোজন করে। সেই ধারা অনুযায়ী কোনো এমপি বা এমএলএর কোনো মামলায় অপরাধ প্রমাণিত ও শাস্তি হলেও উচ্চতর আদালতে আপিল সাপেক্ষে সদস্যপদে বহাল থাকতে পারেন। এ দেশের আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে এভাবে কোনো অপরাধী জনপ্রতিনিধি নিম্ন আদালত থেকে উচ্চতর, তারপর উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছাতে জীবন কাবার করে দিতে পারেন। বিচারের বাণীর নীরবে-নিভৃতে কাঁদা ছাড়া উপায় থাকে না।
সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি একটি রায়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের ওই সংশোধনটিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন ও বলেন, যাঁরা দুই বছর বা তাঁর বেশি সাজা পাবেন, তাঁরা এমপি বা এমএলএ থাকতে পারবেন না। ফলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এ দেশের রাজনীতিকদের একাংশ। সংসদের বাদল অধিবেশন তখন চলছিল। অধিকাংশ দলই সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে কিছু একটা করার জন্য। যে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো বিষয়ে একমত হতে পারে না, তারাই একজোট হয়ে আদালতের হুকুমের বিরোধিতায় কিছু একটা করার জন্য সরকারকে চাপ দেয়। সরকার একটা বিল আনে, যাতে বলা হয়, দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সদস্যপদ হারাবেন না, তবে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না, বেতনও নিতে পারবেন না। বিলটি রাজ্যসভায় পেশ হলেও সর্বসম্মত না হওয়ায় তা স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সরকার এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টে একটা রিভিউ পিটিশনও দাখিল করেছিল, যা সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেন। অতঃপর সরকার অর্ডিন্যান্স আনার সিদ্ধান্ত নেয়।
মজাটা হলো, অর্ডিন্যান্সের খসড়া তৈরি হওয়ার সময় রাহুল কিছু বলেননি। খসড়া মন্ত্রিসভায় আলোচিত হওয়ার আগে ও পরে তাঁর আপত্তির কথা কানে আসেনি। কংগ্রেসের কোর কমিটির বৈঠকে দু-দুবার খসড়াটি আলোচিত হয়। রাহুলের মা সোনিয়া গান্ধী আপত্তি করেননি। যেদিন খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেল, সেদিনও রাহুল স্পিকটি নট। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানোর পর প্রণব মুখার্জি যখন প্রশ্ন তোলা শুরু করলেন, রাহুলের বোধোদয় হলো তখন। তারপর তো গোটা দেশ বিস্ময়কর নাটকের সাক্ষী থাকল।
রাহুল কেন এমনটা করলেন? এর মধ্য দিয়ে তিনি কি নিজের মাকেও অপদস্থ করলেন না? তাঁর মায়েরই নেতৃত্বে কংগ্রেসের কোর কমিটি ওই অর্ডিন্যান্স অনুমোদন করেছিল! তিনি নিজেও দলের সহসভাপতি হিসেবে জানতেন না, তা-ও নয়। তবে? দেরিতে বোধোদয়? তা সেই বোধোদয়ই যদি হবে, তাহলে ওই রকম নাটকীয়ভাবে আবির্ভাব ঘটিয়ে দল ও প্রধানমন্ত্রীর বাড়া ভাতে ছাই ফেলে আদৌ লাভ তাঁর হলো কি?
সত্যি বলতে কি, কারও কাছেই এর শতভাগ ঠিক জবাব নেই। যা আছে তা রাহুলের মন ও মানসিকতার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা। বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যখন তাড়াহুড়ো করে অর্ডিন্যান্স আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন রাহুল বুঝতে পারেন জনমত সরকারের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। কারণ, আমজনতা অপরাধী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের হাত থেকে বাঁচতে আগ্রহী। সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে জনতা আদালতের ভূমিকাকেই পছন্দ ও বিশ্বাস করছে। তার ওপর খোদ রাষ্ট্রপতিও যে অখুশি, তা বুঝতেও তাঁর দেরি হয়নি। তাই একেবারে শেষবেলায় তিনি ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।
এবং এখানেই এসে পড়ছে সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক এক বিশ্লেষণ, যা টেনে আনছে নরেন্দ্র মোদি নামক ধূমকেতুকে। মোদির বয়স ৬৩। কিন্তু তাঁর হাঁটাচলা, চাহনি, শরীরী-ভাষা, ভাষণের তীক্ষ ঝাঁজ, ধারালো ও দৃঢ় অঙ্গীকার, চলমান রাজনৈতিক বহমানতাকে অস্বীকার করার সাহস, এসব বুঝিয়ে দেয়, ৬৩ নয়, মোদির বয়স যেন ৩৬। রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করার সাহস ও বিকল্পের প্রতীক হওয়ার উৎসারিত সংকল্প, পারবেন কি পারবেন না, সেই সন্দেহকে আমল না দিয়ে দেশের শহুরে যুব সম্প্রদায় মোদি-জোয়ারে ভাসতে ভালোবাসছে। একইভাবে উঠে এসেছেন আন্না হাজারের শিষ্য আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, দিল্লি রাজ্যের ছোট্ট পরিসরে। প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকে অস্বীকার করার সাহস তাঁরা দেখাতে পারছেন। তুলনায় সোনার কাঠি মুখে নিয়ে জন্মানো রাহুল, পরিবারতন্ত্রের দেয়ালে নির্ভাবনায় হেলান দিয়ে প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন দেখতে দেখতে আচমকাই আবিষ্কার করলেন, তাঁদের সাজানো বাগান মোদি নামক মত্ততায় ছারখার হয়ে যেতে পারে। মোদির আগ্রাসন তাঁর মধ্যে নেই, মোদির ঋজুতা তাঁর মধ্যে কখনো দৃশ্য কখনো অদৃশ্য, মোদির সংকল্পের কাঠিন্য থেকে তিনি সহস্র যোজন দূরে, মোদির মতো ভাষণের দক্ষতা থেকে তিনি বঞ্চিত। ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করার প্রত্যয় অর্জন থেকেও তিনি ব্যর্থ। মোদি, চা বিক্রি করে যাঁর জীবন শুরু, সে রকম এক অজ্ঞাত কুলশীল, যেখানে কালক্রমে লালকৃষ্ণ আদভানিকে টপকে হয়ে উঠছেন পাইড পাইপার, শতাব্দী-প্রাচীন কংগ্রেসকে ফেলে দিয়েছেন প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে, সেখানে রাহুল এখনো রয়ে গেলেন মায়ের আঁচল ও মনমোহনের ছত্রচ্ছায়ায়!
মানসিকতায় ১৮০ ডিগ্রি বদল ঘটিয়ে তাই সম্ভবত রাহুল নিজেকে অন্য অবতারে রূপান্তর ঘটাতে চেয়েছেন। নিজেকে তিনি মোদির আদলে গড়তে চাইলেন, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করার, প্রথাকে ভাঙার, ঐতিহ্যকে অবমাননা করার মতো বিদ্রোহের একটা ফুলকির সন্ধান পাওয়া গেল। মোদির মোকাবিলায় এটা সেই অর্থে তাঁর মেকওভার, যা কিনা এই সময়ের প্রধান দাবি। হাঁফিয়ে ওঠা মানুষ নতুন ভাষার, নতুন ঢঙের, নতুন মুখের, নতুন প্রতিশ্রুতির জন্য মুখিয়ে উঠেছে। মোদি সেই শূন্যতা ভরাটে এগিয়ে এসেছেন। রাহুল কেন পিছিয়ে থাকবেন?
সত্তরের দশকের ভারতীয় সিনেমার রূপান্তরের ইতিহাসটা লক্ষ করুন। ভারতের শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন সমাজ, নতুন ভাষা, নতুন রুচি, নতুন মূল্যবোধ, নতুন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জায়গা দখল করতে থাকে, সেখানে আলালের ঘরের দুলাল মার্কা নায়কদের দিন শেষ হয়ে গেল। উঠে এল নতুন চরিত্র, নতুন ভাষা, নতুন মূল্যবোধ, নতুন নায়ক। সেলিম-জাভেদের স্ক্রিপ্টে জন্ম নিলেন দেশের প্রথম ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিরো’ অমিতাভ বচ্চন। রাহুল তেমনভাবেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে তাঁর দলকে এবারের কঠিন মোকাবিলার উপযুক্ত করে তুলতে চাইছেন অতৃপ্ত রাগী সত্তায় ভর দিয়ে। রাজনীতির যে শূন্যতাকে মোদি দ্রুত ভরাট করে ফেলছেন, সেখানে তাঁর মতো করে তাঁরই ঢঙে ভাগ বসাতে চেয়েছেন রাহুল।
প্রধানমন্ত্রীকে এবং কংগ্রেস সভানেত্রীকে অস্বীকার করে রাহুল দেখাতে চাইলেন, ভবিষ্যতের বস তিনিই। যুগ, সময় ও চাহিদার সঙ্গে তিনি বদলে ফেলেছেন নিজেকে। সেদিনের চিত্রনাট্য তাঁরই রচনা। অভিনেতাও তিনিই। বক্স অফিসের রিপোর্ট পেতে আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকছে দেশ।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।