ভুলে ভরা পাঠ্যবই ১

লেখক-সম্পাদকদেরও সম্মান

জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে এ বছর একযোগে মাধ্যমিকের ৭০টি বই নতুনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। কম সময়ের প্রস্তুতিতে নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় এসব বই প্রকাশ করতে গিয়ে অসংগতি ও ভুলত্রুটি রয়ে গেছে প্রচুর।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের সহায়তায় এসব বই পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নবম-দশম শ্রেণীর অর্থনীতি বইয়ে তথ্যবিভ্রাট, পুরোনো তথ্য ব্যবহার, লেখকের নামে গরমিল, সন-তারিখে, বাক্যগঠনে অসংগতিসহ নানা ধরনের ভুল রয়েছে কমপক্ষে ২০৫টি, ইতিহাসে রাজা-বাদশাদের নাম, পদ এবং ঐতিহাসিক স্থান ও ঘটনার সন-তারিখে ভুল আছে অন্তত ৫৫টি। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে ৫২টি, হিন্দুধর্মের বইয়ে ২৪টি একই ধরনের ভুল পাওয়া গেছে। একই শ্রেণীর রসায়ন, গণিত ও উচ্চতর গণিতের প্রতিটি বইয়ে ভুলের সংখ্যা ১০০-এর কাছাকাছি।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ২২টি বই পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব বইয়ে যেসব ত্রুটি ও অসংগতি পাওয়া গেছে, তার উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় আজ এক পাতাজুড়ে (পৃষ্ঠা-১৪) ছাপা হলো। কাল ছাপা হবে আরও এক পাতা।
সাধারণ শিক্ষায় প্রথম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ১৩২। এগুলোর মধ্যে মাধ্যমিকের বই ৯৯টি, প্রাথমিকের ৩৩। সব বইয়ে কমবেশি ভুলত্রুটি রয়েছে। কিন্তু নতুন পাঠ্যক্রমের ৭০টি বইয়ে যে পরিমাণ ভুল রয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন শ্রেণীশিক্ষকেরা।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিটি বইয়ের লেখক ও সম্পাদক হিসেবে ৫ থেকে ১২ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের প্রায় সবাই বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কয়েকজন শিক্ষাবিদও রয়েছেন। প্রতিটি বইয়ে সমন্বয়ক হিসেবে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। সবকিছুর পরও রয়েছে এনসিটিবির সম্পাদনা বিভাগ।
পাঠ্যবইয়ের অসংগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনোযোগের অভাবেই এসব ভুল হয়েছে। এগুলো শুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।
তবে কয়েকজন লেখক ও সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এনসিটিবি তাঁদের নাম ব্যবহার করেছে মাত্র, অনেকের এ জন্য দায়দায়িত্ব সেই অর্থে নেই। তা ছাড়া বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ওই সব ব্যক্তিকে যে সম্মানী দেওয়া হয়, তা-ও খুবই সামান্য।
এ বছর কয়েকজন সম্পাদক এনসিটিবির দেওয়া সম্মানী প্রত্যাখ্যান করেছেন। সম্পাদকদের একজন লিখেছেন, ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলাম।’
এনসিটিবির সূত্রমতে, সম্মানী অস্বাভাবিক কম হওয়ায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ কাজে আগ্রহী হন না। কেউ আগ্রহী হলেও পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। আবার এনসিটিবিও লেখক-সম্পাদকদের ওপর চাপ দিতে পারে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির একটি বইয়ের সম্পাদক জানান, এ বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় পৌনে ৭০০ কোটি টাকার (প্রাথমিকে ২৫৭ কোটি, মাধ্যমিকে ৪১৬ কোটি) বই ছাপা হবে। এসব বই প্রায় ১৭ বছর পর ছাপা হচ্ছে। কিন্তু লেখক সম্মানী ও সম্পাদকদের বিল একবারই দেওয়া হয়েছে। এবার ছাপা হওয়া বইগুলো বছরের পর বছর চলতে থাকবে। কিন্তু সম্মানী একবারই দেওয়া হয়, তা-ও অনেক কম।
এ বছর ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের নেতৃত্বে সাতজন লেখক ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইটি সম্পাদনা করেন। শিক্ষাসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর অনুরোধে মুনতাসীর মামুন এ কাজ করেন। বই তিনটি সম্পাদনা করতে গিয়ে তাঁরা দেখেন, শুধু সম্পাদনা করেই এগুলো পাঠোপযোগী করা যাবে না। এগুলো নতুন করে লিখতে হবে। তা ছাড়া প্রায় দেড় শ পৃষ্ঠার একেকটি পাণ্ডুলিপি তাঁরা শিক্ষার্থীর বয়স বিবেচনা করে অর্ধেকে নামিয়ে আনেন। এ প্রসঙ্গে সম্পাদকেরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য উল্লেখ করে শিশুদের ওপর বইয়ের বোঝা কমানোর পক্ষে অবস্থান নেন।
সম্পাদনা দলের একজন সদস্য জানান, তাঁরা সাতজন এক মাসের মধ্যে বইগুলো আবার লিখে ও সম্পাদনা করে এনসিটিবিতে জমা দেন। এরপর ছয় মাসের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা এনসিটিবি কেউই লেখক-সম্পাদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। বইটি কেমন হয়েছে, তা দেখার জন্য শিক্ষাসচিবের কাছে কপি চান মুনতাসীর মামুন। এরপর একটি একটি করে তিনটি বই তাঁর কাছে পাঠানো হয়।
মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে জানান, বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার প্রায় বছর খানেক পর এনসিটিবি থেকে একজন কর্মকর্তা তাঁকে ফোন করে লেখক সম্মানীর চেক নিতে বললেন। তিনটি বইয়ের সম্পাদক হিসেবে তাঁকে ১২ হাজার টাকার চেক নিতে বলা হয়। তিনি সেই চেক গ্রহণ করেননি। সাতজন মিলে তাঁরা খুব কম সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চার অধ্যাপক শফিউল আলম, মাহবুব সাদিক, মোরশেদ শফিউল হাসান ও সৈয়দ আজিজুল হক। অন্য দুজন হলেন সাংবাদিক আবুল মোমেন ও কলেজশিক্ষক সৈয়দ মাহফুজ আলী।
মুনতাসীর মামুন বলেন, সম্মানীর নামে তাঁদের অসম্মানিত করা হয়েছে। যদি এমন হতো যে এনসিটিবির টাকা নেই, প্রতিষ্ঠানটি টাকা খরচ করে না, তাহলে তাঁরা বিনা সম্মানীতে কাজটি করে দিতেন। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান বছরে ৬০০-৭০০ কোটি টাকার কাজ করে, যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পাজেরোতে চড়েন এবং তিনবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান, সেখানে কাজ করতে গিয়ে বিশিষ্ট নাগরিকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই অযোগ্য এবং বছরের পর বছর এনসিটিবি ‘ডাম্পিং প্লেস’ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
এনসিটিবির হিসাব বিভাগ সূত্র জানায়, মাধ্যমিকের একটি বই সম্পাদনা খরচ ৩০ হাজার টাকা। সম্পাদনার দায়িত্বে যাঁরা থাকেন, তাঁদের মধ্যে এই টাকা ভাগ করে দেওয়া হয়। মুনতাসীর মামুনের নেতৃত্বে সাত সম্পাদককেও একটি বইয়ের জন্য এই ৩০ হাজার টাকা ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।
সেই একই বিল!: নব্বইয়ের দশক থেকে এই বিল নির্দিষ্ট হয়ে আছে। একজন শিক্ষক বা লেখক তিন বা চার হাজার টাকা বিলের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় থেকে কয়েক দফায় ঢাকায় আসেন। তাঁদের আসা-যাওয়ার খরচও এই বিলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
এ বছর উচ্চমাধ্যমিকের বই করতে গিয়ে একই সমস্যায় পড়েন এনসিটিবির কর্মকর্তারা। দেখা যায়, একেকটি বই মূল্যায়ন বিল বাবদ রয়েছে ২০ হাজার টাকা। তিন শিক্ষক একেকটি বই মূল্যায়ন করেন, তাঁদের একেকজন পাবেন ছয় হাজার টাকা। এনসিটিবির সম্পাদনা শাখা ২০ হাজার টাকার বিল ৩০ হাজার করার প্রস্তাব করে। কিন্তু দেখা যায়, ১৯৯১ সালে মন্ত্রণালয় ২০ হাজার টাকা অনুমোদন করেছিল। তখনই অনুমোদনের সময় বলা হয়েছিল, এই বিল বাজার উপযোগী নয়। অথচ ২০১৩ সালেও সেই একই বিল দেওয়া হচ্ছে।
সব লেখায় লেখকের নাম নেই: পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে ২৩টি রচনা স্থান পেয়েছে। ১২টি রচনার সঙ্গে লেখকের নাম যুক্ত আছে। বাকি ১১টিতে রচয়িতার নাম নেই। প্রশ্ন উঠেছে, ওই ১১টি রচনা কেউ না কেউ লিখেছেন, তাঁদের নাম থাকবে না কেন? অন্যান্য বইতেও সব লেখায় লেখকের নাম নেই।
এ প্রসঙ্গে এনসিটিবি বলছে, একই লেখক একাধিক লেখা দিলে অথবা কোনো বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য একত্র করে লেখা তৈরি করা হলে লেখকের নাম দেওয়া হয় না।
পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে একটি লেখার শিরোনাম ‘আমাদের মৃৎশিল্প’। পাঁচ বছর ধরে লেখক শফিউল আলমের নামে লেখাটি ছাপা হচ্ছে। শিক্ষক নির্দেশিকায়ও তাঁর নাম ছিল। কিন্তু এ বছরের বইয়ে লেখকের নামটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে প্রবীণ অধ্যাপক শফিউল আলম প্রথম আলোকে জানান, বিষয়টি দুঃখজনক। এক ধরনের ক্ষোভ ও বিস্ময় থেকে তিনি কারও কাছে এর কারণ জানতে চাননি।