শেষ সময়ে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা : সচিবদের ধারাবাহিক ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ কারণেই সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হচ্ছে। সেইসাথে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত সচিব। আর অদক্ষতার কারণে কমপক্ষে পাঁচ জন সচিবকে ওএসডি করা হচ্ছে। এই তালিকায় প্রভাবশালী একজন সচিবের নামও রয়েছে। মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে কতিপয় সচিবের ধারাবাহিক ব্যর্থতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এতটাই ক্ষুব্ধ করে তুলেছে যে, তিনি তার এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি ঘনিষ্ঠজনদের সাথে আলোচনাও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এক সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্র থাকাকালীন সময়ে কিংবা তিনি (প্রধানমন্ত্রী) দেশের ফেরার পর পরই এ সংক্রান্ত আদেশ জারি হবে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে।
জানা যায়, অনেক প্রত্যাশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকজন সচিবকে রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় পরিচালনায় এসব সচিবরা কোন সাফল্যই দেখাতে পারেননি। বরং এসব সচিবের কারণে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই আলোর মুখ দেখেনি। আর মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে মন্ত্রীর সাথে এসব সচিবের তৈরি হয়েছে তিক্ত সম্পর্ক। বেশ কয়েকজন সচিবের অকারণে ঘনঘন বিদেশ সফরও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দৃষ্টি কেড়েছে। এসব বিষয় নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী ইতোপূর্বেও একবার সচিব পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভরাডুবির পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে ওই রদবলের নির্দেশনা আসার পর একটি বিশেষ মহল প্রধানমন্ত্রীকে বুঝাতে সক্ষম হন যে- এরকম সময়ে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে রদবদল হলে তা জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই বিশেষ মহলের জোর তদবিরের কারণেই ওই সময় রদবদলের প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়েছিল।
সূত্রটি জানায়, ৮২, ৮৪ ও ৮৫ ব্যাচের অতিরিক্ত সচিবদের মধ্যে ছয়জন নতুন ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন। এছাড়াও সম্প্রতি যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার পর আরো দুই স্তরের (উপসিচব ও অতিরিক্ত সচিব) পদোন্নতি দেওয়ার চিন্তাভাবনাও করছে সরকার। এক্ষেত্রে উপসচিব পদে পদোন্নতির বিবেচনায় আনা হচ্ছে প্রশাসনের ২০, ১৫, ১৭ ও ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের। গুঞ্জন রয়েছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৮৫ ব্যাচের (যুগ্মসচিব) কর্মকর্তাদের সময়ের বিষয়টি প্রমার্জন করা হচ্ছে সরকারের আস্থাভাজন কয়েকজনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য। ইতিমধ্যেই এসব পদোন্নতি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। তবে এবারের পদোন্নতিতে বঞ্চিতদের (দল নিরপেক্ষ, মেধাবী ও দক্ষ) বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর এটিই হবে বর্তমান সরকারের শাসনামলের শেষ পদোন্নতি।
জানা যায়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের ঘন ঘন বিদেশ সফর নিয়ে নানা মুখরোচক কথাও রয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। সম্প্রতি তিনি ড্রেজার ক্রয়ের নামে প্লেজার ট্রিপে ঘুরে এসেছেন ইউরোপ, আমেরিকা। মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে রয়েছে তার বড় ধরনের ব্যর্থতা। তার মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই পড়ে রয়েছে মুখ থুবড়ে। এছাড়াও ভূমি, বস্ত্র ও পাট, স্থানীয় সরকার বিভাগ, শিল্প,  যুব ও ক্রীড়া এবং বাণিজ্যসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ে এই রদবদল হতে যাচ্ছে। এসব সচিবদের মধ্যে থেকে অনেককে ওএসডি কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি নতুন করে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পেতে পারেন প্রশাসন ক্যাডারের ৮৪ ব্যাচের প্রভাবশালী ৬ জন অতিরিক্ত সচিব। এরা হলেন- প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ আবদুল মালেক, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ কামাল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিল্লার রহমান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সোহরাব হোসাইন এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী। এরা ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১০ সালের ২৮ এপ্রিলে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। আর অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।
এদিকে, বর্তমান পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী যুগ্মসচিব হিসেবে কমপক্ষে তিন বছর এবং সচিব পদে পদোন্নতির জন্য অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কমপক্ষে দুই বছর চাকরি করা বাধ্যতামূলক। সে হিসেবে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই তাদেরকে অতিরিক্ত সচিব করা হয়েছিল। আর এই পদোন্নতি দিতে ওই সময় বঞ্চিত করা হয়েছিল প্রায় দেড় শত জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাকে। তদুপরি, অতিরিক্ত সচিব পদে তাদের কারোরই দুই বছর পূর্ণ হয়নি। অতিতেও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পদোন্নতি নিয়ে নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছিল। সেই সময় মাত্র ১৯ মাসে ১৭ জনকে উপসচিব থেকে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, পদোন্নতি দিতে হলে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি)’র সভা ডাকতে হয়। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি এসএসবির সভার প্রয়োজন হচ্ছে না। বিষয়টি উপলব্ধি করে দক্ষ অতিরিক্ত সচিবদের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তবে এটি নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর মর্জির ওপর। একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে রাজি করাতে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যৌক্তিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। উপদেষ্টাও তাঁদের যুক্তির সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন বলে জানা গেছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছর ধরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কর্মকান্ডে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল নাখোশ। মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দক্ষতা না দেখানোর পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই মাস আগে তাঁকে ওএসডি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকারের শীর্ষমহল। কিন্তু সচিবের ব্যাচমেট ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি ওই পদে এখনো বহাল রয়েছেন। আবারো রদবদলের বিষয়টি আলোচনায় আসায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই কর্মকর্তা তাঁর ব্যাচমেটকে রক্ষায় নানামুখী চেষ্টা শুরু করেছেন। এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের ওপরও সরকারের নীতিনির্ধারকরা সস্তুষ্ট নয়। এ কারণে তাঁকে এই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কোন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হতে পারে। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর এক আত্মীয়কে (সচিব)।
অন্যদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কার্যক্রমেও সরকারের শীর্ষমহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, গত ১৮ জুলাই যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতিতে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রভাবশালী দুই মন্ত্রীর একান্ত সচিবের পদোন্নতিতে তিনি পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। অথচ মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টাসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা ক্ষুব্ধ হন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসএসবি’র সভায় তাদের পক্ষে কারা সুপারিশ করেছিলেন তাঁদের নামও জানতে চাওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সরকারের নীতি-নির্ধারকমহল অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
জানা যায়, সরকারের আস্থাভাজন সিনিয়র এক সচিবকে (যিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন) এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে সচিব করা হতে পারে বলে সূত্রটি আভাস দেয়।