পেশাজীবীদের কনভেনশনে খালেদা

শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব না

কেউ পাশে থাকুক বা না থাকুক নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করেই ছাড়বেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে কোনো ছাড় দেবেন না এবং শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনে
যাবেন না।
বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের জাতীয় কনভেনশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে পেশাজীবী পরিষদ গতকাল রোববার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই কনভেনশনের আয়োজন করে।
বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে খালেদা জিয়াকে তাঁর অবস্থানে অটুট থাকার আহ্বান জানান। পেশাজীবী নেতারা এই আন্দোলনে তাঁর পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেন। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা পাশে থাকুন বা না থাকুন, আমি একলা হলেও দাবি আদায় করে ছাড়ব। আমার অবস্থান থেকে নড়ব না।’
বিরোধীদলীয় নেতা আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে তিনি নির্বাচনে যাবেন না। নির্বাচন হতেও দেবেন না।
নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের দুই দিনের মাথায় খালেদা জিয়া এই ঘোষণা দিলেন। প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের জন্য বিরোধীদলীয় নেতার কাছ থেকে বিরোধীদলীয় সাংসদদের নাম চেয়েছিলেন।
হবে না, হচ্ছে না করেও শেষ পর্যন্ত ১৪টি শর্তে এই সম্মেলন করার অনুমতি পায় সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ। গত শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার পর থেকেই সম্মেলন নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হয়। শনিবার রাতে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেন এই সম্মেলন কমিশনারের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়বে। তাই এটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
শনিবার রাতেই বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রের তিনটি ফটকে দাঙ্গা দমনের উপকরণসহ অন্তত ৩০ জন পুলিশ মোতায়েন করা হয়। গতকাল রোববার সকাল থেকে সম্মেলন কেন্দ্র ঘিরে শুরু হয় পুলিশের তৎপরতা। সম্মেলন কেন্দ্রের আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, জলকামান, সাঁজোয়াযান (এপিসি) জড়ো করা হয়। শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সম্মেলন কেন্দ্রটিতে আসার কয়েকটি পথেও পুলিশের বাড়তি তৎপরতা চোখে পড়ে। কয়েকটি জায়গায় তল্লাশিও করা হচ্ছিল। বেলা ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সাংবাদিকদের জানান, সম্মেলন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ওই অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিল করেছে। বিষয়টি ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যমে আয়োজকদের জানিয়েও দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে আয়োজকেরাও যেকোনো মূল্যে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে সম্মেলন অনুষ্ঠান করার কথা বলে আসছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সব মিলিয়ে সম্মেলন কেন্দ্রকে ঘিরে একটি থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এর মধ্যেই বেলা পৌনে একটার দিকে ডিএমপি সদর দপ্তরের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন ১৪ শর্তে সম্মেলনের অনুমতি দেন। বেলা একটার দিকে সম্মেলনের ফটক খুলে দেওয়া হয়। ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিকেল সোয়া চারটার সময় অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বিএনপিরর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ সময় বলেন, ‘আপনার অধীনে কয়েকটি নির্বাচন দেখেছি। আপনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আপনার অধীনে কোনো নির্বাচনে আমরা অংশ নেব না। আপনার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মানে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করা।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘২০০৭ সালে কে এম হাসানকে মানতে পারেননি। আজ আপনার অধীনে কেন নির্বাচন হবে। আপনার অধীনে নির্বাচন হতে পারে না।’ তিনি সরকারকে সংবিধান সংশোধন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সময় যত যাবে, আওয়ামী লীগ তত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি দিয়ে নির্বাচন করতে চাইছে অভিযোগ করে বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘সেটা ভুল। হতে দেওয়া হবে না। এ দেশে নির্বাচন হবে। নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় সেটি পরিষ্কার। এদের কার্যকলাপই তা বলে দেয়। এখনই তারা সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে, নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ভোটের খবর নেই আর আপনি ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। আপনার নৌকা ফুটো হয়ে গেছে। সেই নৌকায় আর কেউ উঠবে না।’ আদালতের একটি মন্তব্যের কথা জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ‘রংহেডেড’ উল্লেখ করে বলেন, ‘রংহেডেড মানুষের হাতে দেশ পড়লে দেশও রং পথে যাবে।’ খালেদা জিয়া বলেন, যদি নিজেকে জনপ্রিয় মনে করেন তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করুন।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সংসদ অক্ষুণ্ন রেখে নির্বাচন হতে পারে না। সংসদ ভেঙে দেওয়া হতে হবে প্রথম পদক্ষেপ। সংসদ ভেঙে গেলে মন্ত্রীদের অবস্থানও ভিন্ন রকম হয়। তিনি বলেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার ‘ষড়যন্ত্র’ রোধ করতে হবে।
খালেদা জিয়াকে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে অনড় থাকার পরামর্শ দিয়ে কলাম লেখক ফরহাদ মজহার বলেন, ‘বিভ্রান্তি, লোভ ও দলের বিশেষ পক্ষের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে পিছু হটবেন না। পিছু হটলে ১৬ কোটি মানুষকে বঞ্চনা করবেন। মাঠ ছাড়বেন না, পথ ছাড়বেন না।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পিয়াস করিম বলেন, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপি নয়, ১৬ কোটি মানুষের নেত্রী। তিনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সবাইকে রাজপথে নেমে এসে লড়াইয়ে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির নাজির আহমদ বলেন, এ সরকার ইসলাম ফোবিয়া, তত্ত্বাবধায়ক ফোবিয়া, খালেদা জিয়া-তারেক রহমান ফোবিয়া, জামায়াত-শিবির ফোবিয়া ও হেফাজতে ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত। তাদের চিকিৎসক খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া যে প্রেসক্রিপশন দেবেন সে অনুযায়ী ১৬ কোটি মানুষ তাদের চিকিৎসা করবে।
সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, সাংবাদিক নেতা ও অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক সদরুল আমিন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন, চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম, ড্যাবের সভাপতি আজিজুল হক প্রমুখ।