সখার মৃত্যু…আবুল হায়াত

কদিন ধরে একটা আশঙ্কা থেকে থেকে ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল মনের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্যি হলো।
গতকাল দুপুরে শুটিং চলছিল উত্তরার একটি হাউসে। বেলা প্রায় দুইটা। লাঞ্চ করতে বসব। এমন সময় ফোনটা এল।
শিরিনের ফোন। ভাবলাম রুটিন ফোন। এখন খবর নেবে—খাওয়া হলো কি না। কিন্তু না। সে বেশ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
‘শোনো, তোমার জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে।’
চমকে গেলাম এ কথায়। কোনো নিকটজনের মৃত্যুসংবাদ কি? কিন্তু শিরিন তো কখনো এভাবে আমাকে কোনো মৃত্যুসংবাদ দেয় না! তাহলে আর কী দুঃসংবাদ হতে পারে?
‘কী দুঃসংবাদ?’ জানতে চাইলাম।
জানাল শিরিন আমার দুঃসংবাদ। তারপর আরও দু-চারটে কথাও বলল কিন্তু আমি যেন বাক্শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। কী যে হলো আমার, ভাষায় ঠিক সম্ভব নয় প্রকাশ করা। তারপর লাঞ্চটা কী করেছি না করেছি বলতে পারব না তাও।
হ্যাঁ, আপনজনের মৃত্যুসংবাদই। অতি আপনজন। ওকে আপনারাও চেনেন। আমিই চিনিয়েছি ওকে আপনাদের সঙ্গে। ওর সুখ-দুঃখের কথা বলেছি কতবার। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৭ বছর ধরে চিনি। চিনি ওর সকাল-বিকাল-সন্ধে-রজনী। সবই। ওর গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত—সব ঋতু। কখন ওর দীনদশা হবে জানা থাকত আমার, কখন হবে ঝলমলে রূপ, তাও জানতাম আমি। আপনের চেয়ে আপন হয়ে গিয়েছিল সে আমার।
কখনো মনটা কোনো কারণে খারাপ হয়ে গেলে ওর দর্শন আমাকে আবার করে তুলত সতেজ। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কত ভাববিনিময়ই না হতো ওর সঙ্গে আমার। হূদয়ের গভীরতম স্থানটা সে দখল করে নিয়েছিল আমার।
আমি ভাবতেই পারছিলাম না ও নেই। মনে হচ্ছিল, এ অসম্ভব। ওর এ অপমৃত্যু কেন হবে? এটা তো খুনের শামিল। ও তো কারও ক্ষতি করেনি। ওর অবস্থান তো এমন ছিল না যে কখনো কারও ক্ষতি করবে বা বিরক্তির কারণ হবে। কারও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করবে। তবে কেন? কেন তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো?
ওর জীবন কেড়ে নেওয়াটা কি খুবই জরুরি ছিল? ওর মৃত্যুতে কার কোন উপকার হবে, তা আমার বোধে আসে না।
সেদিনের মতো শুটিং শেষ হলো বটে। তবে মনটা ছটফট করছিল ওর জন্য। একবার যদি শেষ দেখাটাও দেখা যায়।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১২টা। ঘরে ঢুকেই বললাম—‘চলো তো, দেখি ওকে।’
‘এখন রাত হয়েছে, কাল দেখো।’ সান্ত্বনার সুরে বলে শিরিন।
তবু ছুটে গেলাম ওর কাছাকাছি। নেই, কেউ নেই। অন্ধকার শুধু। যেন আমাকে ব্যঙ্গ করল রাতের অন্ধকার। যেন বলল, ‘বন্ধুর জন্য মন খারাপ? কতজনের কত বন্ধুই তো অপঘাতে প্রাণ দিচ্ছে দিনের পর দিন। এ আর এমন কী?’
সকাল হতেই ছুটে গেলাম সেই উত্তরের খোলা বারান্দায়। আমার প্রিয় বারান্দাটায়, যেখান থেকে প্রতিদিন ভাবের আদান-প্রদান হতো আমার বন্ধুটির সঙ্গে। ওকে একবার দেখার জন্য ব্যাকুল আমি।
সুন্দর সকাল। শরতের সকাল। এই রোদেলা এই মেঘলা। খেলা চলছে রৌদ্রছায়ার। তারই মধ্যে দেখলাম সে নিথর শুয়ে রয়েছে মৃত্তিকায়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবই বিচ্ছিন্ন তার। আহ্! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমার।
হ্যাঁ, পাঠককুল! আমার প্রিয় বন্ধু অতি আপনজন নীপবৃক্ষটির মৃত্যু হয়েছে গতকাল। অপমৃত্যু। তাকে নির্দয়ভাবে খুন করেছে মানুষ নামের জীব। শুধু তাকে নয়, তার আশপাশের সব বন্ধুকে। চাঁপা, বকুল, কৃষ্ণচূড়া, আম, জাম—সব।
সবাইকে অকাতরে কর্তন করা হয়েছে। শুধুই একটি ভবন নির্মাণের কারণে। এরা হলো নগরায়ণের বলি। কিছুদিন ধরেই দেখছিলাম ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা। তাই ছিল শঙ্কা। হায়, আমার বন্ধুরা, আর তোমাদের দেখব না কখনো। ভাবতেই শরীরের ভেতরে কোথায় যেন আলোড়ন অনুভব করছি। আমি কাঁদছি?
হ্যাঁ, চোখ ভেঙে জল আসছে আমার। আমি কাঁদছি। আমার নীপবনের গাছগুলোর কষ্টে প্রাণটা আমার হাহাকার করে উঠল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিড়ে।
কাল সকালেও যে টিয়াপাখিগুলো কদম ফুলের গোটা ঠুকরে খেয়ে প্যাঁক প্যাঁক করেছে, তারাও একবার উঠে চলে গেল হতাশ হয়ে। ওদেরও দেখব না আর কোনো দিন।
না, আর পারছি না। এ দৃশ্য সহ্য করতে পারছি না। চোখের জল গাল বেয়ে পড়ছে ততক্ষণে।
বোকা। আমি একটা বোকার হদ্দ। তা না হলে আমি শুধু একটি কদমগাছের মৃত্যুতে হা-পিত্যেশ করে কাঁদি আর ওদিকে সব জ্ঞানীগুণী সুন্দরবনকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিচ্ছে মহোৎসব করে। কী বিচিত্র এই দেশ, সেলুকাস!

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩
আবুল হায়াত: নাট্যব্যক্তিত্ব।