রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সমরাস্ত্র কেনাকাটায় ধীরগতি

রাশিয়া অসন্তুষ্ট

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় রাশিয়া। নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য তাদের কাছ থেকে নেওয়া ৫০ কোটি ডলার ব্যবহারের বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া নিয়ে দেশটির অসন্তোষ রয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে ১০০ কোটি ডলারের রাষ্ট্রীয় ঋণে সমরাস্ত্র কেনাকাটার প্রক্রিয়ায়ও অগ্রগতি নেই। এমন এক পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে মস্কো তা ফিরিয়ে দিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মকর্তারা জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে দর-কষাকষি করেনি বাংলাদেশ। নির্মাণকাজে কী পরিমাণ অর্থ লাগবে, এ নিয়ে আলোচনা না করায় রাশিয়ার দেওয়া শর্ত মেনে নিতে হবে। এর ফলে আর্থিকভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজে রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোন খাতে কী পরিমাণ অর্থ খরচ করা হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে জানায়নি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

রাশিয়ার অসন্তোষ: কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভ্লাদিমির পুতিনকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে গত আগস্টে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আলেক্সান্ডার মানতিৎস্কির সঙ্গে আলোচনা করেন মস্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইফুল হক। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার নিকোলায়েভের মনোভাবের বিষয়টি রাষ্ট্রদূতকে জানান মানতিৎস্কি।

নিকোলায়েভকে উদ্ধৃত করে বৈঠকে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, দুই দেশের নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০০ কোটি ডলারের কম, যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তাই এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে শীর্ষ নেতৃত্বের সফর আয়োজন অনুকূল নয়। এ ছাড়া মস্কোতে সমরাস্ত্র কেনাকাটার বিষয়ে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হওয়ার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে অগ্রগতি খুবই মন্থর। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নেওয়া ৫০ কোটি ডলার ঋণের বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ার গতিও সন্তোষজনক নয়। ঢাকায় পরমাণু তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের কাজও সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে না। তা ছাড়া গত জানুয়ারিতে মস্কো সফরের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এক্সপো ২০২০ আয়োজক দেশ হিসেবে রাশিয়াকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এখনো রাশিয়া আনুষ্ঠানিক সমর্থন পায়নি।

প্রশ্নবিদ্ধ ৫০ কোটি ডলার ঋণ: ইআরডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়েছে, প্রস্তুতিমূলক কাজে এ অর্থ খরচ করা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়ার ঋণে ৬৩টি সমীক্ষা করা হবে। এসব সমীক্ষা পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে রাশিয়ার পারমাণবিক সংস্থার (রোসাটমের) সঙ্গে একটি চুক্তি সই হয়েছে।

তবে রাশিয়ার কাছ থেকে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোন খাতে কত বরাদ্দ হবে, সেটি চুক্তি সইয়ের আগে চূড়ান্ত করা হয়নি। আর শুরু থেকেই প্রস্তুতিমূলক কাজের কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে, সেটি স্পষ্ট করতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক কাজের জন্য ৫০ কোটি ডলারের যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, দর-কষাকষির মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা হচ্ছে। কাজেই এ কাজে শেষ পর্যন্ত এত অর্থ লাগবে না।

ইয়াফেস ওসমান ১১ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে তাঁর দপ্তরে এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এ ধরনের বৃহদায়তনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাই অভিজ্ঞতা না থাকায় চুক্তি সইয়ের আগে পুরো অর্থায়নের বিষয়টি ঠিক করা যায়নি। পুরো নির্মাণে রাশিয়া ৯০ শতাংশ আর বাংলাদেশ দেবে ১০ শতাংশ অর্থ। বাংলাদেশের টাকাটা অগ্রিম হিসাবে দিতে হবে। আর সমীক্ষার পর জানা যাবে মোট কত টাকা লাগবে। এ ব্যাপারে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সরকারের পক্ষে রাশিয়ার সঙ্গে দর-কষাকষি করবে। পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের (আইএইএ) সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া প্রতিটি স্তরেই স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কাজেই আর্থিক বিষয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই।

প্রকল্পের মোট খরচ অজানা: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ বছরের ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মস্কো সফরের সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল সমঝোতা স্মারকটি সই হয়। তবে স্মারকে বলা হয়েছে, মোট অর্থায়নের পরিমাণ থাকবে সম্ভাব্য। সামগ্রিকভাবে সমঝোতা স্মারকটি বাধ্যবাধকতামূলক নয়।

প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে কোনো কাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন ইআরডি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা। এ প্রসঙ্গে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত বছরের ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর উপস্থিতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব আবদুর রব হাওলাদার বলেছিলেন, ৪৫০ থেকে ৬০০ কোটি ডলার লাগবে। তৌফিক-ই-ইলাহী তখন প্রশ্ন করেন, কিসের ভিত্তিতে সচিব টাকার পরিমাণটি বের করলেন। তাঁর উত্তর ছিল, ইন্টারনেটের তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক হিসাব। উপদেষ্টা তখন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হিসাব করে মোট খরচ নির্ধারণের পরামর্শ দেন।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, মোট অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে দর-কষাকষি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাশিয়া বাংলাদেশের ওপর চেপে বসবে। বিষয়টি নিয়ে আগেই সুরাহা না হওয়ায় রাশিয়া যা বলবে, সেটাই মেনে নিতে হবে বাংলাদেশকে।