বিএনপি

রাজধানী বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা

জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না এলে অধিবেশন শেষে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে বিএনপি। সে লক্ষ্যে আগামী ২৫ অক্টোবরকে ‘ডেডলাইন’ ধরে আন্দোলনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। পরিকল্পনা রয়েছে কৌশলে রাজধানী ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার। সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে সাত দিনের মধ্যে দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই এমন সাঁড়াশি আন্দোলনের দিকে যাবে ১৮ দলীয় জোট। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনে পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কর্মসূচি সফল করতে দলের নেতা ছাড়াও পেশাজীবীদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর মাধ্যমে তারা সারা দেশ থেকে রাজধানী ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে আগামী আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির বিভাগীয় সম্পাদকরা বলেন, ‘মেয়াদের বাইরে সরকার ক্ষমতায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই আমাদের কঠোর কর্মসূচি দিতে হবে।’ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি দল দলীয় সংবিধান করে জনগণের ভোগের অধিকার কেড়ে নিয়ে যাবে আর জনগণ বসে থাকবে তা হতে পারে না। জনগণ তাদের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নেমে আসবে, আন্দোলন করে নিজেদের দাবি আদায় কর নেবে এটাই স্বাভাবিক। আর এটি করতে গিয়ে শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই আন্দোলন চলবে।
সূত্র জানায়, পবিত্র ঈদুল আজহা ও শারদীয় দুর্গোৎসবের বিষয়টি বিবেচনায় এনে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী কোনো কর্মসূচি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। দেশব্যাপী আন্দোলনের ছকও সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এই ছক নিয়ে ঈদের পর দলের স্থায়ী কমিটি ও জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন খালেদা জিয়া। সম্মিলিতভাবেই আন্দোলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
আন্দোলন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর কেন্দ্র থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তবে ওই ঘোষণা নির্দিষ্ট সময় বলেকয়ে দেওয়া হবে না। শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। ঘোষণার পরপরই ঢাকাকে অচল করে দেওয়া হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর নেতাদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, বলামাত্র যেন তাঁরা নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠে তৎপর হয়ে উঠতে পারেন। একই সঙ্গে ঢাকার প্রবেশদ্বার ও আশপাশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে নেতারা সার্বক্ষণিক অবস্থান নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন।
বিএনপির ওই নেতা জানান, ঢাকায় আন্দোলন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় মহানগরগুলোও অচল করে দেওয়া হবে। আর বিভাগীয় শহরগুলোতে লোক সমাগম হবে আশপাশের জেলাগুলো থেকে। তারা ওইসব শহরের প্রবেশদ্বারসহ নির্ধারিত বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
সূত্র জানায়, বিভাগীয় শহরগুলোতে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সাত নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগরের দায়িত্বে থাকবেন একজন। এ ক্ষেত্রে আন্দোলন যতখানি ‘ধ্বংসাত্মক’ হওয়া প্রয়োজন তা করা হবে। আর জোরালো আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে ‘ফল’ পেতে চায় দলটি।
প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে ঢাকার বাইরে কয়েকটি জনসভায় খালেদা জিয়া আগামী ২৪ অক্টোবরের পর হরতাল, অবরোধ এবং ঘেরাও কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সরকারের মেয়াদের শেষ দিন ২৪ অক্টোবর বা তার পরদিন ২৫ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ করতে পারে বিএনপি। এমন তথ্য দিয়েছেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবদুস সালাম। তিনি জানান, ঢাকা মহানগর বিএনপির আয়োজনে ওই সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধান অতিথি থাকবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সংসদের চলতি অধিবেশনে সরকার কী করে আমরা তা লক্ষ্য করছি। সরকার দাবি না মানলে যা যা করা দরকার তা-ই করা হবে।’
সারা দেশে একযোগে আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি বলেন, ‘মেয়াদের বাইরে সরকার ক্ষমতায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই ঢাকা তো বটেই, বিভাগীয় এমনকি জেলা শহরগুলোতেও আমরা কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব। দেশের এই সংকটময় সময়ে চেয়ারপারসন প্রতিটি বিভাগের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করছেন। সেসব বৈঠকেও তিনি আন্দোলন গড়ে তোলার নির্দেশনা দিচ্ছেন।’
ঢাকার বিভাগীয় সম্পাদক ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘আমরা নিজেদের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছি। সরকার মেয়াদের এক দিনের বেশি ক্ষমতায় থাকলে আমরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। আর সেই আন্দোলন একযোগে দেশজুড়ে চলবে।’
খুলনার বিভাগীয় সম্পাদক মসিউর রহমান বলেন, শুধু ঢাকা কেন, এই আন্দোলন চলবে গ্রাম পর্যন্ত। রাজশাহী বিভাগীয় সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, ২৪ অক্টোবরের পর যে কর্মসূচি কেন্দ্র ঘোষণা করবে সে অনুযায়ী সারা দেশে আন্দোলন চলবে।
গাইবান্দা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাউছুল আজম ডলার বলেন, ‘মহাসচিব এরই মধ্যে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা আসা মাত্র ঘোষিত কর্মসূচি পালন করতে। এ ক্ষেত্রে রাজপথ, রেলপথ অবরোধসহ বিভাগীয় বা জেলা শহরেও যদি কর্মসূচি পালন করতে হয় আমরা তা করব।’