শালবন কেটে সাফারি পার্ক!

প্রকল্প পরিকল্পনায় বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা থাকলেও প্রাকৃতিক বন কেটে গাজীপুরের শ্রীপুরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’। এ সাফারি পার্ক নির্মাণের অংশ হিসেবে রাস্তাঘাট, অফিস, রেস্টহাউসসহ নানা স্থাপনা বানাতে প্রতিনিয়ত কেটে ফেলা হচ্ছে সংরক্ষিত শালবন। এ জন্য কোনো দরপত্রও আহ্বান করা হয়নি। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্য প্রাণী বিচরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেও কাটা হচ্ছে বন। আবার হেলিপ্যাড নির্মাণের জন্য কেটে ফেলা হয়েছে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রায় তিন একর জমির গাছ।
এদিকে নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করায় সাফারি পার্কের রাস্তাঘাট নির্মাণের বছর দেড়েকের মধ্যেই ভেঙেচুরে বেরিয়ে আসছে মাটি। কয়েকটি বন্য প্রাণী বন্দি করে রাখা হয়েছে চিড়িয়াখানার আদলে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বহাল রেখেই সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে তড়িঘড়ি করে চেষ্টা চলছে সাফারি পার্কটি চালু করার। আগামী মাসে এটি উদ্বোধন করার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম দিকে শ্রীপুরের বাঘের বাজার এলাকা দিয়ে সাফারি পার্কটিতে প্রবেশের প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সড়কটি নির্মাণের দুই বছরের মধ্যে ভেঙেচুরে একাকার। ঝুঁকি নিয়েই এ পথে চলছে নানা ধরনের যানবাহন। প্রকল্প এলাকার ফটকের পশ্চিম অংশে দেবে যাওয়া পিচঢালা পথটি এখন খুঁড়ে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্পের ভেতরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের রাস্তাঘাটও ভেঙেচুরে বসে গেছে। কোথাও কোথাও পিচ ও ইটের খোয়া ভেঙে বেরিয়ে এসেছে মাটির সড়ক। প্রধানমন্ত্রীর আগমন আসন্ন হওয়ায় এখন জোড়াতালি দিয়ে দ্রুত সড়কগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক বন কেটে বানানো হচ্ছে ইকো-রিসোর্ট ভবন : প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পার্কের প্রধান ফটকের পাশে কার পার্কিং এরিয়া গড়ে তুলতে প্রায় এক একর জমির শালবন কেটে ফেলা হয়েছে। পার্কের দক্ষিণাংশে প্রাকৃতিক শালবন কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় দুই হাজার বর্গফুট ইকো-রিসোর্ট ভবন। জিরাফ পরিদর্শন ক্ষেত্র নির্মাণের জন্যও দুই পাশের ঘন শালবন কেটে তৈরি করা হয়েছে পথ। সাফারি পার্কের ধারণার বাইরে বিদেশ থেকে আমদানি করা চারটি জিরাফ রাখা হয়েছে বাঁশের খুঁটি ও জাল দিয়ে ঘেরাও করা ছোট্ট পরিসরে বন্দি অবস্থায়। সেখানে গাছপালা বা সবুজ বনানীর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বন্য প্রাণী চিকিৎসাকেন্দ্রের সামনে প্রায় দুই বিঘা সামাজিক বনায়নের উডলট বাগান কেটে লাগানো হয়েছে ‘বোতল ব্রাশ’ ফুলের চারা। কেটে ফেলা গাছের গোড়াগুলো এখনো জানান দিচ্ছে বাগানের অস্তিত্ব। সেখানেই হেলিপ্যাড নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে বন বিভাগ।
উপড়ে ফেলা হচ্ছে শালগাছের শেকড়সহ গুঁড়ি : পাশের বাঘ বিচরণক্ষেত্রটির পশ্চিম অংশে দেখা যায়, প্রায় তিন বিঘা শালবন কেটে ফেলা হয়েছে আগেই। আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে ঝোপঝাড়। কয়েকজন দিনমজুর কুড়াল চালিয়ে উপড়ে ফেলছেন শালগাছের শেকড়সহ গুঁড়ি। তারা জানান, সেখানে নির্মাণ করা হবে হরিণ বিচরণক্ষেত্র। চুক্তির ভিত্তিতে গাছের গুঁড়িগুলো তাঁরা বিক্রি করে দেন স্থানীয় বিভিন্ন ইটের ভাটায়।
জয়দেবপুরের হোতাপাড়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, দিন পনের আগে তারা শালগাছের গুঁড়ি ও কয়লাসহ একটি পিকআপ ভ্যান আটক করেছিলেন। কিন্তু একজন বন কর্মকর্তার অনুরোধে এসব ‘সরকারি সম্পদ’ তাঁরা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর আগেও তাঁরা গাছের গুঁড়ি ও কয়লার গাড়ি একাধিকবার আটক করলেও বন বিভাগের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
বিভিন্ন প্রাণীর কিম্ভূত প্রতিমূর্তি : এদিকে সাফারি কিংডম ফটকের বাঁ দিকে বাঘ, সিংহ, হাতি, পেঙ্গুইন ও ডাইনোসরের সমান মাপের কিম্ভূত প্রতিমূর্তি লক্ষ করা গেছে। ভিন্ন একটি সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে সাফারি পার্কের প্রধান অংশে বঙ্গবন্ধুর একটি বিকৃত ভাস্কর্য স্থাপন করা হলে কালের কণ্ঠসহ একাধিক গণমাধ্যমে এর সমালোচনা করা হয়। সে সময় এলাকাবাসীও এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তখন বন কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে ভাস্কর্যটি অপসারণ করেন।
প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, সাফারি পার্কের নির্মাণ কাজের অনিয়ম-দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রভাবশালী নানা মহলের দখল প্রক্রিয়ার কবল থেকে ভাওয়াল গড়ের গাজীপুর শালবন রক্ষার জন্য সাফারি পার্কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া এটি প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্য প্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি নাগরিক চিত্তবিনোদনকেন্দ্র হয়ে উঠবে। ইউনুস আলী জানান, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তারা আশা করছেন, সেখান থেকে অনুমোদন হলে আগামী মাসের শুরুতেই এটি প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন।
ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অবনী ভূষণ ঠাকুর সাফারি পার্কের অনিয়ম-দুর্নীতি, তথা বিনা দরপত্রে শালগাছ কাটার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বন সংরক্ষক তপন কুমার দে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হেলিপ্যাড নির্মাণের জন্য নিয়ম মেনে সামাজিক বনায়নের গাছগুলো কাটতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী বাগান মালিকদের গাছের দাম বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য শালবন উজাড় করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো প্রাকৃতিক বন কাটছি না। জমি অধিগ্রহণের পর বনের ফাঁকা জমিতে পার্কের স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।’ বাঘ বিচরণক্ষেত্রের পাশে শ্রমিক দিয়ে শালগাছ কাটার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তপন কুমার বলেন, সেখানকার শালগাছগুলো আগেই চুরি হয়ে গিয়েছিল। এখন সেখানে হরিণ বিচরণক্ষেত্র তৈরি করতে কিছু বনজঙ্গল পরিষ্কার করা হচ্ছে। নইলে গাছের শিকড়-বাকড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হরিণগুলো আহত হতে পারে। আমরা একটি শালগাছও কাটিনি। বেহাল সড়কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শালবনের জমিগুলো জল ও কাদামাটির হওয়ায় বারবার রাস্তাঘাট ভেঙে যাচ্ছে। প্রকল্পের গাড়ি চলাচলের কারণেই কিছু সড়ক দেবে গেছে। আমরা দ্রুত সব মেরামতের চেষ্টা করছি।’
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের ইনচার্জ শিবু প্রসাদ ভট্টাচার্য অবশ্য স্বীকার করে বলেন, জিরাফ বিচরণক্ষেত্রের রাস্তায় পার্কের গাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে কিছু শালগাছ কাটতে হয়েছে। ইকো-রিসোর্ট নির্মাণের জন্যও শালগাছ কাটার প্রয়োজন পড়েছে। এ ছাড়া ভবনটি নির্মাণ সম্ভব ছিল না। গাছ কাটার ক্ষেত্রে নিয়ম অনুসারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের বড় রাথুরা মৌজা ও সদর উপজেলার পিরুজালি ইউনিয়নের পিরুজালি মৌজার বনভূমির তিন হাজার ৬৯০ একর জমি সাফারি পার্কের মাস্টারপ্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত। ২০১০ সালে প্রায় ৬৪ কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় একনেকে। গত ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। একই বছরের ৪ অক্টোবর প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটি বর্ধিত আকারে প্রায় ২২০ কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে একনেকের অনুমোদন পায়। এরই মধ্যে বন বিভাগ পার্কের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ব্যয় করেছে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। বিদেশ থেকে বিভিন্ন বন্য প্রাণী আমদানি ও স্থাপনা নির্মাণে আরো ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
প্রকল্প পরিকল্পনায় শালবনের বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণ, রাজধানীর উপকণ্ঠে ইকো-ট্যুরিজম সৃষ্টি, চিত্তবিনোদন, শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টিসহ নানা কথা বলা হয়েছে। দর্শনীয় স্থাপনার মধ্যে উল্লেখ আছে বাঘ, সিংহ, চিতা, ভল্লুক, হরিণ ও আফ্রিকান বন্য প্রাণীর সাফারি, বার্ড আইল্যান্ড, খাদ্য সংরক্ষণাগার, বন্য প্রাণী চিকিৎসালয়, জিপ ও মিনিবাস সাফারি। অবমুক্ত ও বেষ্টনীতে রাখা হবে এমন ৩২ ধরনের বন্য প্রাণীর কথাও বলা আছে এতে। কোর সাফারি পার্ক পরিকল্পনায় অবমুক্ত অবস্থায় বিভিন্ন বন্য প্রাণী বিচরণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা কেবল নির্দিষ্ট গাড়িতে চড়ে ঘুরে প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্য প্রাণী পরিদর্শন করবেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এক হাজার ২১৭ একর জমির মধ্যে ২০ একর জমিতে বাঘ, ২১ একরে সিংহ, প্রায় আট একরে কালো ভল্লুক, আট একরে আফ্রিকান চিতা, প্রায় ৮১ একরে চিত্রা হরিণ, ৮০ একরে সাম্বার ও গয়াল, ১০৫ একরে হাতি, ৩৫ একরে জলহস্তী, ৩০ একরে মায়া ও প্যারা হরিণ, ২৫ একরে নিলগাই, ১৬৪ একরে পাখি দ্বীপ, ৪০৭ একরে বুনো মোষ এবং আফ্রিকান সাফারির জন্য ২৪০ একর জমি বরাদ্দ থাকবে। প্রথম পর্যায়ে বাঘ, সিংহ, চিতা, ভল্লুক, চিত্রা হরিণ ও আফ্রিকান বন্য প্রাণীর বেষ্টনী নির্মাণ করে সংশ্লিষ্ট বন্য প্রাণী অবমুক্ত করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য কেনা হয়েছে দুটি মিনিবাস ও দুটি জিপ। এ ছাড়া প্রকল্পটিতে বলা হয়ছে, সাফারি কিংডম, বায়ো-ডাইভারসিটি পার্ক, এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি পার্ক, বঙ্গবন্ধু স্কয়ার, ফেন্সি ডাক ও কার্প গার্ডেন, বাঘ ও সিংহ পর্যবেক্ষণ রেঁস্তোরা, হাতিতে ভ্রমণ, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, জলাধার ইত্যাদি নির্মাণের কথা। দেশের প্রথম সাফারি পার্কটি কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারায় স্থাপিত। বর্তমান সরকারের আমলে সেটিরও নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক’।