বান কি মুনকে ব্যাখ্যা দেবেন প্রধানমন্ত্রী জন কেরির চিঠিরও জবাব দেবেন

সংবিধানের বাইরে যাবে না আ’লীগ

শাহেদ চৌধুরী
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এ সফরে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে দেখা করে সংলাপ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান এবং নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেন। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির চিঠির উত্তর দেওয়া হবে। বান কি মুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং জন কেরির কাছে পাঠানো চিঠিতে নির্বাচন
নিয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করা হবে।
মঙ্গলবার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সম্মেলন (এনইসি) কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তার যোগদানের কথা জানিয়েছেন। একনেক বৈঠকে অংশ নেওয়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সমকালকে বলেছেন, এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘে যেতে হচ্ছে। গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ সমকালকে জানান, নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ অধিবেশন চলাকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আমেরিকার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিবের দূতিয়ালির পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ৮ সেপ্টেম্বর সংলাপের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। কালক্ষেপণ না করে সংলাপ কিংবা আলোচনার মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সমঝোতায় পেঁৗছানোটা জরুরি বলে চিঠিতে মন্তব্য করা হয়েছে।
এ চিঠি নিয়ে সোমবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা। সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ সমকালকে বলেন, জন কেরির চিঠির জবাব দেওয়া হবে। এ চিঠিতে কী লেখা হতে পারে, তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী জানিয়েছেন, জন কেরির চিঠির জবাব দেওয়া হবে। চিঠিতে সংলাপ নিয়ে সরকার এবং আওয়ামী লীগের আগ্রহের পাশাপাশি প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরা হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
মতিয়া চৌধুরী আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী কখনোই সংলাপের বিষয়ে আপত্তি করেননি। অথচ তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সংলাপের আহ্বান জানানোর পর ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। এখন সামনে সংসদ বসবে। সেখানে আলোচনা হতে পারে। তবে সংবিধানের ভেতরে থেকেই নির্বাচন হতে হবে। নিশ্চয়ই জন কেরিরও তার দেশের সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগও সব সময় সংলাপে বিশ্বাসী। ১২ সেপ্টেম্বর সংসদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে। বিএনপি সংসদে এলে সুন্দর সমাধান হতে পারে। তবে শর্ত দিয়ে কোনো সংলাপ হতে পারে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের এজেন্ডা নিয়ে সংলাপ হতে পারে। তবে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন হানিফ।
জন কেরির চিঠির জবাব কে দেবেন, সেটা এখনও নির্ধারিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার পক্ষে চিঠি পাঠাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। জন কেরির কাছে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে সরকারি দলে। আর জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সংলাপ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ও নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর তার জন্মদিনে দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কী থাকবে, তার সারসংক্ষেপ তৈরি করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। সে সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠির সারমর্মও প্রস্তুত করা হচ্ছে। নেতারা বলেছেন, ব্যাখ্যা ও চিঠিতে সংলাপ নিয়ে সরকার এবং আওয়ামী লীগের আগ্রহের পাশাপাশি প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে, নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো জাতিসংঘ মহাসচিব ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে।
দুটি ইস্যুতে অনড়
এদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে সংলাপ নিয়ে প্রত্যাশার আলো দেখা দিলেও সংবিধানের বাইরে কোনো ধরনের সমঝোতায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান বিষয়ে তারা কোনো ছাড় দেবে না। সুনির্দিষ্ট এ দুটি ইস্যুতে তারা অনড় থাকবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের ভাষায়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছেন। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সংবিধান অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলেছেন, নির্বাচন আয়োজনের বেলায় সংবিধান থেকে একচুলও নড়চড় করা হবে না। অবশ্য এ নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিরোধী দলের। তারা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পর থেকেই তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
প্রধান দুই দলের এমন অনড় অবস্থানের মধ্যেই গত ২৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাকে টেলিফোন করে নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে আগ্রহী জাতিসংঘ। প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন, সংবিধান মেনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। তবে বিরোধী দল কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে সরকার স্বাগত জানাবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুন গত ২১ আগস্ট এবং ২৬ মে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর শারমেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা ও সংলাপের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও আড়ালে-আবডালে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ মে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসে। একই বিষয় নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দল। তারা ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন ৬ লাখ পোলিং এজেন্ট
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ছয় লাখ পোলিং এজেন্টকে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম গুছিয়ে আনছেন। এ নিয়ে তিনি গতকাল আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন। এ বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার, গোলাম রব্বানী চিনু, মারুফা আক্তার পপি, ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসেন, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, সাদেকুর রহমান চৌধুরী পরাগ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেটিক ইন্টারন্যাশনাল দলের পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেবে। গত নির্বাচনের পোলিং এজেন্টরাই এ প্রশিক্ষণে প্রাধান্য পাবেন। এর সঙ্গে নতুনদের সম্পৃক্ত করা হবে। আগামী ২০ অথবা ২১ সেপ্টেম্বর দলের পরবর্তী বৈঠকে এসব ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।