শেখ হাসিনার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ…মিজানুর রহমান খান

একচুল কেবল নয়, এক ক্রোশ চুল নড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ভাষণে গণতান্ত্রিক মনোভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সমঝোতা যে দরকার, তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলেছে। শেখ হাসিনা দেশের সাফল্যের জন্য আওয়ামী লীগের পরিবর্তে ‘আপনাদের’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এখন থেকে অন্তত আমরা কোনো জাতীয় কর্তব্য সম্পাদনে একটা ‘সর্বদলীয়’ সমাধানের কথা অধিকতর ভরসার সঙ্গে ভাবতে পারব। এ-সংক্রান্ত আলোচনাকে আর উন্নাসিক মনে হবে না। আওয়ামী লীগের সাবেক গঠনতন্ত্রের যৌথ নেতৃত্বের ধারণা, যা এত দিন চেতনাগতভাবেও নির্বাসিত ছিল, এত দিনে তার একটা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলল। আমি অন্তত সেভাবেই দেখতে চাইছি।
সোহরাব হাসান চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন একটি বাক্য: ‘দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে দেশদ্রোহীদের নির্বাচন নয়, যুদ্ধ হতে পারে।’ আমরা এখন দেখলাম, যারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলে দেশ জঙ্গিতে ভরে যাবে, লুটপাট হবে, যারা যুদ্ধাপরাধী, যারা তাদের দোসর, যারা স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের এখন নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতার ভাগ দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দলটি প্রস্তুত। এটি বাস্তবে রূপ পেলে আমরা অন্তত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের ধুয়ো তোলা থেকে রেহাই পাব। কারণ কী? নিতান্তই কৌশলগত? নাকি একেই বলে সুবিধাবাদের রাজনীতি। নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে বলব, প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। সুবিধাবাদ না হয়ে এটাই যদি বাংলাদেশি মানের গণতন্ত্র হয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি নির্বাচনে আসুক আর না-ই আসুক, এখন একটি আশা অন্তত করতে পারি। সেটা মেঠো বক্তৃতাবাগীশদের কাছে না হলেও ক্ষমতাসীনদের আশ্রিত বুদ্ধিজীবী, যাঁরা আরেকটি ‘মুক্তিযুদ্ধে’ নিয়োজিত আছেন, তাঁরা যেন এখন থেকে আল্লাহর ওয়াস্তে প্রধান বিরোধী দল স্বাধীনতাবিরোধী, তারা ক্ষমতা পেলে দেশের তালেবানীকরণ তীব্র হবে ইত্যাদি ধরনের কান ঝালাপালা পাইকারি বাগাড়ম্বর বন্ধ করেন। তাঁরা সেটা করুন আর না-ই করুন, সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব আমাদের জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসের একটি বড় অর্জন। বিশেষ করে এটা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছ থেকে এসেছে বলে এর বাড়তি তাৎপর্য রয়েছে। একাত্তর ও ২১ আগস্টের ‘ঘাতক’ কিংবা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃশ্যমান রাজনৈতিক ‘ধারক-বাহক’দের মন্ত্রিত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এটাও আমরা লক্ষ করি, বাকশালের পরে আওয়ামী লীগ আর নিরঙ্কুশভাবে আওয়ামী লীগারদের দিয়ে মন্ত্রিসভা সাজায়নি। শেখ হাসিনা তাঁর প্রথম মেয়াদকে ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ সরকার, দ্বিতীয় মেয়াদকে (তিন-চতুর্থাংশ আসন পাওয়া সত্ত্বেও) মহাজোট সরকার এবং এখন একে একটি সর্বদলীয় সরকারের চেহারা দিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। এটা আওয়ামী লীগাররা জাতীয় ঐক্য বলে চিহ্নিত করলেও বিরোধীরা দেখছেন সুবিধাবাদ হিসেবে।
স্বাধীনতার পর জাতীয় সরকার বা সর্বদলীয় সরকারের একটি আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনীয়তা ছিল। সেদিনের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা সেটা চিন্তাই করতে পারেনি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনটি একটি সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হয়নি। সেটা সেদিনের বিরোধী দল দুর্বল ছিল বলেই নয়। শক্তিশালী হলেও সেটা ভাবার সময় তখন ছিল না। আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগে আচ্ছন্ন ছিল। সেই আচ্ছন্নতা আজ ঈষৎ হলেও টুটল। আমার মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জাতীয় রাজনীতিতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক ছায়া ফেলবে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে প্রস্তাবিত আওয়ামী লীগ-বিএনপি মন্ত্রিসভা কতটা উপকারে দেবে বা দেবে না, বা আদৌ বাস্তবে রূপ পাবে কি না, সেসব সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দলের সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব টেবিলে আছে—এটাই আপাতত সুখবর।
তবে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব বিএনপি পত্রপাঠ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নাকচ করেনি, সেটা কম লক্ষণীয় নয়। তারা কি বিরোধিতাসর্বস্ব রাজনীতির বেড়াজাল থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে? করুক আর না-ই করুক, এই লেখা ছাপা হওয়ার আগেই যদি তাদের নেতিবাচক অবস্থান প্রকাশ পায়ও, তাহলেও বলব, প্রধানমন্ত্রীর সমঝোতার সূত্রে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সম্ভব। অবশ্য এটা তাত্ত্বিক দিক। সুচিন্তিতভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাও অগ্রগতি বটে।
বিএনপির কঠোর অবস্থানের মধ্যে হয়তো রাজনৈতিক বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে। এর বড় বাধা আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান। স্যার নিনিয়ানের মধ্যস্থতার সময় সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদের প্রতি আলো পড়েনি। ৫৫ অনুচ্ছেদ বলেছে, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যস্ত থাকবে এবং তা কেবল তারই কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হবে। এ রকম কোনো বিধান সংসদীয় গণতন্ত্র অনুসরণরত কোনো দেশের সংবিধানে লেখা নেই। সব দেশেই লেখা, নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রিসভার কাছেই থাকবে। ভারতে নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে আর তা প্রযুক্ত হয় ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার পরামর্শে’।
সুতরাং বিএনপির নাকচ কেবলই রাজনৈতিক বলা যাবে না। ১৯৯৬ সালে অবশ্য কেবলই বিষয়টি খালেদা জিয়ার প্রতি ব্যক্তি শেখ হাসিনার বিরাগ হিসেবে দেখা হয়েছে। এমনকি পঞ্চম সংসদ থেকে আওয়ামী লীগের গণপদত্যাগের আগে যখন বলা হলো, খালেদা জিয়া পদত্যাগ করবেন, তখনো সমঝোতা হলো না। কারণ, আওয়ামী লীগের একটি বিজয় মিছিল দরকার ছিল। সর্বদলীয় সরকার মানলে বিজয় মিছিল মিলত না। এবার তো খালেদা জিয়া আগেই স্পষ্ট করেছেন, শেখ হাসিনাকে রেখে তিনি নির্বাচনে যাবেন না। তবে আবারও বলব, একে যেন কেবলই ব্যক্তিগত বিরাগ হিসেবে না দেখা হয়। এটা কেবলই ইগো সমস্যা নয়। আশা করব, ৫৫ অনুচ্ছেদটি হেডলাইনে পরিণত হবে। এটা ফুটে উঠবে মন্ত্রীদের কতটা অসহায় করে রাখা আছে। বেচারা মন্ত্রীদের জন্য যাতে মনে একটু দয়ামায়ার উদ্রেক ঘটে।
বিএনপি সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখাটাই এমনভাবে দিতে পারত, যা সরকারি দলের পক্ষে গ্রহণ করা যথেষ্ট কঠিন হতো। এখনো সে সুযোগ নষ্ট হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আলোকে একটি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার হতে পারে, যাতে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা থাকবেন কিংবা থাকবেন না। দুই রকমই হতে পারে। প্রশ্নটা হলো, সংবিধান ব্যাখ্যা করার মতোই সর্বদলীয় সরকার কেবল শেখ হাসিনার শর্তাধীনেই হতে হবে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব আমরা। সরকারি দল তাদের প্রস্তাবে কতটা আন্তরিক আর কতটা কৌশলগত, সেটা দেখতে আমরা অপেক্ষায় থাকব।
প্রধানমন্ত্রী যদি স্বপদে থাকেন, তাহলে সংবিধানের আলোকে একটি সর্বদলীয় সরকার কেমন হতে পারে, তা বাংলাদেশি সমাজের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত হতে হবে। কারণ, বর্তমান সংবিধানে সর্বদলীয় সরকারের কথা বলা নেই। প্রধানমন্ত্রী জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে তাঁর এত দিনকার একটি বহুল উচ্চারিত অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ালেন। তিনি সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারণ করেছেন, পৃথিবীর অন্যান্য গণতন্ত্রে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, তাই তিনি বাংলাদেশেও তা হতে দেবেন না। তেমনি এখন বলা যাবে, নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারও অন্যান্য গণতন্ত্রে নেই। বরং উদাহরণের দিক থেকে সর্বদলীয় সরকারের ধারণা আরও অভিনব। এ ধরনের সর্বদলীয় সরকার আসলে কোনো বিশেষ ক্রান্তিকালে গড়ে ওঠা ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট বা জাতীয় সরকার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটেন প্রথম সর্বদলীয় সরকার দেখে। স্যার উইন্সটন চার্চিলও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটেনে এমন সরকার করেছিলেন। একে কখনো জাতীয় সরকার বা কোয়ালিশন সরকার বলা হয়।
অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সর্বদলীয় সরকার করেছিল। ভারত উপমহাদেশে সর্বদলীয় সরকার কাজ করেনি। আয়েশা জালাল ১৯৯৪ সালে তাঁর কেমব্রিজ প্রকাশিত সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লীগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান বইয়ে লিখেছেন, ‘কংগ্রেস হাইকমান্ড বেঙ্গল কংগ্রেস কমিটিকে মুসলিম লীগের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে দিতে প্রস্তুত ছিল না। এই অবস্থায় বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জোরালো করতে বেঙ্গলের সামনে সুযোগ সৃষ্টি হয়। কংগ্রেস তা প্রতিহত করার সুযোগ পায়নি। কারণ, কংগ্রেসকে কেন্দ্রের ক্ষমতা ও ঐক্যের দিকে নজর দিতে হয়েছিল। কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় দুই দল কীভাবে ক্ষমতা ভাগাভাগি করবে, তা নিয়ে সৃষ্ট কাজিয়ায় সমঝোতা ভেঙে গিয়েছিল। (পৃ. ১৬২) বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে ওই অভিজ্ঞতা স্মরণ রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরও একটি বড় তাৎপর্য হলো, তিনি কার্যত বিএনপির চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। এটা মান-অপমানের বিষয় নয়। তিনি গণতন্ত্রের দাবি মিটিয়েছেন। বরফ গলুক আর না-ই গলুক, একচুল থেকে এক ক্রোশ তিনি নড়েছেন। আওয়ামী লীগ এখন অন্তত আর গলা চড়িয়ে বলতে পারবে না যে, তারা ‘একচুল’ও সরে দাঁড়ায়নি। বিএনপিও বলতে পারবে না, আওয়ামী লীগ একগুঁয়েমি করেছে। এবং সেটা ২৫ অক্টোবরে বিরোধীদলীয় নেতার একটি আলটিমেটামের মুখে দাঁড়িয়েই তিনি সেটা করলেন। যদিও তিনি তাঁর ভাষণে খালেদা জিয়ার কাছে ‘সংলাপ চেয়ে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম লাভের’ সমালোচনা করেছেন। তবু পড়ন্ত বিকেলে একটি সমঝোতাসূত্র দিলেন। যদিও এটা সেই স্যার স্টিফেন নিনিয়ানের ৫+৫+১ ফর্মুলা, ১৯৯৬ সালের আগে বিএনপি যা মেনেছিল, আওয়ামী লীগ যা নাকচ করেছিল।
অবশ্য প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারে কে কোন দপ্তর পাবেন, সেটা তিনি প্রকাশ করেননি। যদি ধরেও নিই, প্রধানমন্ত্রীর পদ আওয়ামী লীগের থাকবে, তাহলে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র বা সংস্থাপন মন্ত্রণালয় কি দেওয়া হবে? এ ধরনের একটি আলোচনায় গিয়ে অসফল হওয়ার ঝুঁকি বিএনপি নেবে কি না, সেটাও এক প্রশ্ন। কোন কোন দপ্তর কে পাবে, সেটা নিয়ে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেধেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সাংবিধানিক দিক নিয়ে আলোচনা কাল।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com