পিলখানা হত্যাকাণ্ড: খালাসপ্রাপ্তরা অন্য মামলায় অভিযুক্ত, মুক্তি পাচ্ছেন না

রায়ের অনুলিপি পেতে বিড়ম্বনা

পিলখানা হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া ২৭৭ জনের কেউই মুক্তি পাচ্ছেন না। কারণ, এঁরা সবাই একই ঘটনায় করা বিস্ফোরক মামলায় বিচারাধীন আসামি। এ মামলাটি একই আদালতে সাক্ষ্য পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া এঁদের তিনজন ছাড়া বাকি সবাই বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।
এদিকে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার পরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ জন ২৪ ঘণ্টা পরও রায়ের অনুলিপি হাতে পাননি। আসামি ও তাঁদের স্বজনেরা এ জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী অভিযোগ করেন, ঘোষিত রায়ে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। এগুলো সংশোধন না হওয়ায় তাঁরা রায়ের অনুলিপি পাননি।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন বলেন, আদালত রায়ের মূল অংশ উপস্থাপন করেছেন। এখন পূর্ণাঙ্গ রায় তৈরি করছেন। এ জন্য একটু সময় লাগছে। তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষও রায়ের অনুলিপি এখনো পাননি। জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, এত বড় মামলায় যদি পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটি থাকে, তাহলে সেটা সন্দেহে ফেলে দেবে। এই ত্রুটির কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি কোনো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে উচ্চ আদালতে গেলে তিনি এর প্রতিকার পাবেন। এতে দেখা যাবে, অনেক আসামি ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এত বড় মামলার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রত্যাশিত ছিল।

মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান গত মঙ্গলবার পিলখানা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৮৪৬ জন আসামির মধ্যে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা এবং ২৭৭ জনকে বেকসুর খালাস দেন। আদালত সূত্র জানায়, খালাস পাওয়া আসামিরা একটি বিস্ফোরক মামলায় অভিযুক্ত। এই মামলাটি হয়েছিল পিলখানা হত্যা মামলার তদন্তের সময়। হত্যা মামলার বিচার গতকাল শেষ হলেও বিস্ফোরক মামলাটি এখনো বিচার পর্যায়ে আছে। এখন পর্যন্ত এ মামলায় ১৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এ মামলার কার্যক্রম স্থগিত করার জন্য তাঁরা আদালতে আবেদন করবেন। কারণ, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী একই ঘটনায় দুটি মামলা থাকতে পারে না। আসামিদের একাধিক আইনজীবী অভিযোগ করেন, রায় ঘোষণার পর অনেক আসামিই জানতে পারেননি, কোন ধারায় কী ধরনের সাজা হয়েছে। রায় ঘোষণার পরও ২৪ জন আসামি কাঠগড়ায় বসে ছিলেন। রায়ে কী বলা হয়েছে, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। পরে দ্বিতীয় দফায় বিচারক এজলাসে উঠে আবার তাঁদের রায় পড়ে শোনান। একজন আসামিকে প্রথমে সাজাপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করা হলেও পরে বলা হয়, তিনি খালাস পেয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী জানান, রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষকেও কোনো অনুলিপি দেওয়া হয়নি। ফলে কোন আসামির কী সাজা হয়েছে, তা-ও তাঁরা জানেন না। এ কারণে তাঁরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। তাঁরা বলেন, তড়িঘড়ি করে রায় প্রকাশ করার কারণে এ ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে গতকাল বুধবার সাজা ও খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের নাম-সংখ্যা গণমাধ্যমে দেওয়া হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭১ ধারা অনুযায়ী, রায় ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি দিতে হবে। কারণ, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে সাত দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। আর বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল করতে হবে ৬০ দিনের মধ্যে। তিনি বলেন, রায় ঘোষণার পরপরই তাঁরা আদালতের কাছে অনুলিপির জন্য আবেদন করেন। গতকাল অনুলিপি দেওয়ার কথা থাকলেও আদালত তা দিতে পারেননি।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩২ আসামির আইনজীবী ফারুক আহম্মদ বলেন, আজ বৃহস্পতিবারও তিনি অনুলিপি পাবেন কি না, জানেন না। কারণ, তিন হাজার ৬০০ পৃষ্ঠার রায় সংশোধন করতে অনেক সময় লাগার কথা। এরপর দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি। অনুলিপি পাওয়ার পর তা পড়ে উচ্চ আদালতের জন্য কাগজপত্র তৈরি করতেও সময় লাগে। এখন সাত দিনের মধ্যে আপিল করতে না পারলে পৃথক আবেদনের মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। আদালত সে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলে আপিলের অনুমতি দেবেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন বলেন, তিনিও রায়ের অনুলিপির জন্য অপেক্ষা করছেন। অনুলিপি পাওয়ার পরই খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।