সংঘাত কি অনিবার্য

হোসাইন জাকির

যারা একটু বেশি আশাবাদী মানুষ তাদের মনেও জমাট বাঁধছে হতাশার কালো মেঘ। নির্বাচনের দিনক্ষণ এগোচ্ছে। বাড়ছে আশঙ্কা। নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি উৎসবমুখর থাকা অপরিহার্য। কিন্তু এ উৎসবের রঙও ম্লান অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একরাশ অন্ধকারে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বৈরী অবস্থান চলমান সঙ্কটকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ বলছেন, নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের অধীনে, সংবিধান অনুযায়ী। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলছেন, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন হতে দেব না। এ অবস্থায় ২৪ জানুয়ারির মধ্যে যে নির্বাচন হবে তা কি ধরনের হবে, আবার কি ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আসছে এসব প্রশ্ন এখন সর্বসাধারণের মুখে মুখে। এর মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে থাকবে রেফারির ভূমিকায়। সিইসির এ বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে আলোকিত বাংলাদেশে প্রধান শিরোনামে ছাপা হয়েছিল ‘সংলাপের সেপ্টেম্বর না সংঘাতের অক্টোবর’। আজ মধ্য সেপ্টেম্বরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বার্তায় যারা ভরসা পেয়েছিলেন তাদের এ ভরসা ৩ দিনও টেকেনি। মুনের ফোনালাপের ৩ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী বললেন, সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন। অর্থাৎ বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য সবাই থাকবেন স্বপদে। স্বপদে থেকেই দৌড়াবেন নির্বাচনী মাঠে। এরপর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন     কারও কথায় চিড়ে ভেজেনি। সব ঠিক থাকলে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে জাতিসংঘে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন বান কি মুন এবং জন কেরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা। একই তোড়জোড় চলছে বিএনপিতেও।

চলতি অর্থাৎ সংসদের শেষ অধিবেশনে দু’দলের মধ্যে কার্যকর সংলাপ হতে পারে। এমন বক্তব্য বিশিষ্টজনরা দিয়েছেন অসংখ্যবার। এ আশায়ও গুড়ে বালি। বৃহস্পতিবার সংসদের ১৯তম অধিবেশনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী যে বক্তব্য দিয়েছেন তাও কৌতূহল উদ্দীপক। তিনি একদিকে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের কথা বলে ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারি নির্বাচনের সময় বেঁধে দিয়েছেন। আবার অন্যদিকে দু’দলের গঠনমূলক আলোচনায় সংসদে সঙ্কট কাটার সুযোগ আছে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এ যেন যে লাউ সেই কদু। যেখানে বিরোধী দল থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সংসদে ক্ষমতাসীন দলের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না দেখলে বিএনপি সংসদে যোগ দেবে না। সংবিধান সংশোধন করতে হবে, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের অবস্থানে সমাধানের ছিটেফোঁটা পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না।

শুক্রবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। আবার যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ প্রহসনের নির্বাচন করবে না। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার লন্ডনে এক স্মরণসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, এটা নির্বাচন নয়, যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে। সংশোধিত সংবিধানের ১২৩ (৩) ধারা অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ পূর্তির অর্থাৎ ২৫ জানুয়ারির আগের ৩ মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে। বিএনপি চায় মেয়াদ পূর্তির পরবর্তী ৩ মাসে নির্বাচন। আইনমন্ত্রীর বাসায় সম্প্রতি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের টানা বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বরঞ্চ সংসদ সদস্য পদ লাভজনক কিনা তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন সবাই। কারণ লাভজনক হলে সংসদ সদস্যরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না।

এ প্রেক্ষাপটে সিইসি বলেছেন, নির্বাচনে কমিশন থাকবে রেফারির ভূমিকায়। সংবিধান সুন্দর অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে শতভাগ দায়িত্ব দিয়েছে। নির্বাচন অবাধ হওয়া নিয়ে সন্দেহ থাকলে এ নির্বাচন পরিচালনা করার দায়িত্ব কেন কমিশন কাঁধে নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন বিশিষ্টজনদের। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কমিশন রেফারির ভূমিকা নয়, থাকবেন ম্যানেজারের দায়িত্বে। কারণ অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সব ম্যানেজ করতে হবে। একটি বিতর্কিত নির্বাচন হলে সব দায়-দায়িত্ব নিতে হবে তাদের।

এরকম শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সর্বতো আন্দোলনে প্রস্তুত থাকার জন্য নেতাকর্মীদের আহ্বান জানাচ্ছেন। দিচ্ছেন একদফা অর্থাৎ সরকার পতনের আন্দোলনের ইঙ্গিত। শেষ ভরসা কূটনীতিকদের চাপও হতাশ করছে বিএনপিকে। এরকম রাজনৈতিক সঙ্কটে সবাই ফিরে যাচ্ছে সাড়ে ১৭ বছর আগে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি একতরফা যে নির্বাচন করে তার প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১৯ মার্চ ’৯৬। এ সংসদ এক মাসও আয়ু পায়নি। এ সময়ের মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাসের পর সংসদ অবলুপ্ত হয়। এ একতরফা নির্বাচনের অমোঘ পরিণতি ৩ মাস ২৭ দিনের মাথায় অর্থাৎ ’৯৬ সালের ১২ জুন আরেকটি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। প্রায় ১৮ বছর পর ১৫ ফেব্রুয়ারির পুনরাবৃত্তি চায় না দেশবাসী। চায় না ৩-৪ মাসের মধ্যে দুটি জাতীয় নির্বাচন। এ বোধোদয় প্রধান রাজনৈতিক দলটির যত তাড়াতাড়ি হয় ততই জাতির জন্য উত্তম। – See more at: http://www.alokitobangladesh.com/first-page/2013/09/14/22216#sthash.eeg68zjz.dpuf