সিলেটে শেখ হাসিনা

যেকোনো মূল্যে নির্বাচন হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে। বিএনপি নেত্রীর সাধ্য নেই নির্বাচন বানচাল করার। নির্বাচন বানচাল হতে দেব না।’
শেখ হাসিনা বলেন, নৌকা মার্কা জনগণের মার্কা। নৌকা বিপদের সাথি, নৌকা মানুষকে রক্ষা করে। নৌকা কখনো ডোবে না। ডুবলেও আবার জেগে ওঠে। তাই আগামী নির্বাচনে আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য তিনি সিলেটবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার এমসি একাডেমী খেলার মাঠে এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইকবাল আহমদ চৌধুরী।
জনসভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কথা দিয়েছিলাম নির্বাচিত হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। সে কাজ আমরা শুরু করেছি। কিন্তু এতে করে বিরোধীদলীয় নেতার দিলে বড় দুঃখ লেগেছে। তিনি তাদের বাঁচাতে চান। কারণ এদেরকেই তো তিনি মন্ত্রী বানিয়েছেন। তাঁর স্বামী জিয়াও যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেউ বন্ধ করতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারের রায় কার্যকর হবেই হবে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন দেখলাম শিক্ষায় সিলেট অনেক পিছিয়ে। এটা একটা অবাক কাণ্ড। তাই এবার শিক্ষামন্ত্রী দিলাম সিলেটের।’ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিলেট এখন শিক্ষায় পিছিয়ে নেই। শুধু সিলেট নয়, সারা দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। পাসের হার বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রীকে উদ্দেশ করেন বলেন, তিনি বক্তৃতা দেন ক্ষমতায় এলে শান্তি দেবেন। তিনি কেমন শান্তি দেবেন? ২০০৫ সালে একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা করে যে শান্তি দিয়েছিলেন? জঙ্গি নেতা বাংলা ভাই সৃষ্টি করে যে শান্তি দিয়েছিলেন? তিনি কি সেই শান্তির বাণী শোনাচ্ছেন? এই শান্তি বাংলার মানুষ চায় না।
বিরোধীদলীয় নেতার একটি বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষমতায় এলে তিনি নাকি ভিন্নভাবে দেশ চালাবেন। আগে তিনি হাওয়া ভবন খুলে পুত্রকে লাগিয়েছিলেন দুর্নীতিতে। এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন। তাই আইনের সামনে যেতে ভয় পান। মামলার তারিখে পালিয়ে বেড়ান। আমি বলি, যদি চুরি না করেন তাহলে আদালতে যান। প্রমাণ করেন এতিমের টাকা খাননি। কিন্তু সেই সাহস তার নেই।’
‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে গেলাম, উনি এসে তা কমিয়ে গেলেন। বিদ্যুতের পরিবর্তে দিলেন প্রচুর খাম্বা। কারণ তাঁর ছেলে এই খাম্বার ব্যবসা করে। এই সিলেটেই যার প্রমাণ রয়েছে। এখানে এসে দেখলাম রাস্তার ধারে শুধু খাম্বা আর খাম্বা। সিলেট বিএনপি নেত্রীর বিয়াইয়ের বাড়ি, তাই বোধহয় আদর করে সিলেটে বেশি খাম্বা দিয়েছেন, বিদ্যুৎ দেননি।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্যসেবা কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে বেকাররা মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করতে পারছে। বেকারদের চাকরির সুযোগ করে দিয়েছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা ইসলামের জন্য কাঁদে। আমি আপনাদের জিজ্ঞাসা করি, যারা বায়তুল মোকাররম মসজিদে আগুন দেয়, কোরআন শরিফ পোড়ায়, জায়নামাজ পোড়ায়, ইমাম সাহেবদের নামাজ পড়তে দেয় না, তারা কী করে ইসলাম বিশ্বাস করে? যারা ইসলামের নাম ধরে মসজিদে আগুন দেয়, বিরোধীদলীয় নেতা তাদের নিয়ে চলেন। আমরা মসজিদের উন্নয়ন করি আর তারা বন্ধ করেন। যারা মসজিদে আগুন দেয়, মুসল্লিদের হত্যা করে তারা কী করে ইসলামে বিশ্বাস করে? ওরা ইসলামের হেফাজত করতে পারে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিরোধী দলের নেতাকে ডাকলাম আসেন আলোচনা করি কিভাবে নির্বাচন হবে। তিনি আলটিমেটাম দিলেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মেনে নেওয়ার। নইলে নাকি পালিয়ে যাওয়ার পথ পাব না। আমি তাঁকে বলতে চাই, শেখ হাসিনা পালায় না। ওই সরকার আমাকে দেশে আসতে বাধা দিয়েছিল। বলা হয়েছিল, এয়ারপোর্টে এলে নাকি আমাকে মেরে ফেলা হবে। আমি জোর করে ফিরে এসেছি। আমাকে গ্রেপ্তার করেছে। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। জীবন দেওয়ার মালিক আল্লাহ, নেওয়ার মালিকও আল্লাহ। সুতরাং তাঁকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করি না।’ প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তিনি ভোট চান না, নির্বাচন চান না। তাহলে কী চান? অরাজকতা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি? বাংলাদেশের মানুষ এগুলো চায় না। তারা চায় উন্নয়ন। বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেছেন আমি নাকি রাষ্ট্রীয় টাকা খরচ করে ভোট চাচ্ছি। আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসের পত্রিকা খুলে দেখুন, আপনি তখন প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় প্রার্থীর নাম বলে বলে ভোট চেয়ে বেড়িয়েছেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো ভোট চাইবই। কারণ আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। আপনি গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসুন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন বলেছেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সব দলের সঙ্গে কথা বলে সার্চ কমিটি করে এই নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। তিনিও (খালেদা জিয়া) সেখানে গিয়েছিলেন। এই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসে নিরপেক্ষভাবে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। উনি বলেন নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ডহীন। তাহলে প্রশ্ন হলো- পাঁচটি সিটি নির্বাচন হলো কিভাবে? আর সেই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা জিতলেন কিভাবে? তাহলে কি তাঁরা কারচুপির মাধ্যমে জিতেছেন? তিনি আসলে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন চান না। তিনি আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন চান।
জনসভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, স্থানীয় এমপি ইমরান আহমদ, হাফিজ আহমদ মজুমদার, শফিকুর রহমান চৌধুরী, মাহমুদ উস সামাদ কয়েস, গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জাকারিয়া আহমদ পাপলু বক্তব্য দেন।
ভিত্তি স্থাপন ও উদ্বোধন : এর আগে প্রধানমন্ত্রী জনসভাস্থলের কাছে সিলেটের পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন এবং সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। যেসব উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন সেগুলো হচ্ছে- সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, কোতোয়ালি মডেল থানায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, ৩১ শয্যাবিশিষ্ট দক্ষিণ সুরমা উপজেলা হাসপাতাল কমপ্লেক্স, কানাইঘাটের সুরমা নদীর ওপর ২৯৪ মিটার দীর্ঘ সেতু, বিয়ানীবাজারের এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও সিলেট জেলা পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। আর যেসব প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন করেন সেগুলো হলো- সেনাবাহিনীর নতুন একটি পদাতিক ডিভিশন ও সিলেট মেরিন একাডেমী, সিলেট শহীদ সামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে রূপান্তর, জাফলংয়ে পিয়ান নদীর ওপর ৩৬০ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ, গোলাপগঞ্জের কৈলাসটিলা গ্যাস ফিল্ডের ৭ নম্বর কূপ খনন প্রকল্পের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ উপজেলায় গ্যাস সরবরাহ পাইপ স্থাপন।
প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর কুর্মিটোলা থেকে বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে সকাল ১০টায় সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে প্রথমে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। পরে তিনি হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এমপিসহ অন্যরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন।