সংসদে আর যাচ্ছে না বিএনপি

লোটন একরাম
নবম সংসদের চলতি সম্ভাব্য শেষ অধিবেশনে আর যোগ দেবে না প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালে সংসদে বিল না আনা এবং সমঝোতার ব্যাপারে সরকারের ‘অনমনীয়’ মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। সরকারের অবস্থান পরিবর্তন অথবা নাটকীয় কিছু না ঘটলে আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান অধিবেশনে আর যোগ দেবে না বিরোধী দল। দাবি আদায়ের ব্যাপারে সরকারকে ‘চাপের মুখে’ রাখার ‘কৌশল’ হিসেবে বিএনপি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক নেতা।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক গতকাল সমকালকে বলেন, আমরা সব সময় সংসদকে কার্যকর করতে চেয়েছি। কিন্তু সরকারি দলের সাংসদরা আমাদের নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে সংসদে থাকতে দেননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া সরকারকে নবম সংসদের শেষ অধিবেশনে নির্দলীয় সরকারের বিল আনার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের মনোভাবের ওপর শেষ অধিবেশনে যোগদানের ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে।
সূত্র জানায়, সংসদের শেষ অধিবেশন শুরুর আগে যোগদানের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে আসছিলেন বিরোধী দলের সাংসদরা। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে মহাজোট সরকারের ‘অনমনীয়’ মনোভাবের কারণে শেষ মুহূর্তে ক্ষুব্ধ হয় বিএনপির হাইকমান্ড। অধিবেশনে যোগ না দিয়ে দাবি আদায়ে সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করার কৌশল গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, সর্বশেষ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধি দলের সংলাপে বসার আহ্বানে সরকারের পক্ষ থেকে
ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল। অবশ্য দলের অধিকাংশ সাংসদ বলছেন, সংসদ বর্জন করার মতো কোনো ঘটনা তারা দেখছেন না। তারপরও হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কোনো বক্তব্য নেই।
সূত্র জানায়, সরকারের অনমনীয় মনোভাব ও স্পিকারের ভূমিকায় বর্তমানে ‘আশাহত’ বিএনপি। সর্বশেষ স্পিকারের বক্তব্যে আরও ‘ক্ষুব্ধ’ হয় দলটি। সংসদের অভিভাবক হিসেবে স্পিকার বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ রাখবেন বলে আশা করেছিলেন বিরোধী দলের নেতারা। ‘আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে’_ স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীর এমন বক্তব্যে ‘হতাশ’ হন তারা। এ পরিস্থিতিতে নবম সংসদের শেষ অধিবেশনে যোগদান থেকে বিরত থাকে দলটি।
দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের দু’সপ্তাহ পর নবম সংসদের শেষ অধিবেশনের প্রথম দিন স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীও একই বক্তব্য দেন। এরপর বিএনপি নেতারা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, সংসদের অভিভাবক হিসেবে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে স্পিকার কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবেন বলে আমাদের আশা ভুল ছিল। স্পিকার দলনিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারলেন না। দেশকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিলেন।
এ পরিস্থিতিতে সংসদের চলতি অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার ইঙ্গিত দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ‘স্পিকারের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করেছিলাম। স্পিকার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। স্পিকার এ বক্তব্য দিয়ে নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন অভিযোগ করে মওদুদ দাবি করেন, এতে বিএনপি মর্মাহত হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসনকে দলের সিনিয়র নেতারা বলেছেন, সর্বশেষ এখন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট কী ভূমিকা রাখেন সেটাই আমাদের দেখতে হবে। পাশাপাশি আমাদের রাজপথে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকারের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে তারা সহজে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেবে না। প্রতিরোধ করতে না পারলে একতরফা নির্বাচনের চেষ্টা করবে। দলীয় নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন খালেদা জিয়াও। একইসঙ্গে তিনি ২৪ অক্টোবরের পর থেকে লাগাতার হরতাল, অবরোধ ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।
সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত বিএনপি অধিবেশনে যোগ না দিলেও সরকার চাইলে সংসদের বাইরে নির্দলীয় সরকারের একটি প্রস্তাব দেবে তারা। দেশ ও গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে বিরোধী দল। অন্যথায় ‘উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতি’র জন্য সরকারকে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হবে।
টানা ৮৩ দিন অনুপস্থিতির পর গত ৩ জুন সংসদের সর্বশেষ ১৮তম অধিবেশনে যোগ দেয় বিএনপিসহ বিরোধী দল। ২৪ কার্যদিবসের ওই অধিবেশনে বিরোধী দল উপস্থিত ছিল ২১ দিনই, ভাষণ দিয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতাও। ওই অধিবেশনের আগে ‘কেয়ারটেকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের’ দাবি জানিয়ে বিএনপির এক সংসদ সদস্য মুলতবি প্রস্তাব দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেন, যার সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই অধিবেশনের শেষ দু’দিন জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর হরতালের কারণে যোগ দেননি তারা। অবশ্য সমাপনী অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য কার্যদিবস বাড়ানোর অনুরোধ করা হলেও তা রক্ষা করেননি স্পিকার।