যুবকের হাজার কোটি টাকার আবদার

আবদার আর কি। প্রতারণায় নজির গড়া যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) তিন লাখেরও বেশি গ্রাহকের আড়াই হাজার কোটি টাকা হাপিশ করে এখন সরকারের কাছ থেকেই হাজার কোটি টাকা চাইছে। উদ্দেশ্য দায় পরিশোধ। এর জন্য ‘প্রণোদনা ঋণ’ হিসেবে ওই পরিমাণ অর্থ চেয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে আবেদন করেছে যুবক।
সরকারের কাছে এই টাকা চেয়ে গত ২ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে পাঠানো আবেদনে যুবক বলেছে, প্রতিষ্ঠানটির সদস্যদের কাছ থেকে দায়মুক্তি পেতে সরকার এই প্রণোদনা ঋণ দেবে। দায় পরিশোধের জন্য সরকার ও যুবকের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ দায় পরিশোধ কমিটি’ গঠন করা হবে। ওই কমিটি ঋণের অর্থ যুবকের পাওনাদার গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করবে। ঋণের বিপরীতে যুবকের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদ সরকার জামানত হিসেবে গ্রহণ করবে। আর এসব সম্পদ ব্যবহার করে সরকারের ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব নেবে যুবকের কেন্দ্রীয় পরিষদ। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করতেও আগ্রহী তারা।
যুবকের আবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক এই সরকারের কাছে আমরা আরো আশা করছি, সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে যুবক কর্মকর্তাদের দু-তিনটি বছর কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। এই সময়টাতে জেল-জুলুম, নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পেলে অর্থাৎ এ কাজে সরকারের সহযোগিতা পেলে যুবকের অবশিষ্ট দায় পরিশোধের কাজ সফল করে তোলা সম্ভব হবে।’
গত জুলাই মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া যুবক কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন লাখ তিন হাজার ৭৩৯ জন গ্রাহকের যুবকের কাছে পাওনার পরিমাণ দুই হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। আর দেশের ৪৯টি তফসিলি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন হিসাবে অর্থ রয়েছে মাত্র ৭৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে ৯১টি জমি, ১৮টি বাড়ি ও ১৮টি কম্পানি রয়েছে যুবকের। তবে জমি, বাড়িসহ অন্যান্য সম্পদও বিক্রি চলছে। এ অবস্থায় যুবকের যেসব সম্পত্তি এখনো রয়েছে, একজন প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করে গ্রাহকদের বিনিয়োগ করা আসল অর্থ পরিশোধের সুপারিশ করে কমিশন। যত দিন প্রশাসক নিয়োগ না হবে, তত দিন পর্যন্ত এসব সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আওতায় নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। একই সঙ্গে যুবক ও এর সহযোগী সব সংস্থার নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশও করে দুই সদস্যের এ কমিশন। যুবকের সম্পত্তি, জমি, বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নগদ টাকা বেহাত করার দায়ে ৪০ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছে কমিশন। তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশও করে কমিশন। এই ৪০ জনের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর কাছে টাকা চেয়ে আবেদনকারী যুবকের নির্বাহী পরিচালক হোসাইন আল মাসুমের নামও রয়েছে। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় বিরোধিতা রয়েছে এমন সম্পত্তি যেমন- বিকে টাওয়ার, একটি টেলিভিশন চ্যানেল, সাবেক সচিব মো. মোকাম্মেল হক ও ভোলার চেয়ারম্যান মজনু মিয়ার সঙ্গে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেন-সংক্রান্ত জটিলতা, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া ভাড়া-সংক্রান্ত বিষয়াদিও প্রশাসকের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে কমিশন।
যুবক কমিশনের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে হলে যুবকের সম্পত্তি দ্রুত সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। পরে কম্পানি আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করে যুবকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর তা বিক্রি করে গ্রাহকদের বিনিয়োগ করা আসল অর্থ ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন লাখেরও বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্টের বিচারকদের নিয়ে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সুপারিশও করেছি।’ তিনি বলেন, ‘সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে কেবল যুবক সমস্যার সমাধানই হবে না, ভবিষ্যতে আর এ ধরনের প্রতারণার ক্ষেত্র তৈরি হওয়াও বন্ধ হবে।’
১৯৯৪ সালে সদস্যদের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের মধ্য দিয়ে যুবক কার্যক্রম শুরু করে। ওই সময় প্রায় ২০ ধরনের ব্যবসা ছিল এর। ২০০৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা তদন্তে প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ার পর ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে সময়সীমা ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে যুবক গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেয়নি।