১৭ লাখ টাকা লুট, ৬ আরএনবি ও ৪ পুলিশবরখাস্ত

রেলের টিকিট ঘরে খুন

রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের সুরক্ষিত টিকিট বিক্রির কাউন্টারের ভেতরে ইসরাফিল হোসেন (৬০) নামের এক কর্মচারী খুন হয়েছেন। গতকাল শনিবার সকালে পুলিশ তাঁর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, খুন করার পর টিকিট বিক্রির প্রায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। কমলাপুর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের (ঘর) ভেতরে এভাবে খুন ও টাকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম বলে রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে কমলাপুর স্টেশনে দিনরাত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে র‌্যাব, পুলিশ ও রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ায় এখন প্রায় সারা রাতই টিকিট কাটতে লোকজনের ভিড় থাকে স্টেশন চত্বরে। এর মধ্যে অত্যন্ত সুরক্ষিত কক্ষে খুন করে ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে বিস্ময়কর বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
নিহত ইসরাফিল রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের বুকিং সহকারী। টিকিট বিক্রি বাবদ অর্জিত টাকা হিসাব-নিকাশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জমা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ইসরাফিল ২০১১ সালে রেলওয়ে থেকে অবসরে চলে যান। পরে তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১০০ বুকিং ক্লার্ক, স্টেশনমাস্টার ও রেলওয়ে গার্ড রয়েছেন। প্রয়োজনীয় নিয়োগ না হওয়ায় চাকরি শেষ হওয়ার পরও এসব কর্মীকে চুক্তি ভিত্তিতে রেখে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর রেলওয়ে স্টেশনে ছুটে যান রেলমন্ত্রী মজিবুল হক। ঘটনার তদন্তে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, রেল মন্ত্রণালয় ও পুলিশ পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কর্তব্যের অবহেলার অভিযোগে ছয়জন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য ও চার পুলিশকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র ও কমলাপুর রেলওয়ে থানার পুলিশ জানায়, গত শুক্রবার রাত ১০টা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ইসরাফিলের রাত্রিকালীন দায়িত্ব ছিল। টিকিট বিক্রির কাউন্টারের ভেতরের হিসাবকক্ষে (ক্যাশ রুম) সারা দিনের বিক্রির টাকা হিসাব করে তা পাহারা দেওয়া ছিল তাঁর কাজ।

গতকাল সকাল সাড়ে ছয়টার টিকিট বিক্রির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা এসে কলাপসিবল ফটকগুলো তালাবদ্ধ দেখেন। অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে তাঁকে ফোন করা হয়। কিন্তু ইসরাফিলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এতে সন্দেহ হওয়ায় কর্মচারীরা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ইসরাফিলের হাত-পা বাঁধা লাশ উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ইসরাফিলের নাক, কান ও গলা—পুরোটাই টেপ দিয়ে পেঁচানো ছিল। গলায় ছিল গামছা পেঁচানো। পিছমোড়া করে হাত-পা নাইলনের রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। ওই অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন ইসরাফিল। ধারণা করা হচ্ছে, রাত ১০ থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে যেকোনো সময় তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে ওই কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষটির ভেতরে দুজনের ব্যবহারের চেয়ার-টেবিল। পেছনে কয়েকটি আলমারি। চেয়ার-টেবিল ও আলমারির মাঝ বরাবর জায়গায় মেঝেতে ছিল লাশটি। কক্ষটির ভেতরে আয়নাবেষ্টিত একটি কাউন্টার। পূর্ব দিকের চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করতেন ইসরাফিল। পাশে একটি ছোট সিন্দুক।

ইসরাফিলের সহকর্মী শাহীনুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ২০টি কাউন্টারে টিকিট বিক্রির আয় হিসাব-নিকাশ করে সকালে প্রধান বুকিং সহকারীর কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। টাকা হিসাব করতে রাত চারটা-সাড়ে চারটা পর্যন্ত লেগে যায়।

রেলের টিকিট বিক্রির কাউন্টারগুলোর ভেতরে একাধিক কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষে প্রবেশের পথ একটিই। প্রথমে একটি কাঠের দরজা। এরপর প্রধান বুকিং সহকারীর কক্ষ। এটি কলাপসিবল গেট দিয়ে আলাদা করা। এরপর আরেকটি কলাপসিবল গেট পেরিয়ে ইসরাফিল যে কক্ষে খুন হন সে কক্ষে যেতে হয়। দ্বিতীয় গেট এবং কাঠের দরজার চাবি ইসরাফিলের কাছে ছিল। সব কটি গেটের তালাই অক্ষত ছিল এবং তা বাইরে থেকে লাগানো ছিল। পুলিশ সেই তালা ভেঙে লাশ উদ্ধার করে।

 ইসরাফিল হোসেনরেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রধান বুকিং সহকারীর কক্ষের বড় সিন্দুকে গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টিকিট বিক্রির প্রায় ৬০ লাখ টাকা ছিল। এই কক্ষ ও সিন্দুকের চাবি প্রধান বুকিং সহকারী কাছে ছিল। রেলের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, খুনি ইসরাফিলের পরিচিত কিংবা আগে থেকেই ওই কক্ষে লুকিয়ে ছিল। টিকিট বিক্রি ও ক্যাশ মিলানোর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা রাত সাড়ে ১২টার দিকে চলে যান। এরপর ইসরাফিলের একাই সেখানে থাকার কথা।
রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সরদার সাহাদত আলী বলেন, রাতের দায়িত্বে থাকা বুকিং সহকারীই ওই কক্ষসহ বিভিন্ন কলাপসিবল ফটকে নির্ধারিত তালা লাগাবেন।
জানতে চাইলে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সহকারী কমান্ড্যান্ট নজমুল নেওয়াজ বলেন, সিন্দুকে বেশি টাকা থাকলে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাওয়া অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ওই কক্ষের সামনে সশস্ত্র অবস্থান নেন। কিন্তু শুক্রবার এ ধরনের কোনো নির্দেশনা না থাকায় সেখানে কারও দায়িত্ব ছিল না।
গতকাল দুপুরে নিহত ব্যক্তির মেয়ে মোছাম্মৎ তানিয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে এসে লাশ শনাক্ত করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তানিয়া সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর বাবা তাঁর গুলশানের বাসায় থাকতেন। অফিসের জন্য শুক্রবার রাত আটটার দিকে বের হন তিনি। তাঁদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে।
ময়নাতদন্ত শেষে পরিবার লাশ গ্রহণ করে। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কমলাপুর স্টেশনে ইসরাফিলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জাহিদুল ইসলাম বলেন, গতকাল বিকেলে স্টেশন মাস্টার সাখাওয়াত হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে প্রায় ১৭ লাখ টাকা লুট করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।