সংবাদ যখন ‘অংবাদ’…কামাল আহমেদ

ইংল্যান্ডে যাঁরা বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান দেখেন, তাঁরা হয়তো খেয়াল করে থাকবেন যে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা খবরগুলোর শুরুতে শিরোনামের সময় শোনা যায় ‘অংবাদ শিরোনাম’। সংবাদ শিরোনামগুলো বাংলাদেশি যেসব কোম্পানির কাছে বিক্রি হয়ে গেছে, সেসব কোম্পানির নাম ওই শিরোনামের অংশ হয়ে যাওয়ায় ব্রিটেনে তা প্রচারের আগে সম্পাদনা করে প্রতিষ্ঠানটির নাম কেটে বাদ দিতে হয়। ফলে অনুপ্রাসযুক্ত নাম শিরোনাম থেকে আলাদা করতে গিয়ে ‘স’ হারিয়ে গিয়ে তা হয়ে যায় অংবাদ শিরোনাম। আবার ধরুন, বাংলাদেশের কোনো একটি চ্যানেলের জনপ্রিয় টক শো ব্রিটেনে সম্প্রচার করা হচ্ছে, তখন দেখা যায় যে টিভির পর্দার নিচের বিরাট অংশটিতে এমন কোনো পট্টি মারা হয়েছে, যাকে শুধু তালি মারা পাঞ্জাবির সঙ্গেই তুলনা করা চলে। ব্রিটেনে সম্প্রচারের জন্য ব্রিটেনের বিদ্যমান আইন মানতে গিয়েই এই ব্যবস্থা, যদিও তা অধিকাংশ সময় দৃষ্টিনন্দন নয়। যে কারণে এ সমস্যাটির অবতারণা, তা হলো বাংলাদেশের খসড়া সম্প্রচার নীতিমালার বিভিন্ন দুর্বলতাগুলো তুলে ধরা।
ব্রিটেনে রেডিও ও টেলিভিশনের লাইসেন্স দেওয়া এবং সম্প্রচারমাধ্যমের তদারকির কাজটি করে থাকে যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তা অফকম নামে পরিচিত। অফকমের জবাবদিহি সরকারের কাছে নয়, পার্লামেন্টের কাছে। বাংলাদেশে সরকার সম্প্রতি যে সম্প্রচার নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করেছে, তাতে এ দায়িত্বটি থাকছে অফকমের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটির (বিটিআরসি) হাতে। তবে বিটিআরসি কার্যত সরকারেরই একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং তার ওপর রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রভাব সুবিদিত।
ব্রিটেনের সম্প্রচার আইনে সংবাদ ও সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান বা সমসাময়িক প্রসঙ্গভিত্তিক অনুষ্ঠানে কোনো কোম্পানি বা পণ্যের বিজ্ঞাপন কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, তা সে বিনোদন অথবা শিক্ষামূলক—যা-ই হোক না কেন, তাতে টেলিভিশন বা রেডিওর স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে এতটাই সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় যে বিজ্ঞাপন থেকে অনুষ্ঠানকে আলাদা করা যায় খুব সহজেই। এমনকি নাটক বা টেলিফিল্মের ক্ষেত্রে এমন কোনো দৃশ্য প্রচার করা যায় না, যাতে কোনো একটি পণ্য বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয় বা নজরে আসে। ধরা যাক, কোনো একটি দৃশ্যে নায়িকা একটি মুঠোফোনে কথা বলছেন, সেখানে ফোনসেটটির ব্র্যান্ড লোগোকে বিশেষভাবে তুলে ধরার কোনো চেষ্টা করা হলে তা হবে সম্প্রচার নীতিমালার লঙ্ঘন।
বাংলাদেশে এসব কিছুর বালাই নেই বলেই সম্ভবত সম্প্রচারবিষয়ক গবেষকেরা কিছুটা বিস্মিত। কানাডার সায়মন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গবেষক আনিস রহমানের ভাষায়, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক ধনকুবেরদের (লাইসেন্সপ্রাপ্তির সময় এঁদের সবাই ধনকুবের না থাকলেও তাঁদের রাজনৈতিক সংযোগ ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ) নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসা-লবিং-দুর্নীতির ক্ষমতাকেন্দ্র (বিজনেস-লবিং-করাপশন-পাওয়ার হাউস)। ওই গবেষক চ্যানেলগুলোর খবরের সময়গুলো (স্লট) করপোরেট সংস্থাগুলোর দখলে চলে যাচ্ছে বলে দাবি করে তার সপক্ষে সংবাদগুলোর করপোরেট ব্র্যান্ডিং এবং সংবাদ বাছাই ও প্রচারে বিজ্ঞাপনদাতা এবং গণমাধ্যমের যোগসাজশের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।
সংবাদ ও সংবাদ শিরোনামের এই করপোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্ব প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারি মাসে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের সময়। সে সময়ে একটি ব্যাংকের নামসংবলিত সংবাদ শিরোনাম প্রচারের কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওই ব্যাংককে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠান অভিহিত করে তাকে নিষিদ্ধ ও বর্জন করার জন্য গণজাগরণ মঞ্চের দাবির সংবাদটিও প্রচারিত হয়। অরাজনৈতিক টিভি দর্শকদের অবস্থাটা এ ক্ষেত্রে কী হয়েছিল, তা নিশ্চয়ই অনুধাবন করা কঠিন নয়?
আর বাণিজ্যিক বিবেচনায় বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোয় বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে যে ধরনের দায়িত্বহীন আপসের প্রতিফলন দেখা যায়, তা বিস্ময়কর। যেমন সিমেন্ট ও রডের বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হয় যে বিশ্বে বাংলাদেশই হচ্ছে একমাত্র দেশ, যে দেশে সিমেন্ট ও রড ভূমিকম্পনিরোধক। কথিত মেধাবর্ধক শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে কতিপয় ভূমিদস্যুর মিথ্যা অঙ্গীকার অথবা মিথ্যুক রাজনীতিকের মিথ্যাচার ধরিয়ে দেওয়ার আজগুবি পানীয়র বিজ্ঞাপন প্রচারের আগে কোনো চ্যানেলের কর্তৃপক্ষ সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তোলে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।
প্রস্তাবিত সম্প্রচার নীতিমালায় বিজ্ঞাপনের বিষয় কিছু বাধ্যবাধকতা আরোপের উদ্যোগ তাই ভোক্তা ও দর্শকদের স্বার্থের পক্ষে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে তা অসম্পূর্ণ এবং এতে সম্পাদকীয় উপাদানের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থের সংমিশ্রণ ও দূষণ রোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। তা ছাড়া যতটুকু নিয়মনীতি আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ‘বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না’ ধরনের বিধান যুক্ত করার যৌক্তিকতাও বোঝা দুষ্কর। ফলে কোনো দেশীয় পণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা বিজ্ঞাপন কি আর প্রচার করা যাবে? এই খসড়া অপরিবর্তিত অবস্থায় চূড়ান্ত হলে শিগগিরই বাণিজ্যিক কারণে দূষিত ‘অংবাদ শিরোনাম’ যে আবার সংবাদ শিরোনাম হবে না, সেটা মোটামুটি নিশ্চিন্তে বলে দেওয়া যায়।
অবশ্য বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে শুধু রেডিও-টিভির কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা আশা করাটাও অযৌক্তিক। বিশেষ করে, সংবাদপত্রের পাতায় যদি একই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক বিজ্ঞাপন প্রচার হতে পারে, তাহলে রেডিও বা টেলিভিশনকে তা থেকে নিবৃত্ত রাখা বাস্তবসম্মত নয়। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে অনলাইন মিডিয়া। বাংলাদেশেও অনলাইন মিডিয়ার যে নাটকীয় গতিতে বিকাশ ঘটছে, তাতে করপোরেট জগতের বিজ্ঞাপনী বাজেটের সিংহভাগ যে শিগগিরই সেদিকে স্থানান্তর হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশে এখন বিজ্ঞাপনী বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হচ্ছে অনলাইনের জন্য। সুতরাং, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে, অনলাইন মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের বিষয়টিকেও বিবেচনায় নেওয়া। এরপর রয়েছে বিদেশি বিপণন চ্যানেল বা শপিং চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন, যেগুলোর ওপর আপাতদৃশ্যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; যদিও তারা চাইলেই ওগুলোর সম্প্রচার বাংলাদেশে বন্ধ করে দিতে পারে, যেভাবে বিদেশি অনেক চ্যানেলের ডাউনলিংকিং তারা বন্ধ রেখেছে। কেননা, ওই সব চ্যানেলে এমন অনেক পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়, যেগুলো দেশীয় প্রচারমাধ্যমে এখনো গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয় না।
বিজ্ঞাপন, তা সে যে মাধ্যমের জন্যই হোক না কেন, তার জন্য একটা আলাদা তদারকি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাটাই হবে সবচেয়ে উপযোগী সিদ্ধান্ত। বিজ্ঞাপনে শালীনতা বজায় রাখা, প্রতারণামূলক ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধ করা, নিষিদ্ধ পণ্য যেমন তামাক, মাদকদ্রব্য বা ওষুধ, চিকিৎসক, আইনজীবী, জ্যোতিষীসেবার বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বন্ধ করার বিষয়ে তদারকি ছাড়াও বিধিভঙ্গের জন্য শাস্তিদানের ক্ষমতা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের অ্যাডভারটাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি (এএসএ) দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রতিবেশী ভারতেও রয়েছে অ্যাডভারটাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস কাউন্সিল নামের প্রতিষ্ঠান। রেডিও-টিভি, সংবাদপত্র, অনলাইন এমনকি রাস্তার হোর্ডিং ও বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনও এই এএসএর নজরদারির আওতাধীন। তাদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার দাপটের নমুনা ব্রিটেনের গত দুই নির্বাচনের সময় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিলবোর্ড নামানোর নির্দেশে আমরা দেখেছি, যার কারণ ছিল, বিজ্ঞাপনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। ব্রিটেনের মতো দেশের বিজ্ঞাপন কর্তৃপক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে, ভোক্তা যেন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হন, সেটা নিশ্চিত করা।
ব্রিটেনে সম্প্রচারমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের বিষয়ে সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ বা অফকমেরও কিছুটা ভূমিকা আছে। যেমন, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিজ্ঞাপন পারিবারিক সময়ে সম্প্রচার না করা। শিশুদের আকৃষ্ট করে, এমন বিজ্ঞাপন প্রচার, রাজনৈতিক দলের বিজ্ঞাপন ও অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়গুলোও অফকমের নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হয়। সংবাদ ও সাময়িক প্রসঙ্গের অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন যাতে কোনোভাবেই সম্পাদকীয় অনুমোদনের ছাপ না পায়, সেটা নিশ্চিত করাও অফকমের দায়িত্ব। বিজ্ঞাপনদাতারা যাতে কোনো চ্যানেলে-বিদ্বেষ বা বৈষম্যের শিকার না হন, সেটা দেখাও তাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশে বড় বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মালিকানাধীন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে এই বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেশি হলেও প্রস্তাবিত সম্প্রচার নীতির খসড়ায় বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। সর্বোপরি রেডিও-টিভির অনুষ্ঠানে বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের সম্পাদকীয় উপাদানের সঙ্গে যাতে পৃষ্ঠপোষকের বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো স্বার্থ গুলিয়ে না যায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার গুরুত্বও এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য।
টেলিযোগাযোগ খাতের প্রায় কয়েক ডজন কোম্পানির বাণিজ্য ও কার্যকলাপ তদারককারী এবং রেডিও-টেলিভিশনের প্রযুক্তিগত এবং সম্পাদকীয় বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের যে ব্যাপক দায়িত্বভার বিটিআরসির কাঁধে ন্যস্ত আছে, তার ওপর বিজ্ঞাপন তদারকির বোঝা চাপানোটা সুবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে বিজ্ঞাপনশিল্পের যে নাটকীয় বিকাশ ঘটেছে, তা বিস্ময়কর। সুতরাং এই বিজ্ঞাপনশিল্পের তদারকির দায়িত্বকে খাটো করে দেখা অযৌক্তিক। এসব বিষয়ে বিবেচনা করা না হলে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট নৈরাজ্যের অবসান হবে বলে মনে হয় না।
(প্রস্তাবিত সম্প্রচার নীতিমালার সম্পাদকীয় বিবেচনা বিষয় পরের কিস্তিতে।)
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।