রাজধানীতে ঘরেবাইরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ

আজ রবিবার ভোর ৬টা থেকে ঢাকা মহানগর এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ইত্যাদি পালনে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। মূলত ২৫ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকায় এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পুলিশ। ডিএমপি অধ্যাদেশের ২৮ ও ২৯ নম্বর ধারার ক্ষমতাবলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বেনজীর আহমেদ গতকাল শনিবার এ আদেশ জারি করেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ আদেশ বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান। পুলিশের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়েছে, সভা-সমাবেশের এই নিষেধাজ্ঞা ঘরে-বাইরে উভয় ক্ষেত্রের জন্যই প্রযোজ্য থাকবে। তবে ধর্মীয় সমাবেশ ও একাডেমিক সভা-সেমিনার এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, ডিএমপি আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখা যায়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন করে আদেশ জারি করে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরো বাড়াতে পারেন। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে সরকার ইচ্ছা করলে যত দিন ইচ্ছা নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডিএমপি অধ্যাদেশে বিস্তারিত বলা আছে। পুলিশ ডিএমপি অধ্যাদেশ মেনেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বলে ডিএমপি কমিশনার জানান।
আধাঘণ্টা পরই নিষেধাজ্ঞা : সূত্র জানায়, পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রায় আধাঘণ্টা আগে ২৫ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের অনুমতি চেয়ে বিএনপির পক্ষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন জমা দেন। গতকাল শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে যান ফারুক। এ সময় সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী তাঁর সঙ্গে ছিলেন। আবেদনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পল্টন ময়দান অথবা নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে মহাসমাবেশ করার অনুমতি চাওয়া হয়। আর এর আধাঘণ্টা পর ডিএমপির পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা মহানগর এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা জারি করা হয়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ও ডিএমপির উপকমিশনার মাসুদুর রহমান দুজনই এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আর এর মাধ্যমে কার্যত ২৫ অক্টোবরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ আয়োজনের আর কোনো সুযোগ থাকল না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য দল ও সংগঠন ২৫ অক্টোবরসহ আগের কয়েক দিনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছিল। বিশেষ করে আজ রবিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পেশাজীবী সংগঠনের এক সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সেটাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি সমাবেশে আতঙ্ক : ডিএমপির মুখপাত্র মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল শনিবার জানান, নাশকতা ও সংঘর্ষসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় রাজধানীতে সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিলের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো গুজব বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে যাতে কেউ পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখছেন তাঁরা। কেউ যেন দা-কুড়াল নিয়ে প্রস্তুতির সুযোগ না পায়, সে জন্য ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চলছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা গত সোমবার বিএনপির এক সভায় ২৫ অক্টোবরে সবাইকে দা, কুড়াল, বল্লম নিয়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে, ঈদে বাড়ি যাওয়া মানুষ ঢাকায় ফেরার সময় তাদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা ঢুকবে এবং তারা নাশকতা চালাতে পারে।
পুলিশ কমিশনারের বিজ্ঞপ্তি : গতকাল ডিএমপি কমিশনার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় আগামী ২০ অক্টোবর, ২০১৩ (আজ) হতে পরস্পরবিরোধী কয়েকটি দলের উসকানিমূলক ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন সভা-সমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে। সমাবেশগুলোকে সামনে রেখে বিভিন্ন গোষ্ঠী ক্রমাগত প্রকাশ্যে মারাত্মক উসকানিমূলক ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন বক্তব্য প্রদান করে আসছে। ফলে জনমনে অনিশ্চয়তা, ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টির প্রকৃত আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আমার নিকট প্রতীয়মান হয় যে এসব মিছিল, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হলে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম ও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিরাজমান।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘যেহেতু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেহেতু আমি বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার) পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স (অর্ডিন্যান্স নম্বর-৭৬)-এর ২৮ ও ২৯ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে ২০ অক্টোবর, ২০১৩ রবিবার সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় সকল প্রকার মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, গণ-অবস্থান, সভা-সমাবেশ, মিছিল, সকল প্রকার ছড়ি বা লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি। যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও রাস্তায় দাঁড়িয়ে/বসে কোনো ধররের সভা-সমাবেশ ও মিছিল করা যাবে না মর্মে ঘোষণা করছি। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’
ঘরে-বাইরে নিষেধাজ্ঞা : এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম গতকাল বলেন, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধনের ওপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা ঘরে বা মিলনায়তনে অর্থাৎ ‘ইনডোরেও’ বলবৎ থাকবে। যেহেতু সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেহেতু ‘ইনডোর-আউটডোর’ দুটিতেই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, একাডেমিক সভা-সেমিনার নিষেধাজ্ঞার আওয়তায় আসবে না।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো কি না- এমন এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, শুধু ২৫ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। আগামী কয়েক দিনে অন্য দলগুলোরও বেশ কিছু কর্মসূচি রয়েছে।
অনুমতি না মিললেও… : সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি আগামী ২৫ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি দেয়, যাতে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার যোগ দেওয়ার কথা ছিল। একই দিন আওয়ামী লীগও রাজপথে থাকার ঘোষণা দিলে হানাহানির আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। ২৫ অক্টোবরের সমাবেশে কোনো ধরনের বাধা না দিতে সরকারকে হুঁশিয়ার করে কর্মীদের সশস্ত্র প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা। এ নিয়েও ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। ঈদের পর দ্রুত ঢাকায় ফেরার তাগিদও দেখা যায় মানুষের মধ্যে। এদিকে সমাবেশের অনুমতি না পেলেও আগের মতোই বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি নেতা জয়নুল আবদিন ফারুক গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, খালেদা জিয়ার ২৫ অক্টোবরের জনসভা পণ্ড করতে সরকার নানা কৌশল করছে। জনসভার জন্য অনুমতি চাইলেও এখনো তা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, এই সরকারের শেষদিন ২৫ অক্টোবর। এর পর থেকে তাদের কথামতো আর দেশ চলবে না।’
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, যেকোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা শক্ত হাতে দমন করা হবে। তিনি বলেন, ‘তারা যদি জনগণের জন্য কেয়ামত আনতে চায়, তাহলে জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের আছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া ও শান্তি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। ইনশা আল্লাহ, সে দায়িত্ব অতীতে যেভাবে যথাযথভাবে পালন করেছি, এখনো সেভাবেই করব।’
তবু নাশকতার আশঙ্কা : এদিকে সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও নাশকতার আশঙ্কা রয়েই গেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। জনমনের উদ্বেগ কাটাতে আগে থেকেই সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকার প্রবেশপথসহ সম্ভাব্য সন্দেহজনক বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। নাশকতার যেকোনো অপচেষ্টা ঠেকাতে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা এবং জামায়াতের নেতা-কর্মীদের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ২৫ অক্টোবরের আগেই জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি ফেনী ও কিশোরগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের বেশ কিছু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, জামায়াত-শিবিরের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় রেখে কাজ করছে তারা।
পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দাদের দাবি, ২৫ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে তাঁদের কাছে তথ্য আছে, ঈদের আগে গ্রামে যাওয়া মানুষের সঙ্গে ঢাকায় ফিরতে শুরু করবেন বিরোধীদলীয় বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। তারা একযোগে না এসে কয়েক দিন ধরে আসতে পারে। গতকাল শনিবার থেকে ঢাকায় ফেরা মানুষের সংখ্যা আরো বেড়েছে। এ কারণে লঞ্চ, ট্রেন, বাস স্টেশনসহ পুরো ঢাকায় পুলিশি তল্লাশি চলছে। যেহেতু মতিঝিল ও পল্টন এলাকা ঘিরে সমাবেশ হওয়ার কথা, এ কারণে এই এলাকায় ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার গোপীবাগের বাসাকেন্দ্রিক চলছে বিশেষ গোয়েন্দা তৎপরতা। এ ছাড়া পুরান ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় নজরদারি চলছে। কৌশলগত কারণে এই এলাকাকে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির আন্দোলনে মাঠে থাকার কথা ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের। এসব সহযোগী সংগঠনের নেতাদের ওপরও নজরদারি করছেন গোয়েন্দারা। নাশকতার পরিকল্পনাকারীরা পুলিশের নজর এড়িয়ে কৌশলে কাজ করছে বলেও গোয়েন্দা সূত্র আশঙ্কা প্রকাশ করছে।