শুরু হলো থ্রিজি প্রতিযোগিতা

কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই গতকাল রবিবার বহু প্রতীক্ষিত তৃতীয় প্রজন্ম বা থ্রিজি প্রযুক্তির মোবাইল সেবার লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রামের নিলাম হলো। আটটি ব্লকে ২ দশমিক ১ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের মোট ৪০ মেগাহার্টজ থ্রিজি স্পেকট্রাম নিলামের জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও চার হাজার ৮১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে পাঁচটি ব্লকের ২৫ মেগাহার্টজ। অবিক্রীত রয়ে গেছে ১৫ মেগাহার্টজ।
সর্বোচ্চ দুটি ব্লকের ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম কিনে নিয়েছে গ্রামীণফোন। নিলামে অংশগ্রহণকারী অন্য তিন অপারেটর এয়ারটেল, রবি ও বাংলালিংক কিনেছে একটি করে ব্লকের মোট ১৫ মেগাহার্টজ। নিলাম অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে জানানো হয়, অবিক্রীত স্পেকট্রাম বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
নিলামে কেন প্রতিযোগিতা হলো না? থ্রিজির এই স্পেকট্রাম বিক্রি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কি আরো বাড়ানো যেত না? সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার কারণেই কি এমনটা হলো? প্রতিযোগিতাহীন এই নিলামে কি আপনি খুশি? নিলাম শেষে এসব প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে খুশি-অখুশির কোনো বিষয় নেই। এটি বাস্তবতা। সরকার চারটি বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটরকে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নিলামে অংশ নিয়েছে চারটি অপারেটর। এ অবস্থায় প্রতিযোগিতার সুযোগ ছিল না। তবে সরকার নিলামে স্পেকট্রামের যে ভিত্তিমূল্য ধরে দিয়েছিল তা কম ছিল না। এ বিষয়ে সরকারের নীতিগত কোনো ভুল ছিল বলে আমরা মনে করি না।’
সুনীল কান্তি বোস আরো বলেন, ‘মোবাইল অপারেটররা যে দামে থ্রিজির স্পেকট্রাম পেল তাতে এই সেবায় তারা তাদের বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে। এতে ভবিষ্যতে দেশ উপকৃত হবে। এর আগে অনেক চড়া দামে ওয়াইম্যাক্সের স্পেকট্রাম বিক্রি হয়েছে। তাতে আমরা লাভবান হতে পারিনি।’
বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আজ বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। এ খাতে এটাই সবচেয়ে বড় নিলাম। এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের পর বাংলাদেশ পুরোপুরি থ্রিজি সেবার পথে যাত্রা শুরু করল। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক পাইলট প্রকল্প হিসেবে থ্রিজি সেবা চালু করে। টেলিটককে এর জন্য ২ দশমিক ১ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ১০০ মেগাহার্টজ থ্রিজি স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছে। তাদের আজকের নিলামে নির্ধারিত মূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ২১ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারের সমপরিমাণ টাকা দিতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প বাস্তবায়নে থ্রিজি সেবা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এবং এ সেবা শুধু শহরাঞ্চলেই নয়, গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত হবে।
প্রসঙ্গত, দেশের সরকারি-বেসরকারি মোট ছয়টি মোবাইল ফোন অপারেটরের মধ্যে বাদ পড়ছে শুধু দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর সিটিসেল। সিটিসেল থ্রিজি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেও এ বিষয়ে নির্ধারিত আর্নেস্ট মানি বা বায়নার টাকা জমা দেয়নি। বেসরকারি অন্য অপারেটররা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ১৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা করে প্রায় ৬২২ কোটি টাকা আর্নেস্ট মানি হিসেবে জমা দিয়ে নিলামে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে।
থ্রিজি লাইসেন্সের নীতিমালা অনুসারে বেসরকারি পাঁচ মোবাইল ফোন অপারেটরের মধ্যে তিনটি এবং নতুন একটি অপারেটরকে এ লাইসেন্স দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন কোনো অপারেটর আবেদন না করায় বেসরকারি পাঁচ অপারেটরের মধ্যে চারটি লাইসেন্স পাচ্ছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস এর আগে এ বিষয়ে জানান, কোরিয়ার একটি অপারেটর শেষ মুহূর্তে যোগাযোগ করে আবেদনের সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছিল। তবে সময় আর বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
নিলাম অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা হাজির থাকবেন বলে আমন্ত্রণপত্রে জানানো হলেও তাঁরা অনুপস্থিত ছিলেন। তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং এ মন্ত্রণালয়ের সচিব উপস্থিত ছিলেন।
নিলামে প্রাথমিক দর নির্ধারিত ছিল প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের জন্য ২১ মিলিয়ন ডলার। প্রথম পর্যায়ে দুটি ব্লকে ১০ মেগাহার্টজ করে স্পেকট্রামের নিলাম শুরু হয়। প্রাথমিক ওই দরে শুধু গ্রামীণফোন অংশ নেয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি ব্লকের ৫ মেগাহার্টজ করে স্পেকট্রামের নিলামে প্রাথমিক দরে প্রথমে এয়ারটেল, এরপর রবি ও সব শেষে বাংলালিংক অংশ নেয়। নিলাম অনুষ্ঠানে জানানো হয়, যারা ওই স্পেকট্রামের মূল্য টাকায় পরিশোধ করবে তারা আজকের (রবিবারের) প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ৭৭ দশমিক ৭৫ টাকা হিসাবে দেবে। এ হিসাবে নিলামে বিক্রি হওয়া ৩৫ মোগাহার্টজ স্পেকট্রামের দাম দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৮১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
জানা যায়, থ্রিজি লাইসেন্সের জন্য আর্নেস্ট মানি ও স্পেকট্রামের মূল্য পরিশোধ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অপারেটরগুলোর পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে ১৫০ কোটি টাকা করে জমা দিতে হয়েছে। এ লাইসেন্সের জন্য আবেদনপত্র ফি ছিল পাঁচ লাখ টাকা। লাইসেন্স গ্রহণের জন্য ১০ কোটি টাকা করে দিতে হবে। আর বার্ষিক লাইসেন্স ফি দিতে হবে পাঁচ কোটি টাকা। নিলামে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট স্পেকট্রাম ফির ৬০ শতাংশ ৩০ কার্যদিবস এবং ৪০ শতাংশ পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে হবে। ১৫ বছরের জন্য দেওয়া হবে এ লাইসেন্স। পরবর্তী সময়ে লাইসেন্স প্রতি পাঁচ বছরে নবায়নের সুযোগ থাকবে। থ্রিজি সেবায় প্রাপ্ত আয়ের ৫.৫ শতাংশ রাজস্ব বিটিআরসিকে দিতে হবে। সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডে জমা দিতে হবে অপারেটরের নিরীক্ষিত মোট আয়ের ১ শতাংশ।
নীতিমালা অনুসারে প্রথম পর্যায়ে লাইসেন্স প্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে অপারেটরগুলোকে সাতটি বিভাগীয় শহরে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮ মাসের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ জেলায় এ সেবা চালু করতে হবে। আর তৃতীয় পর্যায়ে দেশের সব জেলায় ৩৬ মাস বা তিন বছরের মধ্যে এ সেবা চালু করতে হবে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান এ বিষয়ে বলেন, ‘লাইসেন্স গ্রহণের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা শুরু না করলে প্রতি পর্যায়ের ব্যর্থতার জন্য ৫০ কোটি টাকা করে জরিমানা দিতে হবে। তবে আমার ধারণা, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এ সেবা শুরু হয়ে যাবে। অপারেটরদের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, তারা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষায় না রেখে এখনই টাকা পরিশোধ করে লাইসেন্স নিতে চায়। লাইসেন্স নেওয়ার পরই তারা থ্রিজির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র-সরঞ্জাম আমদানি করতে পারবে। অপারেটররা দ্রুত টাকা পরিশোধ করলে আমরা এক সপ্তাহের মধ্যেই লাইসেন্স দিতে পারব।’ তিনি জানান, আজকের নিলামে থ্রিজি লাইসেন্স ছাড়াও ফোরজি (চতুর্থ প্রজন্ম) এবং এলটিই (লং টার্ম ইভাল্যুশন) সেবারও আগাম অনুমতি পাবে অপারেটররা। তবে ওই সব সেবার জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম পেতে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে তাদের।
অপারেটরগুলোর প্রতিক্রিয়া : ১০ মেগাহার্টজ থ্রিজি স্পেকট্রাম লাভের বিষয়ে গ্রামীণফোনের সিইও বিবেক সুদ বলেন, ‘আমরা থ্রিজি চালু করার জন্য স্পেকট্রাম পেয়ে আনন্দিত। গ্রামীণফোন যত দ্রুত সম্ভব গ্রাহকদের জন্য এই সেবা চালু করবে। থ্রিজি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য রেগুলেটর এবং সরকারের প্রতি রইল আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ। এই দীর্ঘ পথচলায় আমাদের পাশে থাকার জন্য গ্রাহকদেরও ধন্যবাদ।’ গ্রামীণফোন আজ সোমবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
এয়ারটেলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘স্পেকট্রামসহ থ্রিজি লাইসেন্স লাভ করায় এয়ারটেল আনন্দিত। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিলাম পরিচালনা করার জন্য বিটিআরসিকে ধন্যবাদ। এ দেশে বিশ্বমানের থ্রিজি নেটওয়ার্ক চালু করার বিষয়ে এয়ারটেল বদ্ধপরিকর। উন্নতমানের বৈশ্বিক থ্রিজি সেবাসমূহের সাহায্যে গ্রাহকদের সন্তুষ্টি অর্জনই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
রবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা আমাদের গ্রাহকদের থ্রিজি সেবার চাহিদা পুরোপুরি পূরণে সক্ষম হব বলে আশাবাদী। এ সেবা রবি যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে যাচ্ছে। বিটিআরসি আমাদের যত দ্রুত লাইসেন্স হস্তান্তর করতে পারবে আমরা তত দ্রুত এ জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র-সরঞ্জামাদি আমদানি করতে পারব।
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিয়াদ সাতারা বলেন, ‘সত্যিকার অর্থেই আজ বাংলাদেশের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। কারণ থ্রিজি তরঙ্গের লাইসেন্স পাওয়ায় আমরা এখন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত, যাতে আমাদের সম্মানিত গ্রাহকদের তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দিতে পারি। বাংলাদেশের বাজারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রচলন ও ব্যবহারে বাংলালিংক সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। থ্রিজি তরঙ্গের লাইসেন্স পাওয়ায় আমরা এ দেশের গ্রাহকদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি।’