রামপাল নিয়ে চিন্তা করার আছে…সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে রামপালে যে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বিরোধিতা করে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ২৪-২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রামপাল লংমার্চ করে। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই যেখানে ‘সরকারবিরোধী’ আখ্যা জুটে যায়, সেখানে রামপাল প্রকল্পের মতো একটা বিশাল কর্মযজ্ঞের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আয়োজনকারীদের সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। রামপালের বিরোধিতাকারীরা তাঁদের যুক্তি তুলে ধরেছেন, যার প্রতি সমর্থন আছে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু সরকার সেসব যুক্তি আমলে নিচ্ছে না। সরকারের যুক্তি হলো বিরোধিতাকারীদের পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। ফলে ২২ অক্টোবর রামপাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার পরিকল্পনা নিতে সরকার এগোচ্ছে।
২৭ সেপ্টেম্বর পত্রপত্রিকায় ছাপা হওয়া একটি প্রেসনোটে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। প্রেসনোটটি শুরুই হয়েছে আক্রমণাত্মক ভাষায়। বলা হচ্ছে, ‘কিছু ব্যক্তি/ সংগঠন এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে নানা রকম অপপ্রচার চালিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।’ তারপর অবশ্য ‘কেন রামপাল,’ সে সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রেসনোট অতঃপর রামপালের সপক্ষে যেসব তথ্য দিয়েছে, তা জনমনের বিভ্রান্তি মোচনে যথেষ্ট নয়। বলা হচ্ছে, সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ও উন্নত মানের আমদানিনির্ভর কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন, সালফার, ফ্লাই অ্যাশ ও অন্যান্য বায়ুদূষণের পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়ে থাকবে। এই ন্যূনতম পর্যায়টি কী তা বলা হয়নি এবং কিসের ভিত্তিতে, কোন গ্রেডের আমদানিকৃত (আমদানিনির্ভর নয়) কয়লা ব্যবহারে এটি সম্ভব হবে, তাও বলা হয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যে state-of-the-Art একটি স্থাপনা হতে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে (যেহেতু মানুষকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আর নির্ভর করতে হবে না) এ বিষয়ে প্রেসনোট পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেনি। দেখা যাচ্ছে, জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি মোচনের তেমন চেষ্টা না করে প্রকল্পটির পক্ষে সাফাই গাওয়াটাই প্রেসনোটের প্রধান কাজ (প্রেসনোট-সাহিত্যের এটিই অবশ্য মৌলিক কর্তব্য)।
আমি নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিষয়ে অজ্ঞ। কিন্তু আমার একটি সুবিধা আছে এবং তা হলো এই, এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবারের অনেকেই আছেন, যাঁরা এ ব্যাপারে অনেক বেশি জানেন ও বোঝেন। এর বাইরে বিদ্যুৎ খাতে কাজ করেছেন, এ রকম কয়েকজন প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারককে আমি চিনি। বেশ কিছুদিন থেকেই আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করেছি। আমি রামপালের বিপক্ষের যুক্তিগুলো যেমন শুনেছি, এর পক্ষের যুক্তিগুলোও আমলে এনেছি। আমার মনে হয়েছে প্রকল্পের ইস্যুগুলো এত সাদা-কালো নয়; এর সঙ্গে শুধু প্রকৌশল, উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থাপনা এসব ব্যাপারই জড়িত নয়, বরং অর্থের একটা দিকও জড়িত। এত বড় একটি প্রকল্প—এর অর্থের জোগানদারেরা তো রয়েছেই, আরও রয়েছে তাদের পছন্দের ঠিকাদার স্থানীয় সরবরাহকারী বা এজেন্টরা, উন্নত মানের কয়লা জোগান দেবে যে রপ্তানিকারক, সে বা তারা, যে জাহাজ প্রতিদিন কয়লা পৌঁছে দেবে, সেই জাহাজের মালিক ইত্যাদি এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্যব্যবস্থাপনা, গরম পানি ঠান্ডা করার প্রযুক্তি ইত্যাদির ব্যবস্থাপনাও। এত মানুষের বিনিয়োগ যেখানে থাকবে, সেখানে লাভের অঙ্কটাও বড় হতে হবে। পদ্মা সেতু নিয়ে যে হযবরল হয়ে গেল, তা যদি আমাদের কিছু শিক্ষা দিয়ে থাকে তা হলো যেখানেই বিশাল মুনাফার সম্ভাবনা, সেখানেই দুর্নীতির তোড়জোড়। রামপালের এ দিকটাও ভেবে দেখা দরকার।
ভারতে এখন নির্বাচনের মৌসুম শুরু হয়েছে। কাগজে পড়লাম, এক মন্ত্রী (অথবা প্রতিমন্ত্রী) এক দিনেই অসংখ্য প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। আমাদের সরকার যে রকম রামপাল প্রকল্পকে নির্বাচনী কাজে লাগাতে পারে (সম্ভাবনাটাই বেশি) সে রকম ভারতের কংগ্রেস সরকারও তো রামপাল প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তিটা বাড়াতে চাইবে। তা ছাড়া সব সরকারেরই নিজেদের মানুষ এ রকম বড় বড় প্রকল্প থেকে উপকৃত হয়। এ জন্যই কি রামপাল নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনাই হলো না?
সরকারের পক্ষে যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তার কিছুর সঙ্গে আমরা একমত—আমরা বিদ্যুৎ চাই, মানুষকে গাছ কাটা থেকে নিবৃত্ত করতে চাই, মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করতে চাই। কিন্তু যেসব যুক্তি বিরোধিতাকারীরা তুলে ধরছেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা নেই কেন? ফলে আমাদের যখন বলা হয়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং এর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করবে এবং এর পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়, তখন আমাদের বিভ্রান্তি নয়, বরং একটা আশঙ্কা জাগে যে বস্তুত তা-ই হতে যাচ্ছে। শুধু জাতীয় তেল-গ্যাস রক্ষাকারী কমিটিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত টাইম সাময়িকী ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত (অনলাইনে দেওয়া) একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছে, টেক্সাসের ফায়েটে ১৯৭৯ সালে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়, যা থেকে প্রতিবছর ৩০ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে। এর প্রভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গাছপালা মরে গেছে। এখন এটি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে মানুষ। অথচ রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসরণ হবে ৫২ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড। টাইম-এর প্রবন্ধটির শিরোনাম হচ্ছে, ‘প্রকৃতিকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় না’, এবং এতে বলা হয়েছে, ভারত সরকার গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে এ ধরনের দুটি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে, কারণ মানুষ এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশে যদি ভারত state-of-the Art কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা করে থাকে, নিজ দেশে নিশ্চয় এ রকম সর্বাধুনিক কেন্দ্রই চালু করত। তার পরও প্রতিবাদ। তারপর পিছু হটা। অথচ বাংলাদেশে যারা প্রতিবাদ করছে, তাদের দোষ দেওয়া হচ্ছে জনগণকে ‘বিভ্রান্ত’ করার জন্য। বিভ্রান্ত আসলে কারা করছে?
রামপাল নিয়ে লেখা একটি নিবন্ধ থেকে জানা গেল, ৫২ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি প্রতিদিন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে ১৩ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পুড়বে, তাতে ছাই জমবে প্রায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া এ কেন্দ্র থেকে নাইট্রাস অক্সাইড, বিভিন্ন ক্ষুদ্র কণিকা, কার্বন মনোক্সাইড, পারদ বা মারকারি, সিসা, আর্সেনিকসহ নানা পরিবেশ ক্ষতিকারক উপাদান নির্গত হবে। একই সঙ্গে কয়লা-ধোঁয়া পানির সঙ্গে মিশে তৈরি হয় বিষাক্ত কোল স্লাজ। এতগুলো বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো একবার state-of-the-Art বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় দেখা দিতে শুরু হলে আর্ট দরজা দিয়ে পালাবে। আমরা সামান্য একটা পুল বা ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাই, পুরোনো হতে থাকা রামপালকে তাহলে আমরা কীভাবে সামাল দেব?
বর্জ্যব্যবস্থাপনা নিয়ে, পানি পরিশোধন নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার নয়। ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তাও স্বচ্ছ নয়। রামপাল নিয়ে লেখা প্রবন্ধে বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশ অর্থ আসবে বিদেশি ঋণ থেকে, বাকি ৩০ শতাংশ বহন করবে ভারত ও বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ করবে ভারত, ১৫ শতাংশ বাংলাদেশ। অর্থাৎ ভারতের বিনিয়োগ মাত্র ১৫ শতাংশ, অথচ তার মালিকানা থাকবে ৫০ শতাংশ। এটি নিছক অনুমান নয়। চুক্তিপত্রের অনুলিপি ছাপা হয়েছে প্রবন্ধটিতে। এ ক্ষেত্রেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয়। বিভ্রান্তিটা তাহলে দূর হবে কীভাবে?
আমি আগেও বলেছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ুক তা আমরা সবাই চাই। কিন্তু যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে একটা বিশাল বিতর্ক উঠেছে, প্রথমেই তার নিরসন হওয়া চাই। এ জন্য রামপাল নিয়ে যেন অযথা তাড়াহুড়া করা না হয়। যাঁরা এর বিরোধিতা করছেন, তাঁদের প্রতিপক্ষ না ভেবে বরং সহযোগীই ভাবতে হবে এবং এ ব্যাপারে অর্থবহ আলোচনা শুরু করতে হবে। যদি দেখা যায়, যেসব ব্যাপারে উদ্বেগ এবং আপত্তি দেখা দিয়েছে, সেগুলো নিরসন করে অন্যত্র এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা যাবে, আমি নিশ্চিত সবাই সরকারকে সাধুবাদ জানাবে। এটি খুব কঠিন কোনো কাজ নয়, এ জন্য প্রয়োজন একটু রাজনৈতিক সদিচ্ছার। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনমত উপেক্ষা করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করলে এবং বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের আশঙ্কামতো সুন্দরবন ধ্বংস হলে বিপর্যয়টা হবে দেশের এবং মানুষের। প্রধানমন্ত্রী ‘সমুদ্র বিজয়ের’ জন্য প্রশংসিত হয়েছেন; তাহলে ‘সুন্দরবন ধ্বংসে’র কাজে কেন তাঁর সরকার নামবে, যেখানে যথেষ্ট বিকল্প রয়ে গেছে?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।