রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা : আতঙ্কিত ব্যবসায়ীরা

তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের : রাজনৈতিক দুর্যোগে আতঙ্কিত ব্যবসায়ীরা। সরকার ও বিরোধী শিবিরের অনড় অবস্থানের কারণে সম্ভাব্য রাজনৈতিক মহাদুর্যোগের ভয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন বিনিয়োগ। মন্থর হয়ে গেছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। ১/১১’র শিক্ষা কাজে লাগিয়ে অবৈধ ও বৈধ অর্থ পাচার করে দিচ্ছেন বিদেশে। নিজেদের দেশ ছাড়ার পথও ঠিক করে ফেলেছেন অনেক ব্যবসায়ী। রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, চলতি বছরের গত আট মাসেই বিভিন্ন উপায়ে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রোধ করে দিয়েছে অর্থনীতির গতি। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত একরকম স্থবির। বিনিয়োগকৃত অর্থ ফিরে পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা। তাই হাত গুটিয়ে নিয়েছেন নতুন বিনিয়োগ থেকেও। এক বছরের ব্যবধানেই বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এতে বেকারত্ব সমস্যা ভয়াবহভাবে বাড়ছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে প্রয়োজন বড় দুই রাজনৈতিক দলের সমঝোতা। এর দিকেই তাকিয়ে আছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক অনৈক্য দুর করে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
হালনাগাদ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্য মোটেও ভালো না। গেল অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। এসব পণ্য সরাসরি বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত বেসরকরি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ১১ শতাংশ। বর্তমান সরকারের আমলে গত চার অর্থবছরের মধ্যে এ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ম। আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা চলছিল। সেই সময়ও বেসরকারি খাতের ঋণে ২৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ছিল।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিসংখ্যানও হতাশাব্যঞ্জক। বিনিয়োগ বোর্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ নিবন্ধন আগের অর্থবছরের (২০১১-১২) তুলনায় কমেছে ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে যৌথ ও সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ৩৯ শতাংশ।
ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের কারণে বর্তমানে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে কালো টাকার পাশাপাশি বৈধ আয়ের অনেক ভালো টাকাও ডলারে রূপান্তরিত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। এটাকে অর্থনীতির জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত হিসেবে মনে করছেন অর্থনীতিবিদগণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা সেলের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশ থেকে পাচার হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাদের শঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো দেশ থেকে পাচার হয়ে যাবে। এনবিআর’এর তথ্য মতে, গত পাঁচ বছর ধরেই প্রতিবছর গড়ে পাচার হচ্ছে ২৩ হাজার কোটি টাকা। নির্বাচনের বছরে এটা দ্বিগুণ হবে- এটাকেই স্বাভাবিক মনে করছে রাজস্ব বোর্ড।
অর্থ মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতি বছরের বাজেটেই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলেও তা তেমন কাজে আসছে না। গত ৪২ বছরে সাদা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ দেশে ১শ বিলিয়ন ডলারের (৮ লাখ কোটি টাকা) বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের সঙ্গে একান্ত আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমান রাজনৈতিক গতিধারার আলোকে আরেকটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সেনা শাসনের আশঙ্কা করছেন তারা। আর এক্ষেত্রে তাদের মনে ভয় জাগাচ্ছে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের নির্যাতনের স্মৃতি। তারা জানান, তখনকার সরকারের পেছনের শক্তি তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক হাতিয়ে নেয় হাজার কোটি টাকা। তাই এবারও একই সমস্যায় পড়তে চান না তারা। তাই বিভিন্ন উপায়ে তারা তাদের অর্থ দেশের সীমানা পার করছেন। অনেকে রপ্তানি আয় দেশে আনছেন না। প্রয়োজনে নিজেরাও যাতে পালাতে পারেন সে ব্যবস্থাও করে রেখেছেন অনেকে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দীন বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে আমাদের নির্বিঘেœ ব্যবসা করতে দেওয়া। আমরা যদি দেশের উন্নতি করতে চাই, তবে রাজনৈতিকভাবে দ্বন্দ্ব দূর করতে হবে, হানাহানি বন্ধ করতে হবে। কারন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আতঙ্কে আছি। রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর হলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি, আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবসায়ীবান্ধব নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করবে। আর এই নির্বাচনী ইশতেহার দেখে আমরা ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্ত নেবো, আমরা কোন দিকে যাবো। তিনি বলেন, বড় দলগুলোর হানাহানির জন্য ঋণের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। আমরা যারা ব্যবসায়ী, তারা লাভের কথা চিন্তা করি। আর ব্যবসায়ীদের ব্যবসার ভালো সুযোগ করে দেয় রাজনৈতিক দলগুলো। আমরা আশা করবো, দুই নেত্রী ও হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ এক হয়ে সব সমস্যা নিরসন করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবেন।
এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেছেন, বিনিয়োগে ধীরগতির অন্যতম কারণ অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা। এর ওপর সাম্প্রতিক সময়ের সাংঘর্ষিক রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক উদ্যোক্তাই সময় নিচ্ছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের পরিবেশ না পেলে বিনিয়োগ করতে চান না।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমরা প্রত্যেকেই উদ্বিগ্ন। পোশাক শিল্পসহ সব ধরনের শিল্পেই বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। ইতোমধ্যেই রপ্তানি আয় কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নির্ভর করে ইমেজের ওপর। এমনিতেই তাজরিন ও রানা প্লাজার ঘটনা নিয়ে মারাত্মক ইমেজ সংকটে রয়েছে পোশাক খাত। এর ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন সংকট তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আসছে না। তারা রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা আশা করব, রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমান সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান করবে। অর্থনীতি ও দেশের স্বার্থে তারা সমঝাতার পথে আসবে- এ প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের।
বেসরকারি খাতের স্থবিরতার বিষয়ে দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে মাহমুদ সাত্তার বলেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিবদমান অবস্থা উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেকেই এখন অপেক্ষা করছেন। এ বিবেচনায় তারা ঋণ নিচ্ছেন না। এতে বেসরকারি খাত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ৬১৪ কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ২ লাখ ৬৯ হাজার লোকের কর্মস্থানের প্রস্তাব এসেছে। আগের অর্থবছরে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ছিল ৫৩ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কর্মসংস্থান ছিল ৩ লাখ ২৬ হাজার লোকের। বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধনও কমেছে। এ ধরনের বিনিয়োগ প্রস্তাব গত অর্থবছরে ছিল ২৭৩ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪৪৭ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাবদ ২১২ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৫২ কোটি ডলার। মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি বস্ত্র খাতে কমেছে ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে চামড়া খাতে ৫৭ শতাংশ, পাট খাতে ৩১ শতাংশ এবং ওষুধ খাতে ২১ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি কম হয়েছে ১২ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট তরল সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা ও সরকারকে ঋণ দেওয়া বাবদ বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের (এসএলআর) বাধ্যবাধকতা রয়েছে ৯৪ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৮০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তবে এর মধ্যে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকার সরকারি সিকিউরিটিজ কেনা রয়েছে ব্যাংকগুলোর। সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের ঋণযোগ্য তহবিল অলস পড়ে আছে।