সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন

শেষ চাপ পর্যবেক্ষক পাঠানোর শর্তে!

সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে বিদেশিরা তা পর্যবেক্ষণ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর এতে বহির্বিশ্বে বড় চাপের মধ্যে পড়তে পারে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলে বিদেশিদের পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও জটিল হয়ে যাবে। বিশেষ করে, বড় কোনো রাজনৈতিক দল যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়বে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোও। কারণ তারা বারবার সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে আসছে। একতরফা নির্বাচনের জন্য পর্যবেক্ষক পাঠানোর অর্থ ওই নির্বাচনকে সমর্থন জানানো। একই সঙ্গে এটা নির্বাচন বর্জনকারী দল বা জোট এবং তাদের সমর্থকদের দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারও শামিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, একতরফা নির্বাচন হলে তা দেশে বা দেশের বাইরে কোথাও বৈধতা পাবে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল প্রয়োজন। বিরোধী দল ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে আওয়ামী লীগ কার বিরুদ্ধে নির্বাচন করবে? স্বীকৃত বিরোধী দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে যে বাইরের চাপ আসবে তা রাজনীতিবিদদের না বোঝার কারণ নেই। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো আশাবাদী, পরিস্থিতি এত দূর যাবে না। এটি না হলে যে সংঘর্ষ বাধবে তা সামাল দেবে কে?’
ড. ইমতিয়াজ বলেন, অতীতেও একতরফা নির্বাচন ও নির্বাচন করার চেষ্টা বৈধতা পায়নি। বিদেশিরা বেশ আগে থেকেই বলছে, আগামী নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে তারা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এটি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপে রাখার কৌশল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার একটি পশ্চিমা দূতাবাসের প্রভাবশালী কূটনীতিক অবশ্য নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সংকট কেটে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী মন্তব্য করেছেন। এর কারণ জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, রাজনীতিবিদরা অতীত থেকে শিখবেন। না শিখলে পুনরাবৃত্তির চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকরা এ দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত। অতীতে তাঁরা বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠালেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁদের বিস্তৃত পরিসরে ভাবতে হবে। পর্যবেক্ষক পাঠানোর যৌক্তিকতা, সম্ভাব্য প্রভাব বা না পাঠালে এর প্রতিক্রিয়া সবকিছুই তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি মিশন গত মাসে পরিস্থিতি যাচাই করতে বাংলাদেশ সফর করে। ওই সফরে মিশন সদস্যরা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই মিশনের সফরের সময়ই ঢাকায় ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধানের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা না-করার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। যথাসময়ে এ ব্যাপারে জানানো হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ঘটনা প্রবাহ বিদেশিদের অজানা নয়। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার স্বার্থে তারা সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। তারা নির্বাচন নিয়ে রাজপথে সংঘাত, রক্তপাত ও অনিশ্চয়তা চায় না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা না-করার বিষয়টি আসবে। অবশ্যই বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ও বিদেশি পর্যবেক্ষক প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন হলে হবে। কিন্তু আমরা তাতে যাব না। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আসা না-আসা তাদের বিষয়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যবেক্ষক পাঠানো না-পাঠানোর ব্যাপারে বিদেশিদের কাছে আমাদের বলার কিছু নেই। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রবক্তা বলে নিজেদের দাবি করে যে দেশগুলো তারা এ দেশের নির্বাচন নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে এটি তাদের বিষয়। তবে এ দেশের ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ মনে করে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।
এদিকে সরকার দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। গত মে মাসে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ঢাকা সফরে এ আহ্বান জানানো হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বর্তমান সরকার মনে করে, শুধু নির্বাচনের সময় পর্যবেক্ষণে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। এ জন্য নির্বাচনের আগে ও পরেও পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সে দিনই প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমার সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের বৈঠক হয়েছে। এ সময় আমি তাঁকে বলেছি, আপনারা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না সেটা দেখার জন্য যত খুশি পর্যবেক্ষক পাঠান। আপনারা এসে দেখেন আমরা তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে পারি কি না। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া যে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব আওয়ামী লীগ সরকার সেটা দেখিয়ে যেতে চায়।’
উল্লেখ্য, এক-এগারোর আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচন বর্জন ঘোষণা ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলো তাদের পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। আগামী নির্বাচন নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধানে পৌঁছাতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে বারবার তাগিদ দিয়ে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন দুই নেত্রীকে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দুই নেত্রীকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক না গলানোর নীতিতে বিশ্বাসী চীনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নীরব থাকতে পারেনি। চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের উপায় খুঁজতে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।