গোয়েন্দাদের দাবি টাকার বিনিময়ে ৭০ সন্ত্রাসী ককটেল বানাচ্ছে, জড়িত জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাও

যেখানে-সেখানে ককটেল

১৮-দলীয় জোটের ডাকে টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালে রাজধানীতে যত্রতত্র ককটেল ও পেট্রলবোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কর্মী ছাড়াও পেশাদার সন্ত্রাসীরা জড়িত বলে দাবি করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, এসব ককটেল ও বোমা তৈরি করে জামায়াত-শিবিরের কর্মী এবং ৭০ জন সন্ত্রাসী।ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, গত শনি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এবং ককটেলসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছে।পুলিশ জানায়, আতঙ্ক ছড়াতে যত্রতত্র ককটেল ফেলে রাখা হচ্ছে। এমন ককটেলকে খেলার সামগ্রী ভেবে হাতে নেওয়ার পর বিস্ফোরণে মঙ্গলবার পশ্চিম জুরাইনে রহিমা আক্তার (৯) ও গতকাল শুক্রবার পান্থপথে মো. মুরাদ (১০) নামের দুই শিশু আহত হয়েছে। ডিবির কর্মকর্তারা জানান, গত বছর বিরোধী দলের হরতাল কর্মসূচিতে রাজধানীতে ১০০টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছিল। অথচ শনিবার দুপুরের পর থেকে এবং রোববার সকাল ছয়টা থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ৬০ ঘণ্টার হরতাল চলাকালে রাজধানীতে ৩০টি স্থান থেকে আড়াই শতাধিক ককটেল ও পেট্রলবোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের ২২ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ৫৮টি মামলা ও অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই জামায়াত-শিবিরের কর্মী, বাকিরা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কর্মী বা ভাড়া করা সন্ত্রাসী। আগে ককটেল ও পেট্রলবোমা তৈরির ৫০ জন কারিগর ছিল। এখন হয়েছে ৭০ জন। এরা পেশাদার সন্ত্রাসী।

অবশ্য ভুক্তভোগী, হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে রাজধানীর তিন শতাধিক স্থানে কমপক্ষে চার শতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ হয়েছে।

ডিবির বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রধান অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ককটেল তৈরিতে জড়িত ব্যক্তিদের তালিকা করে ইতিমধ্যে কিছু পেশাদার সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ডিবির সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত ও সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, আমিনবাজার ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাকে নিরাপদ মনে করে মেস হিসেবে বাসা ভাড়া নিয়ে পেশাদার কারিগরেরা ককটেল ও পেট্রলবোমা তৈরি করছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বোমা তৈরি ও বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ভাড়া করে। এ ছাড়া ফকিরাপুলের অলিগলি, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় মেসে থাকা জামায়াত-শিবিরের কারিগরেরাও ককটেল ও পেট্রলবোমা তৈরি করছে। ৯ অক্টোবর ফকিরাপুলের একটি ছয়তলা বাড়ির চতুর্থ তলার বাসায় ককটেল বানানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, ছাত্রশিবিরের এক কর্মী ককটেল বানানোর জন্য ওই বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন।

রোববার আজিমপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে ১৭টি ককটেল ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী ওই ঘটনার সঙ্গেও জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন ব্যক্তি বলেছেন, তাঁরা ককটেল ও পেট্রলবোমা বানিয়ে রাজনৈতিক দলের কাছে বিক্রির পাশাপাশি এগুলোর বিস্ফোরণও ঘটিয়ে দেন। এখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ছোট একটি ককটেল ২০০ টাকার স্থলে ৪০০ এবং মাঝারি একেকটি ককটেল ৭০০-৮০০ টাকার স্থলে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, ককটেল ও পেট্রলবোমায় শিল্পে ব্যবহূত আমদানি করা কেমিক্যাল ও উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। কতিপয় অসাধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এসব কেমিক্যাল ও উপাদান অধিক মুনাফার জন্য ককটেল তৈরিকারকদের কাছে বিক্রি করছে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এসব উপাদান আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়ে শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তালিকা পাওয়া গেলে কাঁচামালের সহজলভ্যতা রোধ করা যাবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ককটেল বিস্ফোরণের বেশ কিছু স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। নগরজুড়ে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে এসব নাশকতা রোধ করা যেত।

অবশ্য মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আগেভাগে নাশকতার স্থান চিহ্নিত হওয়ায় ককটেলসহ নিক্ষেপকারীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হচ্ছে পুলিশ।