সংসদ রেখে নির্বাচন করলে আরও বিতর্ক…মিজানুর রহমান খান

সংসদে অসত্য তথ্য দিতে কতিপয় সাংসদ বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর শক্তিশালীকরণ’ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যেন তারই প্রমাণ রাখলেন। তিনি বলেছেন, ‘ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় সংসদ রেখেই সংসদ নির্বাচন করার নজির আছে।’ [প্রথম আলো ১৬ সেপ্টেম্বর] অথচ অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় সংসদ ভেঙে নির্বাচন হয়। গত আগস্টে ১৯ বার তোপধ্বনি করে সংসদ বিলোপ করেই তবে অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচন হলো। কানাডা পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ ১৯৯৩-এর পর আর দেখেনি। ১৯৭৯ সালের ২২ মে ৩১তম সংসদের নির্বাচন হয়েছিল ৩০তম সংসদ ২৬ মার্চ ভেঙে দিয়ে। ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর ৩৫তম সংসদ নির্বাচনটি হয়েছিল ১৯৮৮ সালে গঠিত ৩৪তম সংসদটি ৮ সেপ্টেম্বর ভেঙে দিয়ে।
সুরঞ্জিত আরও হাস্যকর যুক্তি দেন যে, ‘কেবল ইংল্যান্ডে সংসদ বিলুপ্ত করে নির্বাচন হয়। কারণ ব্রিটেনের লিখিত সংবিধান নেই।’ তোফায়েল আহমেদ সঠিক তথ্য দেন যে ‘ভারতের ১৫টি সংসদের মধ্যে ছয়টি বিলুপ্ত এবং আটটি সংসদ বহাল রেখে হয়েছে।’ এর আগে আমি লিখেছিলাম, আওয়ামী লীগের কোনো বুদ্ধিমান সাংসদ হয়তো ভারতীয় নজিরকে ব্যবহার করতে চাইবেন। তখন আমাদের যুক্তি থাকবে, তাহলে ভারতীয় সংবিধান ও সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোও আমদানি করুন। আমরা বাহবা দেব। নওয়াজ শরিফ বলেছিলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য চাইলে পাকিস্তানকে ভারতীয় সংবিধান অনুসরণ করতে হবে। বেনজিরের সঙ্গে প্রথমে চুক্তি ও পরে জারদারিকে সমর্থন দিয়ে নওয়াজ কিন্তু বেশ কিছুটা করে দেখিয়েছেন। তবে তোফায়েল আহমেদ আরও বলেছেন, ‘২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্পিকার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা সংবিধানসম্মত।’ এই ধারাবাহিকে এটা আমরা খতিয়ে দেখব।
ভারত কী উপায়ে লোকসভা বহাল রেখে লোকসভা করেছে, তার সবটুকু বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ৮৩(২) অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশ সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদ অবিকল একই বাক্যে গঠিত। এতে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।’ এ দুটি অনুচ্ছেদের মধ্যে একটাই মৌলিক তফাত। ভারতের বিধান বলেছে, দেশে জরুরি অবস্থা জারি থাকলেই সংসদের মেয়াদ একসঙ্গে অনধিক এক বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়। জরুরি অবস্থার অবসানের ঘটলে বর্ধিত মেয়াদ কোনোক্রমে ছয় মাসের বেশি হবে না। বাংলাদেশে ৭২(৩) অনুচ্ছেদে কী করে ‘জরুরি অবস্থা’র পরিবর্তে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ঢুকল, সেই বিষয়ে জানতে চাইলাম বরেণ্য সাংবাদিক ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচিত সাংসদ এবিএম মূসার কাছে। প্রখর তাঁর স্মৃতি, এ বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য। মূসা বললেন, ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারির বিধান ছিল না। এটি ১৯৭৩ সালে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে সংযোজিত হয়েছে।’ এ থেকে অসতর্কতা ধরা পড়ে। কারণ, জরুরি অবস্থা ঢোকানো হলো, অথচ বাহাত্তরে ঢোকানো যুদ্ধই থেকে গেল। অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই, খালেদা জিয়া ঘোষিত সম্ভাব্য সহিংস আন্দোলনের ফলে গোটা দেশে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি হলেও সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন করে নিতে পারবে। অথচ ভারতের মতো বিধান থাকলে তখন কয়েক সপ্তাহের জন্যও সংসদের মেয়াদ বাড়ানো যেত। জরুরি অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ‘মধুর অভিজ্ঞতা’ আমরা ইতিমধ্যে অর্জন করেছি। সংসদ রেখে সংসদ নির্বাচন ভারত ছাড়া অন্যত্র হয় বলে জানা নেই। কিন্তু তাই বলে ভারত নতুন নির্বাচনের পরও পুরোনো সংসদের মেয়াদ পুরা করার গোঁয়ার্তুমি করেনি।
অক্সফোর্ডের বিশপ উইলিয়াম স্টাবস তাঁর দ্য কনস্টিটিউশনাল হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড বইয়ে লিখেছেন, ‘সমগ্র মধ্যযুগজুড়ে সংসদ ভেঙে দেওয়ার অধিকার এককভাবে রাজা ভোগ করেছেন।’ আক্ষরিকভাবে রাজা নিজের মুখেই সংসদ বিলোপের ঘোষণা পাঠ করতেন। ১৩০৫ সালে ফরমানের মাধ্যমে সংসদ ভাঙার নজির পাওয়া যায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৩৬৫। রাজা, লর্ড সভা ও কমন্সের সদস্যরা হোয়াইট চেম্বারে জড়ো হন। সেখানেই তিনি কমন্সের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এক বর্ণাঢ্য সম্মিলনী ঘটেছিল। ১৩৭৬ সালে ‘গুড পার্লামেন্টের’ আয়ু নেভাতে আয়োজন করা হয় একটি জাঁকজমকপূর্ণ ভূরিভোজের। সংসদ বিলোপ পর্বটি অনেক সময় স্পিকারের একটি ভাষণদানের উপলক্ষ হিসেবেও গণ্য হয়েছে। সংসদের আয়ু মানে ছিল রাজার আয়ু। যে রাজার নামে সংসদ ডাকা হতো, তাঁর মৃত্যু বা অপসারণের পর সেটি আর চলত না। ১৪১৩ সালে রাজা চতুর্থ হেনরি মারা গেলে সংসদের বিলুপ্তি অবশ্য একমাত্র নজির। ১৬৯৪ সালের আগে সংসদের কোনো মেয়াদ ছিল না। ১৭১৫ সালে এর আয়ু সাত বছরে বাঁধা হয়।
প্রায়ই বলা হয়, একটি নতুন নির্বাচন পাঁচ বছরের মেয়াদে সংসদ ও সরকার দেয়, এটা ভুল। একটি নির্বাচন সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য সংসদ দেয়। পাঁচ বছর হলো সর্বোচ্চ সময়সীমা। যেকোনো অবস্থায় পাঁচ বছরের জন্য সরকার চালানোর ম্যান্ডেট লাভের দাবি একটি ধোঁকা। কতিপয় অসৎ ও অজ্ঞ রাজনীতিক বাংলাদেশে এই ধারণা জনপ্রিয় করতে পেরেছেন। হাউস অব কমন্স আগে ভেঙে না দেওয়া হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হলেই ভেঙে যাবে। ১৭১৫ সালের ‘সেপ্টিনিয়াল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে এ কথাটি চালু হয়। সেই থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সব দেশ এটাই মানছে। সবার লিখিত সংবিধানে তাই একটিই পরিভাষা: ‘আনলেস সুনার ডিজলভড’ অর্থাৎ আগে ভেঙে না দেওয়া হলে। ১৯১১ সালে সংসদের মেয়াদ দুই বছর কমিয়ে তা পাঁচ বছর করা হয়। ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’ কথাটিও ব্রিটেন থেকে এসেছে। ১৮৬৭ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রথমবারের মতো আইন করা হলো যে রাজার মৃত্যু ঘটলেও আর সংসদ বিলুপ্ত হবে না। ১৯১১ সালের পর ২০১০ সালে ব্রিটেন পাস করল ‘ফিক্সড টার্ম পার্লামেন্ট বিল’। এর মাধ্যমে ‘আগে ভেঙে না দেওয়া হলে’ কথাটি অর্থহীন হয়ে পড়ল। ঠিক বাংলাদেশি বিধান। আস্থা ভোটে না হারলে প্রধানমন্ত্রীরা আর নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট করতে পারবেন না। যখন খুশি তখন সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দিতে পারবেন না। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর জে এ জি গ্রিফিথ ১৯৮৯ সালে লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা সাধারণত সংসদ ভেঙে দিতে এমন সময় বেছে নেন, যখন নির্বাচন দিলে তাঁর দলের জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অনেক সময় বলা হয়, এ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী এককভাবে গ্রহণ করে থাকেন, কিন্তু সাম্প্রতিক কালে নির্বাচনের তারিখ তথা নির্বাচনের বিষয়টি হরহামেশা মন্ত্রিসভায় আলোচিত হয়ে থাকে।’ ভারতেও তাই। সংসদ ডাকা, মুলতবি ও বিলোপ এখন আইনগতভাবে ক্যাবিনেট কমিটি অন পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্সের সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কী দেখলাম। ক্যাবিনেটে নয়, প্রধানমন্ত্রী সচিবসভায় বিষয়টি আলোচনা করলেন।
এখন কেউ বলবেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী যদি যেকোনো সময় সংসদ ভাঙার পরামর্শ দিতে পারেন, তিনিই যদি তারিখ ঠিক করতে পারেন, তাহলে শেখ হাসিনা পারবেন না কেন?
এর উত্তর হলো, ভারতের সংসদ রেখে সংসদ নির্বাচন করা আর বাংলাদেশেরটা যে এক নয়, তার বড় যুক্তি—ভারত কেবল সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রশ্নে ৮৩(২) অনুচ্ছেদে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছে। ভারতের সংবিধানের এই একটিমাত্র অনুচ্ছেদ এ বিষয়ে সব বলে দিয়েছে। আর বাংলাদেশ তার সংবিধানে একই বিষয়ে অতিরিক্ত প্রায় এক গণ্ডা বিধান ঢুকিয়েছে। এখন বিশেষজ্ঞদের অনেকে যেন আবদার করছেন যে এসব বিধান সংবিধানে যে লেখা হয়েছে, তা কল্পনা করে নিতে হবে যে এগুলো লেখা হয়নি। যেকোনো আমজনতা সরল প্রশ্ন করতে পারেন যে আচ্ছা, ভারত ও বিশ্বের অন্য সব দেশ যে কেবল উল্লিখিত ‘সুনার ডিজলভড’ কথাটি দিয়ে সারল, তা দিয়ে বাংলাদেশের চলল না কেন? এক গণ্ডা অনুচ্ছেদ, যা বিশ্বের অন্য কোনো সংবিধানে নেই, তা কেন প্রসব করতে হলো, তার যদি কোনো মানেই না থাকবে, তাহলে সেসব কথা ২০১১ সালে এসে নতুন করে ঢোকানোর মানে কী? তোফায়েল আহমেদ সংসদে যে তথ্য দেননি তা হলো, ভারতের কোনো লোকসভাই পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরা করেনি। তার মানে তারা সংসদ রেখে নির্বাচন করলেও নির্বাচনের পরেই আগের সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ১৫তম সংশোধনীর মতো অত্যন্ত সন্দেহজনক বিধান করেনি যে, আগের সংসদের মেয়াদ পুরা না হলে নবনির্বাচিতরা কার্যভার নিতে পারবেন না। ভারতের সপ্তম ও ১৪তম (২০০৪-০৯) সংসদ চার বছর ১১ মাস ১০ দিন পরে ভেঙে গেছে। অষ্টম সংসদ চার বছর ১১ মাস ১৬ দিন এবং দশম সংসদ চার বছর ১০ মাস তিন দিন পরে ভেঙে গেছে। তারা একটি নির্বাচনের পরে দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে আগের সংসদ ভেঙেই তবে নতুন সংসদ ডেকেছে। এ তথ্য প্রমাণ করে, ভারত নতুন নির্বাচন করে আগেরটা ভেঙে দিয়েই, তবে নতুন সংসদের বৈঠক করেছে। আর আওয়ামী লীগ এমন বিধান করেছে যে, চাইলে তারা নতুন নির্বাচনের পরে দুই-আড়াই মাস পর্যন্ত বর্তমান সংসদ টিকিয়ে রাখতে পারবে। এমন একটি নজিরবিহীন বিধানই আসলে ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী’ করতে বিরোধীদলীয় অভিযোগকে যুক্তিসংগত করে।
ড. শাহদীন মালিক সেপ্টেম্বরের তৃতীয় অথবা সর্বশেষ চতুর্থ সপ্তাহে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বাস্তবতার নিরিখে তিনি ঠিকই বলেছেন, ‘সরকার সংসদ বহাল রাখলে চরমভাবে এক অসম নির্বাচনী পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। ভেঙে দিলে এর অবসান ঘটবে।’ [প্রথম আলো, ৪ সেপ্টেম্বর] এখন প্রশ্ন অনাস্থা ভোটে না হারলেও প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙে দিতে পরামর্শ দিতে পারেন কি না? দিতে পারলেও রাষ্ট্রপতি সেটা মানতে বাধ্য কি না? আরেকটি বিষয়ে আলোচনা হওয়া দরকার যে ভারতের বিরোধী দল কখনো ‘চরম অসম পরিস্থিতির’ দাবি তোলেনি। ভারতীয় মন্ত্রী ও সাংসদেরা কিন্তু অবৈধ প্রভাব খাটাতে একেবারেই নিরাসক্ত নন। ভারতে কীভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে এবং নির্বাচনকালে মন্ত্রী ও সাংসদদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা চমকপ্রদ। ২ সেপ্টেম্বরে স্টার জানিয়েছিল, অন্যান্য সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে ঘটে, তা খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী সচিবদের পরামর্শ দেন। তবে গত ৩১ আগস্ট আইনমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ‘মেয়াদ শেষের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়।’ [প্রথম আলো, ১ সেপ্টেম্বর] যদিও অনেকে সংসদ ভেঙে দিতে প্রধানমন্ত্রীর সামনে তথাকথিত একাধিক বিকল্পের কথা বলছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাঁরা এবং নির্বাচন কমিশনও সম্ভবত সংবিধানের সঠিক ব্যাখ্যা ও বাধার ব্যাপারে সচেতন। এমপি থেকে এমপি হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতেই পারে না, ভারতীয় অভিজ্ঞতা তা কিন্তু বলে না।
আগামীকাল: ভারতীয় নির্বাচনের মডেল আমরা কেন নেব
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com