যুদ্ধাপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে : শেখ হাসিনা

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত কুখ্যাত আলবদর, রাজাকারদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। এ জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এই বিচার কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন হারিয়েছে, এ বিচার তাদের দাবি।’ কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই সাক্ষাৎকার গত জুনে গ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থক সম্প্রতি প্রয়াত ব্রিটিশ সাংবাদিক স্যার ডেভিড ফ্রস্ট। এটি ছিল তাঁর গ্রহণ করা শেষ সাক্ষাৎকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন ডেভিড ফ্রস্ট। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করেন তিনি। মুজিব অনুরক্ত ফ্রস্ট সেই সময়েই ‘স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধু’ নামে একটি বিশেষ তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর এর কাজ থমকে গেলেও মুজিব-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বাঁকবদল এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাঁর দলের রাজনৈতিক উত্থানের বিষয় সম্পর্কে সচিত্র তথ্য ধারণ করেন তিনি। এই তথ্যচিত্রকে তথ্যনিষ্ঠ করতে এ বছরের ১০ থেকে ১২ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকার নেন খ্যাতনামা এই সাংবাদিক। শেখ হাসিনার ভাষ্যে তাঁর বাল্যকাল, পরিবার, স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন, শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী পরিস্থিতি, রাজনীতিতে শেখ হাসিনার আগমন, রাজনীতি, জনগণের ভোটে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে ৪৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ওই তথ্যচিত্রে। অতীত ও বর্তমানের নানা বিষয় মিলিয়ে ধারা বর্ণনা, সাক্ষাৎকার ও ভিডিওর মিশেলে তৈরি এ তথ্যচিত্রে বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচনসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ফ্রস্টের নানা প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যুদ্ধাপরাধের বিচারে অস্বচ্ছতার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে- ডেভিড ফ্রস্টের এমন মন্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘আপনি হয়তো শুনে থাকবেন যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে। এটা সত্য নয়। বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের যে বিচার চলছে, তা কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন হারিয়েছে এ বিচার তাদের দাবি। এ বিচার জনগণের কাছে আমাদের অঙ্গীকার। এ বিচার না হওয়া জাতির জন্য অভিশাপ।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ কাজে সহযোগিতা করেছিল দেশীয় কিছু দোসর। বিশেষত এ কাজে যেসব বাঙালি সহায়তা করেছিল, তাদের বিচার হওয়া উচিত।’
শেখ হাসিনা বলেন, এ কারণে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্থা নেয়। এ জন্য ট্রাইব্যুনাল আইন করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ চলছে।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে আসন্ন নির্বাচন, বিরোধী দল ও বিরোধীদলীয় নেতার প্রসঙ্গও। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের বিরোধ মতাদর্শিক। কারণ আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।’ ফ্রস্টকে তিনি বলেন, ‘যদি আপনি বিএনপির ইতিহাস দেখেন তবে দেখবেন তাদের সময় প্রতিটি নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। সে সময় রাস্তায় মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আর আমাদের দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে। আমাদের সময় প্রতিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে।’ এ সময় আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে বলে ফ্রস্টকে নিশ্চয়তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। জনগণ চাইলে তিনি থাকবেন, না চাইলে নয়।
সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই, আছে আদর্শিক বিরোধ। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁরা একসঙ্গে উপস্থিত হন। তাঁর বাবা যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিয়াউর রহমান তখন ছিলেন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা। সেই সময় থেকেই তাঁদের বাড়িতে সস্ত্রীক জিয়াউর রহমানের যাতায়াত ছিল। তাই খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। তাঁর মতে, দুজন নারী দেশের রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেই একটি শ্রেণী তাঁদের প্রতি ঈর্ষান্বিত।
এ সাক্ষাৎকারে অবধারিতভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। এ সময় শেখ হাসিনা আবেগাপ্লুত হয়ে যান। সাংবাদিক ফ্রস্টকেও বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আরো কিছু বিষয় সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, ‘আমি জানি জনগণের জন্য উৎসর্গকৃত আমার বাবার জীবন। আমিও প্রস্তুত রয়েছি তাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। কারণ আমার বাবার অসমাপ্ত কাজ আমাকে শেষ করতেই হবে।’
সাক্ষাৎকারটি শুরু হয় শেখ হাসিনার বাল্যকালের নানা ঘটনার আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে। এতে মা-বাবা ও দাদা-দাদিকে স্মরণ, শৈশবে স্কুলে যাওয়ার সময়ের ঘটনার স্মৃতিচারণা যেমন ছিল তেমনই মুক্তিযুদ্ধ দেখার অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন শেখ হাসিনা। এ ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল সরকার গঠনের কারণ, ১৯৭৫ সালে তাঁর সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে এ সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে টুঙ্গিপাড়ায়ও গিয়েছিলেন ডেভিড ফ্রস্ট। সুদীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ দিকে আল-জাজিরা টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডেভিড ফ্রস্ট। এ বছরের ৩১ আগস্ট এই খ্যাতনামা সাংবাদিকের মৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ‘দ্য ফ্রস্ট ইন্টারভিউ’ শিরোনামে বেশ কিছু সাক্ষাৎকার প্রচার করছে আল-জাজিরা টেলিভিশন। এই সাক্ষাৎকারও এর অন্তর্গত। বর্তমানে এটি আল-জাজিরার পাশাপাশি ইউটিউবেও পাওয়া যাচ্ছে।