শেখ হাসিনা কি তাঁর কথা ফিরিয়ে নেবেন?..সোহরাব হাসান

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করতে গিয়ে জনগণের কাছে তাঁর দলের পক্ষে ভোট চাইছেন। তিনি বলছেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগ বা মহাজোটকে আরেকবার নির্বাচিত করুন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে দেশে ফের দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটবে, বর্তমান সরকারের নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তাঁর দাবি, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে। দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের জেলখানা থেকে বের করে এনে মন্ত্রী-সাংসদ বানানো হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। পরিশীলিত ও উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই প্রশ্ন যথাযথও মনে করি। কিন্তু আমাদের রুগ্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্ভবত অতটা সংযম ও নৈতিকতা আশা করা যায় না। এ কথা যেমন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতা-নেত্রীদের জন্য প্রযোজ্য, তেমনি বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের জন্যও অপ্রাসঙ্গিক হবে না। মেয়াদের প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত তাঁরা একে অন্যের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে নামেন। মন্ত্রীরা সরকারি প্রটোকল ও নিরাপত্তা ব্যবহার করে দলীয় সভায় যেমন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে থাকেন, তেমনি বিরোধী দলের নেতারাও যে সরকারের কাছে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের দাবি তুলে ধরছেন, সে সরকারকেই জনগণের নির্বাচিত বলে মানেন না, মনে করেন মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ষড়যন্ত্রের ফসল। এই হলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী এক দিনের জন্যও অনির্বাচিত ব্যক্তিরা দেশ চালাতে পারেন না। আমাদের সর্বোচ্চ আদালতও সেই রায় দিয়েছেন। কিন্তু এক কোটির বেশি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত ঢাকা মহানগরকে তিনি জনপ্রতিনিধিত্বহীন করে রেখেছেন এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সেখানে বসিয়েছেন, তার কী জবাব? ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কিন্তু স্থানীয় সরকার সংস্থার প্রতিটি পর্যায়ে নির্বাচন করার কথাই বলা হয়েছিল। আমাদের নেতারা নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান ও আদালতের রায়কে ব্যবহার করেন।
এই যে প্রধানমন্ত্রী নিজের দল ও জোটের পক্ষে ভোট চাইছেন এবং বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে দেশের কী কী সর্বনাশ হবে বলে জনগণকে নসিহত করছেন, সেটি নিশ্চয়ই নির্বাচনী লড়াইয়ে জেতার জন্য। কিন্তু সেই নির্বাচনটি কীভাবে হবে, কখন হবে সে বিষয়টি স্পষ্ট করছেন না। প্রধানমন্ত্রী কি মনে করেন, তাঁদের শর্ত মেনে বিরোধী দল নির্বাচনে আসবে? যদি না আসে, তাহলে কী হবে? সরকার কি একতরফা নির্বাচন করে ফেলবে?
প্রধানমন্ত্রী কি চিন্তা করতে পারছেন, সেই একতরফা নির্বাচনের ফল কী হবে? সেই নির্বাচনে কত মানুষকে প্রাণ দিতে হবে? দেশের কী পরিমাণ সম্পদ নষ্ট হবে? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রধানমন্ত্রী বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের যে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে দাবি করেন, সেই অধিকার কি আবার তাঁর হাতেই নিহত হবে?
আমরা জানি, স্বৈরশাসকেরা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ভোটের অধিকার হরণ করেন। সামরিক শাসকের গর্ভে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল নির্বাচন নিয়ে নয়ছয় করে, কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো একটি গণতান্ত্রিক ও ঐতিহ্যবাহী দল কেন সেই কাজ করবে?
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মূল কথা হলো, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমতলে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেই সুযোগই কেন প্রধানমন্ত্রী দিতে চাইছেন না? আজ যদি তিনি বিরোধী দলে থাকতেন এবং তিনি যেসব শর্তে বিরোধী দলকে নির্বাচনে আসতে বলছেন, সেসব শর্ত যদি তারা তখন তাঁকে দিত, তাহলে কি তিনি মেনে নিতেন? তিনি নিজেই জাতীয় সংসদে একবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, বর্তমান সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের সময় সরকারের আকার কী হবে, সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবেই সরকার বহাল থাকবে। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম। (কালের কণ্ঠ, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১২)।
এখন আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সংসদ কেবল বহাল রাখবেন না, নির্বাচন পর্যন্ত অধিবেশনও চালাবেন। অভিনব ব্যবস্থা! একদিকে নবম জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলবে, অন্যদিকে দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনী প্রচারণা। আশা করি সরকারি দলের সাংসদেরা কথা রাখবেন, তাঁরা ভোটারের কাছে না গিয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অধিবেশনকক্ষে বসে বিরোধী দলের মুণ্ডুপাত করবেন। তখন দেখা যাবে ভোটাররা কার পক্ষে রায় দেন। আসলে এগুলো বিরোধী দলকে দেওয়া হুমকি। বশে আনার চেষ্টা। সরকারি দল কিছুতেই মানতে চাইছে না যে দেশে নির্বাচন নিয়ে একটি সংকট চলছে। আর এ অস্বীকারের পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা-ও তারা ভাবতে পারছে না। সরকার জনগণের নিরাপত্তা দেবে কী, নিজের দলের কর্মীদেরই তো নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সে কথা কি তিনি ফিরিয়ে নিতে পারেন? তাহলে কি তিনি প্রতিশ্রুতিভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হবেন না?
প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, এটাই বাংলাদেশের শেষ নির্বাচন নয়। পরবর্তী কোনো নির্বাচন যদি তাঁকে বিরোধী দলে থেকে করতে হয় এবং তখন যদি ক্ষমতাসীনেরা সংসদ ভেঙে দেওয়া কিংবা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সম্পর্কে একই কথা বলে, তাহলে কি তিনি মেনে নেবেন?
আর প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রী-সাংসদেরা যখন মনে করছেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে প্রভূত উন্নতি হয়েছে, তাঁর আমলে প্রচুর রাস্তাঘাট-কালভার্ট-সেতু, ফ্লাইওভার হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, মানুষের আয় বেড়েছে, মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে, সর্বোপরি যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে জাতি গ্লানিমুক্ত হতে যাচ্ছে, তাহলে প্রতিপক্ষকে ভয় পাচ্ছেন কেন? একটি সফল ও কীর্তিমান সরকার বিরোধী দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে কেন কুণ্ঠিত হবে?
নির্বাচনের দুটি চরিত্র আছে। একটি চালু করেছেন সামরিক শাসকেরা, নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে। নির্বাচনে কে এল না এল, তা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আরেকটি হলো সর্বজনীন। প্রথমটির জন্য প্রচারের প্রয়োজন হয় না, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ারও দরকার পড়ে না। অলৌকিকভাবে ব্যালট বাক্স ভরাট হয়ে যায় এবং সরকার যাঁকে চাইবে, তাঁরাই নির্বাচিত হয়ে যাবেন। এ রকম ভোটেই জিয়াউর রহমান ও এরশাদের রাবার স্ট্যাম্প সংসদ গঠিত হয়েছিল। এ রকম ভোটেই আ স ম আবদুর রব বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন। এমনকি সম্মিলিত বিরোধী দলকে ঠেকাতে ‘গণতান্ত্রিক’ খালেদা জিয়াও ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন করেছিলেন। তারপর গঙ্গা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে, ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শেখ হাসিনার ডাকে অনেক মানুষ প্রাণ দিয়েছে। তার পরও আরেকটি একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি? এর পরিণতি কী হবে, সরকার একবার ভেবে দেখেছে?
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা জনগণের জন্য অনেক কাজ করেছি, জনগণ যদি আমাদের কথা মনে রাখে, তাহলে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। যদি মনে না রাখে, যদি আমাদের ভোট না দেয় না দেবে।’ তাঁর এসব কথায় যতই হতাশা থাকুক নিশ্চয়ই তিনি নির্বাচনে বিরোধী দল আসবে, সে কথাই মাথায় রাখছেন। তাহলে বিরোধী দলের সঙ্গে একটি বোঝাপড়ায় আসছেন না কেন? তিনি কি জানেন না জনগণ একগুঁয়েমি বা জেদাজেদি পছন্দ করে না। তিনি বিরোধী দল সম্পর্কে যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো কথা নেই। জনগণ তাঁর কথার গুণাগুণ বিচার করবে। কিন্তু নির্বাচনের ব্যাপারে তাঁকে একটি সমঝোতায় আসতেই হবে। কীভাবে সেই সমঝোতা হবে, সরকার কতটা ছাড় দেবে, বিরোধী দল কতটা ছাড় দেবে সেটি আলোচনার টেবিলে ঠিক হবে। কিন্তু সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে বসবেই না—এ মনোভাব একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। নির্বাচনে বিরোধী দলের আসার পথটি তিনি কঠিন করে দিলে গণতন্ত্রের পথই কঠিন হয়ে পড়বে এবং তাঁর দায়দায়িত্বও তাঁকে নিতে হবে। এখন তাঁর চারপাশে যেসব মৌ-লোভী আছেন, তাঁরা কেউ দায়িত্ব নেবেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধানের বাইরে একচুলও নড়বেন না। এখন সংবিধান সংশোধন করতেই হবে—সে কথা জোর দিয়ে বলছে না বিরোধী দল। তারা জোর দিচ্ছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ওপর।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন, সেখান থেকেও কি সরে এসেছেন? যেই গণতন্ত্রের জন্য তিনি ৩৩ বছর ধরে সংগ্রাম করেছেন, তাঁর হাতেই সেই গণতন্ত্রের শেষকৃত্য রচিত হবে—সেটি দেশবাসী চায় না। তাঁকে মনে রাখতে হবে, সরকার নির্বাচন নিয়ে যতই কঠোর অবস্থান নেবে, ততই ভোটের ফল তাদের বিপক্ষে যাবে।
শারদীয় দুর্গোৎসব চলছে। তারপর কোরবানির ঈদ। কিন্তু এই পূজা ও ঈদের আনন্দ ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে আতঙ্ক। ২৫ অক্টোবরের পর কী হবে? ইতিমধ্যে পাল্টাপাল্টি জনসভার কর্মসূচি নিয়েছে দুই পক্ষ। সেই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের ওপর। তারা যদি বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, তাহলে দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে। অন্যথায় সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net