যুদ্ধাপরাধ: মাহিদুর-আফসারের রায় বুধবার

op
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় জানা যাবে বুধবার।

১৯৭১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকায়  হত্যা ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ রয়েছে এই দুজনের বিরুদ্ধে।

দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ২২ এপ্রিল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখে।

মঙ্গলবার বিচারক জানান, বুধবার সকালে এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন তারা।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর এটি হবে অষ্টাদশ রায়।

২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর মাহিদুর ও আফসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর স্কুল মাঠ ও আশেপাশের এলাকায় গণহত্যার ঘটনায় ২০১৩ সালে মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুসহ ১২ জনকে আসামি করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতে একটি মামলা হয়। মামলাটি করেন গণহত্যার শিকার শহীদ পরিবারের সদস্য শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের পারচৌকা গ্রামের বদিউর রহমান বুদ্ধু।

প্রসিকিউশনের তদন্ত দল ওই দুই জনের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে গতবছর ১১ ফেব্রুয়ারি। তদন্তশেষে ৭ খণ্ডে ৯৫৬ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়ন থেকে মাহিদুর এবং বিনোদপুর থেকে আফসারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ওইবছর ১৬ নভেম্বর মাহিদুর ও আফসারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেন প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান। ২৪ নভেম্বর তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয়।

অভিযোগ গঠনের পর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গতবছর ১২ জানুয়ারি শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেডএম আলতাফুর রহমানসহ প্রসিকিউশনের মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে দুই আসামির পক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিলেন না।

সাক্ষ্য-জেরা শেষে দুই পক্ষের আইনজীবীরা আদালতের সামনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, দুই আসামির বিরদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করছে প্রসিকিউশন।

অন্যদিকে দুই আসামির আইনজীবীরা তাদের খালাস দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার বলেন, “আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোতে উল্লিখিত অপরাধের বিচার ইতোপূর্বে হয়ে গেছে। তাই আপনারা এমন বিচার করুন, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে এই বিচার নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।”

এ সময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “দেশে-বিদেশে কে কী বলল, আমরা খেয়াল করি কম। এগুলোর দোহাই দিয়েন না, ভয়ও দেখাবেন না। আমরা শপথ নিয়েছি ন্যায় বিচারের জন্য।”

তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল কোনো রায় দিলে তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ‘শক্তিশালী’।

মাহিদুর-আফসারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

তদন্ত সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দুজন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য সশস্ত্র রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষ করার পর অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক গুলি সংগ্রহ করে অন্যান্য রাজাকারের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার আদিনা ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজ দখল করে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করে এলাকায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মান্তরিত করাসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে থাকেন।

অভিযোগ ১: ১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দিনে মাহিদুর ও আফসারের সহায়তায় পাকিস্তানি দখলদার ও রাজাকার বাহিনী অপারেশন চালিয়ে ৩৯ জনকে আটক, অপহরণ, নির্যাতন করে এবং ২৪ জনকে হত্যা করে।

অভিযোগ ২: ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর বেলা ১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাহিদুর ও আফসারের সহায়তায় রাজাকার বাহিনী শিবগঞ্জের এরাদত বিশ্বাসের টোলা এবং কবিরাজ টোলা গ্রামের ৭০টি বাড়িতে লুণ্ঠন চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।

অভিযোগ ৩: ১৯৭১ সালের ২ নভেম্বর (১২ রমজান, ১৫ কার্তিক, মঙ্গলবার) বেলা ২টা থেকে পরের দিন ৩ নভেম্বর রাত পর্যন্ত তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার শিবগঞ্জ থানাধীন শেরপুর ভাণ্ডার (লক্ষ্মীপুর), আদিনা ফজলুল হক সরকারি ডিগ্রি কলেজ, শিবগঞ্জ সিও দেভ অফিস আর্মি ক্যাম্প এবং উপজেলাসংলগ্ন ইয়াকুব বিশ্বাসের আমবাগান এলাকায় মাহিদুর ও আফসারের সহায়তায় রাজাকার বাহিনী অপারেশন চালিয়ে আটক, নির্যাতন, অপহরণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ করে এবং চার জনকে হত্যা করে।