শেখ হাসিনার ভাষণকতটা আশাব্যঞ্জক?..সোহরাব হাসান

বেশ কিছুদিন ধরেই জল্পনা চলছিল, নির্বাচন সামনে রেখে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। যেকোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমস্যা ও বিতর্ক দেখা দিলে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব, জাতিকে সে সম্পর্কে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করা এবং সেই সমস্যা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, তার একটি উপায় খুঁজে বের করা। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবিল নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের বিরোধের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাম্প্রতিক ভাষণটিও স্মরণীয়। শেষ পর্যন্ত ১৬ দিন ‘শাটডাউন’ থাকার পর আমেরিকায় অচলাবস্থার অবসান হয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে যে অচলাবস্থা চলছে, তার শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে কি? প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ কী ইঙ্গিত দেয়?
অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের ভাষণ অনেক চিন্তাভাবনা করেই দেওয়া হয়। অনেক দেশে রীতি আছে যে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর জন্য তাঁদের কর্মকর্তারা একাধিক ভাষণ তৈরি করেন, যার মূল কথা মোটামুটি এক হলেও ভাষা আর ভঙ্গিতে পার্থক্য থাকে। রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী শেষ মুহূর্তে ঠিক করেন কোনটি নেবেন বা কোন কৌশলটি তাঁদের জন্য সুবিধাজনক হবে। কিন্তু আমাদের দেশে মেয়াদের প্রথম দিন থেকে যেখানে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামে, সেখানে কেউই এসব গণতান্ত্রিক কৌশলের ধার ধারে না।
গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রতীক্ষিত ভাষণটি শুনলাম। ভাষণের শেষঅংশে শেখরাসেলের কথা বলতে গিয়েপ্রধানমন্ত্রীআবেগরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।তাঁর এই আবেগ অনেককেই স্পর্শ করবে সন্দেহ নেই, কিন্তু তাতে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা এ মুহূর্তেবলা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে পুরোনো প্রস্তাবই নতুন করে উপস্থাপন করেছেন।

প্রথমত, বিরোধীদলের সদস্যদের নিয়েঅন্তর্বর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন এবং নির্বাচনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতিকে লিখিত চিঠি দেওয়ার ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেননি। সে ক্ষেত্রে একটি বিষয়পরিষ্কার যে, শেখ হাসিনা নির্বাচনের ব্যাপারে তাঁর পরিকল্পনামতোই এগোচ্ছেন। বিরোধী দলকে কোনো ছাড় দিচ্ছেন না। এখন প্রশ্ন হলো, শেখহাসিনার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে বিরোধী দল যোগ দেবে কি না এবং নির্বাচনে আদৌ অংশ নেবে কি না। সরকারে যোগ না দিয়েও বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিলে শেখ হাসিনার জন্য সেটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কেননা তখন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার দায়িত্ব তাঁর ওপরই বর্তাবে। আর যদি বিরোধীদলনির্বাচনেই অংশ না নেয়, তখন কী হবে? যে এক-এগারোর ভয়দেখিয়েপ্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছেন, সেই জুজু যে পুনরায় জাতির ওপর চেপে বসবে না, তার নিশ্চয়তা কী?

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে কী আছে কী নেই, তার চেয়েও বড় কথা, ভাষণটি কে কীভাবে দেখছেন। সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা একে চিহ্নিত করেছেন মাইলফলক হিসেবে। আবার বিরোধী দল বলছে, ভাষণে সংকট সমাধানের কোনো কথাই নেই। প্রধানমন্ত্রী জনগণকে হতাশ করেছেন।

ভাষণের ইতিবাচক দিকটি হলো, প্রকাশ্যে না বললেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের কথা স্বীকার করেছেন, বিরোধীদলের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা বলেছেন। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আরও কঠোর অবস্থানের কথা থাকবে। কিন্তু সেটি না থাকায় জনগণ আপাতত স্বস্তি বোধ করছেন। বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যেসব প্রশ্ন উঠেছে এবং সমালোচনা হচ্ছে, ভাষণে তিনি সেসবের জবাব দেননি। দিলে বিতর্ক আরও বাড়ত। তিনি তাঁর সরকারের আমলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়নে কী কী সাফল্যঅর্জিত হয়েছে, তার বর্ণনা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীবিরোধী দলকে সংসদে এসে তাদের সেই ফিরিয়ে নেওয়া মুলতবি প্রস্তাব পুনরায় পেশ করতে বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আলোচনার দরজা খোলা আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সংসদের বাইরে আলোচনা হতে পারে কি না, সে সম্পর্কে কিছু বলেননি। বিরোধী দল মনে করে, নির্বাচন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। সংসদের ভেতরে তা সম্ভব নয় এবং সেই ক্ষমতাও বিরোধী দলের নেই।

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে আরেকবার দেশসেবার সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। ভোট চাওয়ার অধিকার প্রধানমন্ত্রীর আছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন, সেই ভোট কীভাবে হবে, মানুষ নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, সবার ভোটাধিকার রক্ষিত হবে কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তরে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলেননি প্রধানমন্ত্রী। শুধু বলেছেন, তাঁর সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা থাকলে এসব প্রশ্নের জবাব জনগণ তাঁদের কাছেই দাবি করতেন। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী তাঁর সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, তাঁরই সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে চাইছেন, সেহেতু তাঁর কাছে এসব প্রশ্ন করার অধিকার জনগণের নিশ্চয়ই রয়েছে। বাংলাদেশের একজন নাগরিকও যদি নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে সংশয়ী হন, সেই সংশয় দূর করার দায়িত্বও তাঁকে নিতে হবে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাস বড় বেদনাদায়ক। একসময় রাজনীতিকেরা আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি বলেই তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা এসেছিল। পরে সেই তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থাও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি অথবা নিজেরাই নানা বিতর্কে জড়িয়েগেছে। প্রধানমন্ত্রী সেই অজুহাতে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করে দিলেন। কিন্তু এখন কীভাবে সেই আস্থার পরিবেশ আবার তৈরি হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি। প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন, বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করেই সবার জন্য গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবেন (যার জন্য তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় লড়াই করেছেন), তাহলে অবশ্যই বিরোধী দলকে আস্থায় আনতে হবে। ‘জনপ্রিয়তা নেই’ কিংবা ‘হেরে যাওয়ার ভয়ে বিরোধী দল নির্বাচনে আসছে না’—এসব হাওয়াই অভিযোগ আনলে সমস্যার সমাধান  আরও কঠিনতর হবে। আর প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন, বাংলাদেশে তাঁর দলই একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জনসেবক, তাহলে তো নির্বাচন করারই প্রয়োজন হয় না। দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে দেশদ্রোহীদের যুদ্ধ হতে পারে, নির্বাচন নয়।

প্রধানমন্ত্রী এর আগেও একাধিক সভা-সমাবেশেবলেছেন, তাঁরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চান। বিরোধী দলেরও দাবি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি যেভাবে মনে করেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব, বিরোধী দল তা মনে করে না। আবার বিরোধী দল যেভাবে মনে করে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব, তিনি সেভাবে ভাবেন না। কথা হলো, দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করবে কে?  তাদের  মধ্যে ন্যূনতম মতৈক্য থাকতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন ও গণতন্ত্র—কোনোটাই সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনীতি অসম্ভবের পায়ে কুঠার হেনে চলেছে।

মূল সমস্যা সাংবিধানিক নয়, রাজনৈতিক। অতএব, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সংবিধান পরিবর্তন না করেও একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন-পরবর্তী বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। নির্বাচনের পর যে দল ক্ষমতায়আসবে অথবা যে দল বিরোধী দলে বসবে, তাদের পারস্পরিক আচরণের ওপরই গণতন্ত্র নির্ভর করে। গত চারটি নির্বাচনে আওয়ামী ও বিএনপি পালা করে জয়-পরাজয় ভাগাভাগি করে নিলেও দেশ চালনা দূরে থাক, সংসদ চালনার ব্যাপারেও তারা একমত হতে পারেনি। যে কারণে ক্ষমতাসীনেরা স্বেচ্ছাচারীভাবে সংসদ ও দেশ চালিয়েছে। আর বিরোধীরা রাজপথেই সমাধান খুঁজে বের করতে সচেষ্ট থেকেছে। এটাই বাংলাদেশের ভাগ্যলিপি।

আগামী নির্বাচন যেভাবেই হোক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা ছাড়া গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যাবে না। শেখহাসিনার ভাষায়, ‘শিশু গণতন্ত্র’ শিশুই থেকে যাবে। সময়ের ব্যবধানে তা আরও রুগ্ণ হবে। বিজয়ী দল যখন সবকিছু দখলে নিতে চায় এবং বিরোধী দলের ওপর হিংসার বিষবাষ্প ছড়াতে ব্যস্ত থাকে, তখন কেউই নির্বাচনে পরাজিত হতে চাইবে না। তারা ভাববে, পরাজয়ের চেয়ে বর্জনই উত্তম।

এসব হতাশার মধ্যেও আশার ক্ষীণ আলোকরেখা দেখবেন কেউ কেউ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান নিজ নিজ সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার দেওয়া বক্তব্য ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। দুই নেত্রীই সমস্যার সমাধানে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

আমরা আশা করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সেই আলোচনার পরিবেশ তৈরির একটি রূপরেখা থাকবে। বিরোধী দল  যেকোনো সময়ে আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরও সুনির্দিষ্ট কিছু আশা করেছিলাম।তিনি বিদেশি সংস্থা ও বন্ধুরাষ্ট্রের উদ্বেগ সম্পর্কে কিছু না বলুন, অন্তত দেশের মানুষের উদ্বেগের কথা তাঁর বক্তৃতায় থাকবে—সেটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সেই উদ্বেগের প্রতিফলন মেলেনি। তবে আমরা পুরোপুরি নিরাশ হচ্ছি না। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে হলে শেখহাসিনাকে অবশ্যই বিরোধী দলকে আস্থায়আনতে হবে। আর সে আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার একমাত্র উপায় আলোচনা। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আগে নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা ছিল, ভাষণের পরও যদি সেটি অব্যাহত থাকে, বুঝতে হবে তিনি জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলেই দেশ ও জনগণের জন্যদুর্যোগ নেমে এসেছিল। ১৯৯৬ সালে একতরফা নির্বাচন হয়েছিল। ২০০৭ সালের নির্বাচনই হতে পারেনি। দুই বছরের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূত দেশবাসীর ওপর চেপে বসেছিল। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা কী ধরনের নির্বাচন উপহার দেন তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

l সোহরাব হাসানকবিসাংবাদিক।

sohrab03@dhaka.net