রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

লংমার্চ রামপালে ঢুকতে দেবে না প্রশাসন

ঢাকা-রামপাল লংমার্চের বিশাল বহর তৃতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ফরিদপুর থেকে রওনা হয়ে মধুখালী, মাগুরা, ঝিনাইদহ হয়ে সন্ধ্যায় যশোরে পৌঁছেছে। বহরটি আজ সেখান থেকে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করবে। পরদিন শনিবার শুরু হবে বাগেরহাটের রামপাল অভিমুখে যাত্রা।
এদিকে লংমার্চকে রামপাল উপজেলার সীমানা অতিক্রম করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তারা মংলার দ্বিগরাজ বাজারে নির্ধারিত জনসভাও করতে দেবে না। গতকাল সন্ধ্যায় প্রশাসনের এমন ঘোষণার পর আন্দোলনকারীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
ফরিদপুর থেকে গতকাল যশোর যাওয়ার পথে লংমার্চকারীরা মধুখালী ও মাগুরায় পথসভা এবং ঝিনাইদহের আরাপপুর বাসস্ট্যান্ড মোড় ও যশোরের টাউন হল ময়দানে প্রচার সমাবেশ করে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বন্ধের দাবিতে চলমান লংমার্চ কর্মসূচির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী আগামী ২২ অক্টোবর এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা দেওয়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলেছেন, যেকোনো মূল্যে সরকারের এ উদ্যোগ প্রতিহত করা হবে। আগামীকাল শনিবার বাগেরহাটের দ্বিগরাজে জাতীয় কমিটির অনুষ্ঠেয় সমাবেশস্থলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পাল্টা সমাবেশ আহ্বানের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, চলমান লংমার্চ হচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি ধাপ। পুলিশ, বিজিবি দিয়ে বা পাল্টা সমাবেশের চক্রান্ত করে এই লংমার্চকে ঠেকানো যাবে না। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণাও কেউ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, লংমার্চ হচ্ছে জনগণের আন্দোলনের শক্তি। সরকার আন্দোলনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হলে জনগণের শক্তিই তাদের সে ভাষা বুঝিয়ে দেবে। জনগণের শক্তি রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিহত করবে।
জাতীয় কমিটির অন্যতম সংগঠক প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশ ধ্বংস করবে না বলে সরকার যে কথা প্রচার করছে তা ডাহা মিথ্যা। খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা এই প্রকল্প সুন্দরবন বিধ্বংসী বলে মত দিয়েছেন। সরকারের উচিত হবে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মত মেনে অবিলম্বে এই প্রকল্প বাতিল করা।
ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য বিমল বিশ্বাস বলেন, কোনো বিদেশি শক্তির ইঙ্গিতে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা সরকারকে বামপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি উপদেষ্টার ঘোষণা আবারও প্রমাণ করেছে যে মেয়াদের শেষ সময়ে জনগণের চেয়ে দেশি-বিদেশি লুটেরা গোষ্ঠী সরকারের কাছে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশ ও গণবিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়ে কোনো সরকারই টিকতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার ঢাকা থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের লংমার্চের বহরে ২২টি বড় বাস যুক্ত হয়েছে। বহরটি আজ শুক্রবার ফুলতলা, দৌলতপুর, খালিশপুর হয়ে জনসভা করবে খুলনায়।
প্রস্তুত খুলনা : লংমার্চকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত খুলনা। কর্মসূচি সফল করতে জেলা তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। জাতীয় কমিটির খুলনা জেলা সদস্যসচিব দেলোয়ার উদ্দিন দিলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু সুন্দরবন বা খুলনার ক্ষতি করবে না; সারা পৃথিবীতেই এর প্রভাব পড়বে। বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বিনষ্টের পাশাপাশি মানুষের রোগবালাই ও সামাজিক জীবনযাত্রায়ও প্রভাব পড়বে। অথচ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার যেকোনো মূল্যে এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। তারা আমাদের আন্দোলন নস্যাতের জন্য রামপালের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি দিচ্ছে।’
আয়োজকরা জানান, আজ সকাল ১১টার দিকে লংমার্চ ফুলতলায় এসে পৌঁছবে। সেখানে সমাবেশ শেষে ফুলবাড়ি গেট হয়ে দুপুরে দৌলতপুরে খাওয়ার বিরতি দেওয়া হবে। দুপুর আড়াইটায় একই স্থানে জনসভা, প্লাটিনাম গেট, জোড়াগেট, নিউমার্কেট, শিববাড়ি মোড়ে পথসভা শেষে বিকেল ৫টায় শহীদ হাদিস পার্কে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। পরদিন শনিবার সকালে খুলনা থেকে বাগেরহাটের রামপালের উদ্দেশে লংমার্চের যাত্রা শুরু হবে। রামপালে সমাবেশ ও দ্বিগরাজ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি টানার কথা।
জেলা প্রশাসনের বৈঠক : গতকাল বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রশাসনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মু. শুকুর আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য বেগম হাবিবুন নাহার তালুকদার, পুলিশ সুপার নিজামুল হক মোল্যা, রামপাল, মংলা ও ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং এসব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা।
বৈঠক শেষে জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, লংমার্চে আগতদের বুঝিয়ে রামপাল উপজেলার সীমানার মধ্যে রাখা হবে। কোনো অবস্থায়ই তাদের মংলা-খুলনা মহাসড়কে রামপাল উপজেলার গোনাইব্রিজ অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না, এমনকি তারা মংলা উপজেলার দ্বিগরাজ বাজারে যে জনসভা আহ্বান করেছে তারও অনুমতি দেওয়া হবে না। সরকারি দলের পক্ষ থেকে যাতে রামপাল এলাকায় কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ আহ্বান না করা হয় সে জন্য তাদেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব ধরনের দুর্ঘটনা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে রামপাল পর্যন্ত যাতে শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ সম্পন্ন হয় সে জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
এদিকে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বাগেরহাট জেলা শাখার সদস্যসচিব ফররুখ হাসান জুয়েল ঘোষণা করেন, সব বাধা উপেক্ষা করে লংমার্চ শনিবার বিকেলে মংলা উপজেলার দ্বিগরাজে পৌঁছবে এবং সেখানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
গবেষকের দৃষ্টিতে ভয়াবহতার চিত্র : রামপালে সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে ১৫ বছরের মধ্যে সুন্দরবনের ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংস হয়ে যাবে। পরিবেশের চরম বিপর্যয় ঘটবে ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে মৎস্য ও কৃষির। এমনকি সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষভাবে জড়িত পাঁচ লাখ মানুষ তাদের জীবিকা হারাবে। উদ্বাস্তু হবে কয়েক হাজার মানুষ। সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও গবেষক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম গতকাল বিকেলে বাগেরহাটে কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন।
ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, এক কোটি পাঁচ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব মাত্র সাড়ে ৯ কিলোমিটার। এই বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলে বছরে এখান থেকে প্রায় এক কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হবে। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ৪২৫ মিলিয়ন গাছ কাটার সমপরিমাণ ক্ষতি হবে। সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে ৫২ হাজার টন। এর প্রভাবে এখানে এসিড-বৃষ্টি হবে। এর বিরূপ প্রভাব ছড়াবে মানবদেহ, জলজ প্রাণী, কৃষি ও সুন্দরবনের ওপর। ২৬ হাজার ৯২৮ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড বের হবে, যা ১০ লাখ ৩২ হাজার পুরনো গাড়ি থেকে যে ধরনের বায়ুদূষণ হয় এর সমপরিমাণ ক্ষতি হবে। এক হাজার ৯০০ টন কার্বন মনোক্সাইড বের হবে, যাতে এলাকার মানুষ উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হবে। তিন লাখ ৩০ হাজার টন ছাই বের হবে, যাতে ভয়ংকর মাত্রায় বায়ুদূষণ ঘটবে।
এই গবেষক আরো বলেন, কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলে এখানে প্রতিবছর দুই লাখ ২০ হাজার মিলিয়ন গ্যালন ফ্রেশ পানির দরকার হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ পড়বে, বাড়বে লবণাক্ততা। এখান থেকে বছরে ৫১ লাখ টন তরল কয়লা বর্জ্য নির্গত হবে। লাখ লাখ টন ছাই, তরল কয়লা বর্জ্য, গরম পানি, ধোঁয়া এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ধ্বংস করবে পরিবেশ তথা মানুষ, ঘেরের মাছ, মংলা বন্দর, সুন্দরবনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। লবণাক্ততার কারণে উপকূলের মানুষ ধান, নারিকেল, সুপারিসহ প্রায় সব ধরনের ফলদসম্পদ হারাবে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক (যশোর অফিস) ফখরে আলম, নিজস্ব প্রতিবেদক (খুলনা অফিস) কৌশিক দে, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি এম. সাইফুল মাবুদ ও বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী।