সংবিধান: পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ অথবা বিকল্প…মোজাম্মেল হোসেন

১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় নিজ নিজ কলামে এবিএম মূসার ‘পঞ্চদশ হলে ষোড়শ নয় কেন’ এবং মিজানুর রহমান খানের ‘বিএনপির বিকল্প ও মির্জার সঙ্গে এক ঘণ্টা’ শিরোনামে প্রকাশিত বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সম্পর্কে কিছু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি।
এক. প্রবীণতম সক্রিয় সাংবাদিক এবং সব সাংবাদিকের অভিভাবকতুল্য ‘মূসা ভাই’য়ের লেখার সমালোচনা করা দুরূহ। তবু দেশ এখন বিশেষ ধরনের সংকট ও বিপদের মুখোমুখি বলে কথাগুলো বলতে হচ্ছে। শাহবাগে গত মে মাসে সূচিত তরুণদের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন সম্পর্কে নিজের আগের লেখার সূত্র ধরে মূসা ভাই লিখেছেন, ‘…সেদিন শাহবাগের আবেগাচ্ছন্ন অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের সাবধান করে দিয়েছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তোমাদের এই বোধোদয় ও উচ্ছ্বাসের যেন রাজনৈতিকীকরণ না হয়। অচিরেই বুঝতে পারলাম, সেই যে আশঙ্কা প্রকাশ করে বাক্যটি লিখেছিলাম, শেষ পর্যন্ত তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বুঝতে পারলাম, এটি রাজনৈতিক একটি নতুন খেলা।’
শব্দচয়নের মধ্যে মূসা ভাইয়ের যে দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়ন ধরা পড়ে, তা সমর্থন করতে পারছি না। অবশ্যই তরুণদের আবেগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ সদর্থক ও পবিত্র। কিন্তু তরুণেরা কি শুধু আবেগাচ্ছন্ন, বাস্তববোধ ও বিচারবুদ্ধি তাঁদের নেই? আন্দোলনে কখনো ভুল পদক্ষেপ হতে পারে, সাময়িক ব্যর্থতা, ক্ষয়ক্ষতি, পশ্চাদপসরণও ঘটতে পারে; কিন্তু অংশগ্রহণকে আবেগাচ্ছন্ন বললে তরুণদের ওই প্রচেষ্টার অবমূল্যায়ন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তরুণদের নতুন বোধোদয় ঘটেছে মনে করাও ঠিক নয়। বরং যে তরুণসমাজ এই চেতনা লালন করে দিনের পর দিন রাষ্ট্রীয়-প্রশাসনিক কাজে, রাজনৈতিক আচরণ ও তৎপরতায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে দেখে ক্লান্ত, অতিষ্ঠ ও হতাশ হয়ে রুখে দাঁড়াতে শাহবাগে ছুটে এসেছে। এর উপলক্ষটি তাৎক্ষণিক, সমাবেশ স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্লোগান মুখ্যত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে। কিন্তু মঞ্চের দাবিনামা, আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতিমান বর্ণিল কার্যক্রম ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে আইনের শাসন দ্বারা চালিত আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। তরুণদের এই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে শনাক্ত করতে না পারলে সেটা বড়দের ভুল। দুঃখের বিষয়, দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সংকীর্ণ স্বার্থে আপাতত এই তরুণদের পরিত্যাগ করেছে।
আর মূসা ভাই আন্দোলনটিকে শনাক্ত করেছেন ‘নতুন এক রাজনৈতিক খেলা’ বলে। দলবহির্ভূত হাজার হাজার মানুষের মাসব্যাপী দিন-রাত রাজপথে অবস্থান যদি একটি ‘খেলা’ হয়, তাহলে খেলোয়াড় নিশ্চয়ই তরুণেরা নন, বরং নেপথ্যের কোনো কায়েমি স্বার্থবাদী মহল। তরুণেরা খেলার শিকার বা দাবার ঘুঁটি মাত্র। মূসা ভাই যাঁদের সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাহলে তাঁর বিশ্লেষণে খেলোয়াড় কারা?
তিনি লিখেছেন: ‘হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসার ইমামের জায়নামাজের নিচ থেকে কারা এরই জের ধরে হেফাজতিদের রাজনীতির মাঠে আনল, তা বিলম্বে হলেও আমাদের সচেতন জনগণ এত দিনে বুঝে ফেলেছেন। বুঝতে পেরেছেন, যাঁরা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা বলে মুখে ফেনা তুলেছেন, দেশে সাম্প্রদায়িক তথা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির নব অভ্যুদয়ের প্রকাশ তাঁদের কারণেই ঘটেছে।’
কলাম লেখক নিজে যা ‘বুঝে ফেলেছেন’, তার জন্য ‘সচেতন জনগণের’ দোহাই কেন? ‘মুখে ফেনা তুলেছেন’ বলে ব্যঙ্গোক্তি করে তিনি যাঁদের সম্পর্কে তা প্রয়োগ করেছেন, সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুসারীরা যে হেফাজতিদের রাজনীতির মাঠে এনেছে, এই দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা অন্তত বর্ণনাযোগ্য কার্যকারণ হেতু তাঁর জানা থাকলে সেটা দিয়েই তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা উচিত ছিল।
অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারকেরা হেফাজতিদের রাজনীতির মাঠে আনল, আর সেই হেফাজতিরা একটি কট্টর মৌলবাদী ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ১৩ দফা নিয়ে রাজধানীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে লাগাতার অবস্থানে বসে পড়ল, তাদের পক্ষে বিএনপি ও ১৮ দল নিজ কর্মীদের রাতেই রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানাল, ঘটনার অল্প দিন পর পাঁচ সিটি নির্বাচনে জামায়াতি-হেফাজতিরা সদলবলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নেমে পড়ল—এ সবকিছু ঘটার অনেক আগেই শাহবাগে আবেগাচ্ছন্ন তরুণদের দ্বারা এই ‘নতুন রাজনৈতিক খেলা’র ছকটির সূচনা হয়েছিল! বিশ্লেষণটি যথার্থ হলো কি?
ঘটনায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলে বিক্ষুব্ধ তরুণেরা ইন্টারনেটে যোগাযোগ করে ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জড়ো হন। দুই দিনে যখন দেখা যায় তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হয়ে আসেননি, রায়ের পেছনে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা থাকলে সে সন্দেহের তির আওয়ামী লীগের দিকেই তাক করা এবং তাঁরা কোনো প্রচারাভিলাষী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মঞ্চে উঠতে দিচ্ছেন না, তখনই স্রোতের মতো মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক জনতা এসে রাজপথ ভরে ফেলে। রাজনৈতিক ছাত্রনেতারা এঁদের মঞ্চকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। সেই চেহারাগুলো দেখার পরই জনতা কমতে থাকে। হেফাজত ও বিএনপি যখন এঁদের ‘নাস্তিক’ তকমায় ভূষিত করল, তখন আগামী ভোটের হিসাব কষে আওয়ামী লীগও এঁদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করল। এই সমাবেশের যে নিরাপত্তা সরকার দিয়েছে, সেটি ছিল যথার্থ কর্তব্যকর্ম।
হেফাজতিদের রাজনীতিতে আনার জন্য অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে দোষারোপের পাশাপাশি মূসা ভাই তাঁর নিজের ভাষাতেই ‘দেশে সাম্প্রদায়িক তথা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির নব অভ্যুদয়ের প্রকাশ’কে খাটো করে দেখিয়ে একে ‘তেমন গুরুত্ব দিচ্ছি না’ বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি মনে করেন, দেশে এই রাজনীতির ‘প্রভাব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে’। তিনি লিখেছেন, ‘গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে শত চেষ্টা করেও ধর্মোন্মাদনাকে বাঙালি মুসলমানের রাজনীতিতে কেউ স্থায়ী করতে পারেনি।’
সত্যের এই আংশিক উপলব্ধিতে অসতর্কতার বিপদ আছে। সমকালীন ইতিহাসেই আমরা দেখি, ধর্মোন্মাদনা যেমন স্থায়ী হয়নি, তেমনি স্থায়ীভাবে বিলীনও হয়ে যায়নি। এ ভূখণ্ডে সুফি মতবাদের ধারায় আউলিয়া-দরবেশদের মাধ্যমে সহনশীল ও উদারনৈতিক ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। তার অর্থ এও নয় যে উগ্র ধর্মান্ধতার উত্থানের বিপদ নেই। বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের উত্থানচেষ্টা, সামরিক শাসক জিয়া-এরশাদের দ্বারা সংবিধানের ‘ইসলামীকরণ’, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অব্যাহত নীরব দেশত্যাগ, যা আদমশুমারির তথ্যে স্পষ্ট, সাম্প্রতিক কালে বাংলা ভাই-শায়খ আবদুর রহমানদের জঙ্গি কার্যকলাপ, এখনো বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপের নামে এই গোপন সন্ত্রাসীদের অস্তিত্ব ও তৎপরতা, অতি সম্প্রতি রামু-কক্সবাজারে প্রাচীন বৌদ্ধবিহারগুলো ধ্বংস, শাহবাগের পর রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ‘আস্তিক-নাস্তিক’ প্রশ্ন তুলে ঝড় বইয়ে দেওয়া, কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত স্থানে অব্যাহত মন্দির-মূর্তি ভাঙচুর, সংখ্যালঘুদের ধর্মোৎসবে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জোট বাঁধার মতো বাস্তবতাগুলো উপেক্ষণীয় নয়। দেশে গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্ম, রাষ্ট্রধর্ম, ধর্মান্ধতা, রাষ্ট্রের চরিত্র, সর্বজনীন সিভিল আইন, নারীর মর্যাদা, শরিয়াহ, ব্লাসফেমি ইত্যাদি সম্পর্কে রাজনৈতিক-দার্শনিক মতদ্বৈধতা ও সংগ্রাম শেষ হয়ে কি বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে মূসা ভাই মনে করেন?
গণজাগরণ মঞ্চ তরুণদের আকাঙ্ক্ষার কণ্ঠস্বর নয় বরং একটি রাজনৈতিক খেলা, হাটহাজারীর ইমাম জায়নামাজে বসা নিরীহ মুসল্লি, তাঁর অনুসারী হেফাজতিদের মাঠে নামিয়েছে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মহল এবং সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অশুভ তৎপরতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই—এ সবই দেশের বর্তমান সময়ে অত্যন্ত ভুল বার্তা।
দুই. শাহবাগ মূসা ভাইয়ের এ দিনের কলামের মূল বিষয় নয়। বেশি লিখেছেন ‘আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে, কারা করবে’, সে বিষয়ে। মোদ্দাকথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় সরকারের অধীনে কারসাজির নির্বাচন বা বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচন করতে যাচ্ছেন অথবা সংবিধানের একটি ধারার সুযোগ নিয়ে নির্বাচন না করে ক্ষমতায় থাকতে চাইতে পারেন, এ ধারণাই তিনি ব্যক্ত করেছেন। সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষের নানা বক্তব্য, দেশি-বিদেশি চেষ্টা ইত্যাদি তিনি বিবেচনায় নেননি। তাঁর একমাত্র সরল সমাধান, ‘পাঁচ মিনিটে বাকশাল করা গেলে তিন মিনিটে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহাল করা যাবে না কেন?’ এই পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি নিজেই আর সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান অবস্থায় এমন পরামর্শ না বাস্তবোচিত, না কোনো সমাধানের পথ দেখায়।
তিন. আদালতের রায়ে বাতিল হওয়ার পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রদ করা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনর্বহালকেই যখন এবিএম মূসা তিন মিনিটের সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছেন, তখন পাশেই মুদ্রিত আমার এককালের সহকর্মী মিজানুর রহমান খান তাঁর কলামে লিখছেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তাঁর ঠাকুরগাঁওয়ের বাসায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনার পর আমার ব্যক্তিগত মত হলো, উভয় পক্ষের কাছে আসতে না পারার জন্য আর যা-ই হোক, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে দোষারোপ করা যাবে না। কারণ, সরকার “নির্দলীয়” মানলেও ষোড়শ সংশোধনী অনিবার্য নয়। সংসদ রেখে নির্বাচন করলে বরং সমঝোতার আইনি পথ আরও প্রশস্ত থাকবে।’
মিজানের আরও ধারণা, প্রধানমন্ত্রী সরে দাঁড়ালে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ওই দলের অন্য কাউকে মেনে নিতে পারে। আগ বাড়িয়ে তিনি শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প খোলা রাখতে বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছেন।
চার. পরামর্শ দেওয়ার স্বাধীনতা সবারই আছে। নিরপেক্ষ সংবাদপত্রে পাশাপাশি এমন চরম বিপরীত বিশ্লেষণ-মন্তব্য ছাপলে স্বাধীন চিন্তার বাহাদুরিও থাকে, পাঠককেও হকচকিয়ে দেওয়া যায়।

মোজাম্মেল হোসেন: সাংবাদিক।
আমাদের কথা: প্রথম আলো শুরু থেকেই সমাজের বিভিন্ন মতামত প্রকাশ ও তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছে। পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানের মত প্রকাশেও আমরা আগ্রহী। প্রথম আলোর প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় বা প্রকাশিত লেখালেখির সমালোচনা করে ভিন্নমত আমরা নিয়মিতই ছাপি। আমরা মনে করি, এই সমাজ কত ধরনের চিন্তা ও মতামত ধারণ করে, তা বোঝা ও জানার জন্য এটা জরুরি।—বিভাগীয় সম্পাদক।