সংঘাতের পথেই হাঁটছে দুই দল

নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা বা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সাংঘর্ষিক রাজনীতির পুরোনো পথেই এগোচ্ছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের পর দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করাকে কেন্দ্র করে পরদিনই তা উবে গেছে। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে গতকাল রোববার সারা দেশে জেলায় জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
এর মধ্যে গতকাল সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের নানামুখী তৎপরতা এবং ওই সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতার যোগদান ঠেকাতে তাঁর বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েনের ফলে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ফলে ঈদ-পরবর্তী গতকাল প্রথম কর্মদিবসে রাজধানীর রাস্তায় লোকজনও কম ছিল। অবশ্য নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খালেদা জিয়া ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে অটল থাকায় পরে অনুষ্ঠানটি করতে দিয়েছে পুলিশ।
এদিকে সরকার ও আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার নিয়ে বিরোধী দলকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানাতে সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে। সংলাপের কার্যপদ্ধতি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা কী প্রতিক্রিয়া দেন, তা দেখে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপির মনোভাব ইতিবাচক হলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে চিঠি দেবেন। আর প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক হলে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হবে না।
তবে বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া যে ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তা গতকাল খালেদা জিয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে তাঁর দল অংশ নেবে না। নির্দলীয় সরকার ছাড়া তিনি নির্বাচনে যাবেন না।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, সমঝোতার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক নন। ২৫ অক্টোবর বিরোধী দলের সমাবেশ ও তৎপরবর্তী আন্দোলন মোকাবিলার কৌশল হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাব দিয়েছেন। তাছাড়া সর্বদলীয় সরকারের প্রধান হিসেবে বিএনপি শেখ হাসিনাকে মানবে না। দলটির দাবি, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন নির্দলীয় ব্যক্তি। এ ব্যাপারে আজ সোমবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।
এরই মধ্যে গত রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে দুই দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে অন্য কিছু হতে পারে।
এ অবস্থায় বিদেশি কূটনীতিকেরা যতই সংলাপ-সমঝোতার ওপর গুরুত্বারোপ করুন না কেন, এর কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, সরকার সংকট সমাধানে আন্তরিক নয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব দেওয়ার পরদিন সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে।
ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ আলোচনার পরিবেশ ক্ষুণ্ন করেছে।
তবে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি মনে করেন, সভা-সমাবেশের ওপর পুলিশের নিষেধাজ্ঞা আলোচনার পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী জানান, সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ চায়। যদি বিরোধী দল আলোচনায় না আসে, তাহলে সরকার আগের অবস্থানেই অনড় থাকবে। সংবিধানের আওতায় নির্বাচন হবে। বিরোধী দল আন্দোলনে গেলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। তাঁরা মনে করেন, বিরোধী দলের আন্দোলন সামাল দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি আওয়ামী লীগের আছে। বড় ধরনের আন্দোলন করার মতো সাংগঠনিক শক্তি-সামর্থ্য বিরোধী দলের নেই।
এদিকে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার পরও ২৫ অক্টোবর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ঢাকার সমাবেশ কর্মসূচি বাতিল করা হয়নি। বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, ওই দিন সমাবেশ করতে না দিলে তারা ২৭ অক্টোবর থেকে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচির দিকে যাবে।
এ অবস্থায় দেশ আবার সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর আলোচনার যে একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেটাকে ক্ষীণ করে দেওয়া হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এড়াতে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময় আছে। দুই নেতা নিজেরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে সমাধান হবে।