যুবকের অর্থ ফেরতের কোনো ব্যবস্থা হয়নি

বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) প্রতারণার শিকার তিন লাখ তিন হাজার ৭৩৯ গ্রাহক আপাতত কোনো টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। সব ধরনের হিসাব-নিকাশ করেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো উপায়ই বের করতে পারেনি সরকার। যুবকের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দাবির পরিমাণ দুই হাজার ৫৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা।

ক্ষমতায় আসার এক বছর পর ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের তালিকা তৈরি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বেহাত না হওয়ার জন্য সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। ফরাসউদ্দিন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ীই পরে ২০১১ সালের ৫ মে সাবেক যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে সরকার গঠন করে দুই বছর মেয়াদি যুবক কমিশন।

উভয় কমিশনই যথাসময়ে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, স্থায়ী কমিশন গঠন, বিচারিক আদেশের মাধ্যমে সম্পত্তি অধিগ্রহণ, যুবক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল ইত্যাদি সুপারিশ করা হলেও কোনো সুপারিশই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

ক্ষমতাসীন মন্ত্রী, সাংসদ, রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আনুকূল্য বা পৃষ্ঠপোষকতায় যুবকের অশুভ উত্থান হয়েছে বলে যুবক কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘আর, এই কারণেই অতি মুনাফালোভী ও সহজ-সরল বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত লোক অতি সহজে যুবকের পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে এবং একপর্যায়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।’

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুবক কমিশনের প্রতিবেদনে সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয়েছে। আমরা সমাধানের একটি উপায় বের করার চেষ্টা করছি।’

কী চেষ্টা করছেন জানতে চাইলে সচিব বলেন, শিগগির অর্থমন্ত্রীর কাছে এ ব্যাপারে একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হবে। এতে অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই কিছু সুনির্দিষ্ট মতামত দেবেন বলে তিনি আশা করছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এর আগেও গত ১৬ জুলাই ১৭৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সুপারিশ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি সার-সংক্ষেপ দিয়েছিলেন এম আসলাম আলম। এতে অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য এ রকম, ‘এইটি তো হলো যুবককে নিয়ে। কিন্তু এ রকম আরও প্রতিষ্ঠান নিয়ে এই রকম সমস্যা আছে। ইউনিপেটুইউ, ডেসটিনি। এরা এমএলএম কোম্পানি। এরা সমবায় আইনের অধীনে ব্যাংকিং ব্যবসা করত। এখন অবশ্য এই সুযোগ নেই।’

জানা গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রশাসক নিয়োগসহ যাবতীয় সুপারিশ বাস্তবায়ন ও পদক্ষেপ গ্রহণের মতামতের জন্য আগামী সপ্তাহে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাবে।

প্রসঙ্গত, আগের বারের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৭ সালে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে নিবন্ধনের মাধ্যমে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেটে কয়েকটি দোকান ভাড়া নিয়ে যাত্রা শুরু করে যুবক। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি চালু করে উচ্চ সুদের বিনিময়ে আমানত সংগ্রহ ও ঋণদান কর্মসূচি।

যুবক কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর পল্টনে ২১ শতাংশ, ধানমন্ডিতে সাড়ে ৩৩ শতাংশ, তেজগাঁওয়ে ৪৯ শতাংশ, কাচপুরে ৮৭৮ শতাংশ, চট্টগ্রাম পতেঙ্গা বিমানবন্দরের পাশে ৪০ বিঘা, সাভার মডেল টাউনে প্লট এবং মাদারীপুর চক্ষু হাসপাতালের সামনে সম্পত্তি রয়েছে যুবকের। সারা দেশে রয়েছে যুবকের ১৮টি বাড়ি, ১৮টি প্রতিষ্ঠান এবং ৯১টি জায়গায় জমি। এর মধ্যে কাচপুরের জমি যুবকের ২১ জেলা সমন্বয়কারী নিজেদের নামে লিখে নিয়েছে। এ ছাড়া তেজগাঁও ও পল্টনের জমি বন্ধক দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে যুবক। আর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ধানমন্ডির জমি বিক্রি করে দিয়েছে। যুবকের সম্পত্তির পরিমাণ বাজারমূল্যে তিন হাজার কোটি টাকা হবে বলে মত দেয় ফরাসউদ্দিন কমিশন।

যুবকের প্রতারণামূলক কার্যক্রম নিয়ে ২০০৫ সালে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ২০০৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি তদন্ত করে। তদন্ত প্রতিবেদনে যুবকের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিংসহ নানা প্রতারণার অভিযোগ তোলা হয়। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুবকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

তার আগে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হোসাইন আল মাসুমসহ অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে কয়েক শ মামলা হয়। সবগুলো মামলাতেই তিনি জামিনে রয়েছেন।

যোগাযোগ করলে যুবকের নির্বাহী পরিচালক হোসাইন আল মাসুম প্রথম আলোকে জানান, ‘২০০৬-১২ সময়ে দুই লাখ ২৫ হাজার গ্রাহকের ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি বছরে আরও ৫০০ কোটি টাকার দায় পরিশোধ করার জন্য জেলায় জেলায় সালিস করা হচ্ছে।’

তবে বিদায়ী যুবক কমিশনের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা পরিশোধ বিষয়ে যুবকের নির্বাহী পরিচালক মিথ্যাচার করছেন। পরিশোধের কোনো প্রমাণ তিনি কমিশনের কাছে দাখিল করতে পারেননি।’

যুবক কমিশনের সুপারিশ: কমিশনের সুপারিশের মধ্যে অন্যতম হলো প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে যুবকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা। তবে প্রশাসক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত যে যে এলাকায় যুবকের সম্পত্তি রয়েছে, সেসব এলাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সম্পত্তি সংরক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

যুবক যে অপরাধ করেছে, তার জন্য দণ্ডবিধির ৪০৬ বা ৪৬০ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু এতে দণ্ডের বিধান অপ্রতুল। প্রতারণার কঠোর শাস্তির বিধান রেখে এ জন্য নতুন আইন এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

যুবক বা এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী কোনো গোষ্ঠী যাতে আর গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য অর্থ বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ী সংস্থা বা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যুবক ও যুবকের কর্মকর্তাদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং নামে-বেনামে হস্তান্তর করা সম্পত্তি প্রশাসনিক বা বিচারিক আদেশের মাধ্যমে সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা যায়। এ সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকের আসল টাকা পরিশোধ করা যাবে।

গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ করে বাড়িগাড়ি করা ৪০ জনকে চিহ্নিতও করেছে কমিশন। বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে এলাকাভিত্তিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করা যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকে টাওয়ার নির্মাণ, আরটিভির শেয়ার বিক্রি ও লেনদেন, ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শেয়ার লেনদেন, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া ভাড়া, সাবেক সচিব এম মোকাম্মেল হক ও ভোলার চেয়ারম্যান মজনুর মিয়ার সঙ্গে জমি কেনাবেচা দ্বিপাক্ষিক সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করবে প্রস্তাবিত প্রশাসক।

কমিশনের তদন্ত কাজে যুবক ‘চরমভাবে অসহযোগিতা করেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যে কারণে উভয় কমিশনে সম্পত্তির তালিকায় গরমিল রয়েছে। অবৈধ ব্যাংকিং বন্ধ হয়ে গেলে সারা দেশে শত শত সমবায় সমিতি গড়ে তোলে যুবক। যদিও কমিশনের কাছে পরে তা অস্বীকার করে।