রোহিঙ্গা বাড়ছে উদ্বিগ্ন সরকার

মাসুদ করিম
রোহিঙ্গাদের সংখ্যা হঠাৎ অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সরকারের অভ্যন্তরে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় টেকনাফ ও তার আশপাশের কোনো কোনো এলাকায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা স্থানীয় বাসিন্দাদের সমান হয়ে গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুপ্রবেশ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি, রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়া, অবৈধভাবে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমানো, অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয়ভাবে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর কাজে জড়িয়ে পড়ায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংকট কাটছে না। শরণার্থী শিবিরের বাইরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে
তাদের
সংখ্যা নিরূপণ, সীমান্তে টহল বাড়াতে ৫৩ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, সীমান্তে টহল জোরদারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সমুদ্রে টহল বাড়াতে কোস্টগার্ডকে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম প্রদান এবং রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বিদেশি এনজিওর পরিবর্তে দেশীয় এনজিও নিযুক্তির জরুরি পদক্ষেপে অর্থায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড় না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদেশি বিভিন্ন এনজিও মানবিক সাহায্যের নামে নানা রকম কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তার মধ্যে কোনো কোনো কর্মকাণ্ড জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ পরিস্থিতিতে নিজস্ব অর্থায়নে দেশীয় এনজিও নিযুক্ত করা জরুরি।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, টেকনাফ ও উখিয়ায় দুটি শরণার্থী শিবিরে ২৮ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকলেও শিবিরের বাইরে লাখ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে অবস্থান করছে। তাদের সংখ্যা দুই থেকে পাঁচ লাখ বলে সরকারের পক্ষে বলা হলেও তা সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শরণার্থী ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন করতে আহ্বান জানালেও সরকার তাদের নিবন্ধন করতে অস্বীকার করেছে। নিবন্ধন করা হলে তাদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়ার জন্য বিদেশি চাপ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো নিবন্ধন না করে নিরাপত্তার প্রয়োজনে গণনা করে এই রোহিঙ্গাদের সংখ্যা জানা প্রয়োজন। এ জরিপ পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অর্থায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু সমকালকে বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যা অনেক বেশি। এখানে রোহিঙ্গাদের জায়গা ও খাদ্য দেওয়া সম্ভব নয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকবে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে টহল জোরদার করতে ৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণে জরুরি অর্থায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতি সুপারিশ করা হয়। এতে করে নাফ নদী পেরিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও রোহিঙ্গারা আবার ফিরে গিয়ে সমুদ্রপথে শাহপরীর দ্বীপ হয়ে অনুপ্রবেশ করে। এ ক্ষেত্রে কোস্টগার্ডকে আরও সরঞ্জাম দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সুপারিশে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গারা কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ করে না। বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শরণার্থী শিবিরের মধ্যে অবস্থানের কারণে বেশি রেশন পেয়ে থাকে। ফলে জন্মহার বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সম্পর্কে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘টহল বাড়িয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের প্রকল্পটি প্রক্রিয়াধীন। সীমান্তে বিওপি (বর্ডার আউটপোস্ট) বাড়ানোর প্রয়োজন হলেও ওই অঞ্চলে জায়গা পেতে সমস্যা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত অনেক জটিলতা রয়েছে।’
বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, ‘রোহিঙ্গারা অনেকে সমুদ্রপথে শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে অনুপ্রবেশ করে। সেখানে কোস্টগার্ডের সামর্থ্য বাড়াতে কিছু দ্রুতগামী বোট দেওয়া হয়েছে। আরও দেওয়া হলে তাদের কর্মক্ষমতা অনেক বাড়বে।’
এদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জরুরি পদক্ষেপের বিষয়ে খুব শিগগির আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হবে। সেখানে অর্থায়নের বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হবে। অর্থায়ন ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়।